ঢাকা, সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ১১ শ্রাবণ ১৪২৮ আপডেট : ২ মিনিট আগে

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২১, ২২:১৯

প্রিন্ট

চামচা মনে নিরাপদ জীবন

চামচা মনে নিরাপদ জীবন
রাজীব কুমার দাশ

রাজীব কুমার দাশ

দোলন, দোলনা চেপে নির্জন স্মৃতির জানালা পার্কে প্রিয়তমা স্ত্রী দোলাকে নিয়ে দুলছে আর হাসছে। আদরের সোনামণিরা আপন মনে খেলছে।

সোনামণি দোয়েল-নোয়েল এসে বলল, ‘মা পানি, পানি দাও।’ পার্কের একমাত্র অন্ধের যষ্টি, ‘বার বার আসিবেন’ রেস্তোরাঁ ছাড়া সুপেয় পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া রসুইঘরে খাবারের ঘ্রাণে দোলন-দোলাকেও বেশ কাছে টানছে।

দোলন-দোলা সোনামণিদের নিয়ে আলো আঁধার রুমে বসে আছেন। কেতাদুরস্ত ওয়েটার মেনু চার্ট নিয়ে হাজির। চিকেন তন্দুরি জুস লাচ্ছি আইসক্রিমের ফরমায়েশ হয়ে গেছে। মাইকেল জ্যাকসনের ‘মুনওয়াক’ গানের সঙ্গে সঙ্গে সোনামণিদেরও পা দুলছে।

হঠাৎ দোলনের প্রশ্ন: ‘খোকা, তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো? বাবাকে না মাকে?’

নোয়েল: মা’কে বেশি ভালোবাসি।

দোলন: কেন বাবা?

নোয়েল: তুমি মাঝে-মাঝে মিথ্যা না বললে আমাদের বকা দাও।

দোলন: কী মিথ্যা?

নোয়েল: কেন মনে নেই তোমার! গতকালও তোমার কথায়, ফোনে কলি আন্টিকে বলেছি, ‘বাবার জ্বর কথা বলতে পারবে না।’

মুহূর্তে রাগে দোলনের চেহারায় আষাঢ়ের কালো মেঘের গর্জন শুরু হয়ে গেছে। রেস্টুরেন্টে না থাকলে নির্ঘাত সোনামণি নোয়েলের ওপর বৃষ্টির বদলে হাতের বজ্রমুষ্টি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। চামচা মনের স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ শেখাতেন।

বাবার নির্দয় ক্রোধ দেখে নোয়েলের বোন দোয়েল কাঁপছে, চামচা মনে বাবার ভালোবাসা পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করছে।

ওয়েটার খাবার সাজিয়ে রেস্তোরাঁ ও দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করে চলেছে।

ওয়েটার: স্যার, আপনি বেশ স্মার্ট! নিশ্চয় আপনি; কোনো গ্রুপের চেয়ারম্যান কিংবা উঁচু দরের সরকারি কর্মকর্তা হবেন। এ রেস্তোরাঁয় আমি অনেক দিন ধরে কাজ করছি; মানুষ চিনতে অন্তত ভুল করি না স্যার।

এখন দোলনের চেহারায় মেঘের ঘনঘটা নেই, চামচামি স্তুতি শুনে সব কালো মেঘ সরে গেছে। আনন্দের চন্দ্রকিরণ লিক করে দিনের বেলায়ও চুইয়ে পড়ছে।

মেধাবী দোয়েল খেতে-খেতে রেস্তোরাঁ ওয়েটারের সব চামচামি স্তুতি মুখস্থ করে নিয়েছে। মনে-মনে ভাবছে, ’আহা!’ মা, ভাইয়া আমি যদি আরও আগে এখানে আসতাম; বাবার কাছে কতোই না নিরাপদে থাকতাম।

সবার খাবার শেষের দিকে, নোয়েল বাবার ধমক খেয়েও কিছু মনে করেনি, ও একটা ইতর! ত্যান্দোড় বাঁদর। প্রথমদিকে বাবার মিথ্যা ট্রেনিং একেবারেই হজম করতে পারত না; এখন অবশ্য বাবা, স্কুলের টিফিন খরচ ‘আনলিমিটেড’ করায় বাবার হয়ে কিছু মিথ্যা তাকে বলতেই হয়। তা ছাড়া বাবার মোবাইলে পাবজি, কেরাম, টিকটক গেইম তো লোডেড আছেই। ‘কোন আইসক্রিম’ নোয়েলের বেশ পছন্দ আইসক্রিম ও পাবজি গেম বলতেই নোয়েল দিশেহারা।

এখন নোয়েল চিৎকার করে কোন আইসক্রিম চাইছে। ওয়েটার যে মাত্র আনতে যাবে- বাবা থামিয়ে বলেন, ‘ওর ঠাণ্ডা লাগবে সাইনাস সমস্যা আছে’ আনতে হবে না।

ওয়েটারের মোটা বখশিশ চুকিয়ে বাবা আমাকে বলেন, ‘মা তুমি কিছু নেবে?।’ সামনে পুতুলের দোকান।

ওয়েটার আংকেলের কৌশলে বাবাকে বললাম, তুমি আমার লক্ষ্মী বাবা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি। দেরি না করে বাবা আমাকে দামি পুতুল কিনে দিলেন।

এ দিকে মা-ও ‘ওয়েটার চামচামি কৌশল’ শিখে নিয়েছে। গদগদ স্বরে বাবাকে বলেন, ওগো আমার নটরাজ, তুমি আজ আমাদের জন্য যা করেছ না; আমি অনেক দিন মনে রাখব। সারাদিন কতো খাটুনি কর, তোমাকে আজ বেশি সুন্দর লাগছে।

বাবা হেসে বলেন, থাক তোমার এতো প্রশংসা করা লাগবে না। আজ সূর্য কোনদিকে উঠেছে গো! বিয়ের পর হতে আজই প্রথম আমার প্রশংসা করলে; তাড়াতাড়ি বলো তোমার কী লাগবে।

এ দিকে আমার আদরের ভাইটির মুখ বন্ধ রাখতে পারছি না। ও হারমোনিয়াম গজল রাগ স্কেলে বাবার নির্মম বন্দনাগীত গাইছে।

বাবাকে যতোই বলছি, বাবা একটা আইসক্রিম কিনে দাওনা, এমন কী হয়েছে?

বাবা: ও! তুই যখন বলছিস-তাহলে কিনে দেই। কিন্তু একদিন দেখে নিস! ও জীবনে কোনোদিনই কিছু হতে পারবে না, করতে পারবে না।

আমি বললাম: কেন বাবা?

বাবা: ও আমার মন বোঝে না। তাতে কী? হয়েছে বাবা, ‘ও তো ছোট।’

- না, ওকে তুই আমার হয়ে, সবার মনের মতো হতে ‘ট্রেনিং দিবি।’

বাবা: শোন দোয়েল, পৃথিবী সৃষ্টির পর হতে এ পর্যন্ত কাউকে কী দেখেছিস; রাজা-প্রজা ভৃত্য, এমন কী স্বর্গের দেব-দেবী পর্যন্ত, স্তুতি পছন্দ করেনি?

আমি বললাম: কী-যে বলো না, আমার লক্ষ্মী বাবা।

বাবা: শোন! চামচামি হলো এক ভয়ঙ্কর সাহিত্য! বিনা পরিশ্রমে তর-তর করে সহজে উপরে উঠার সিঁড়ি। ধরো, তুমি যখন স্কুলের টিচারদের পাঠের ভুল ধরে নৈতিকতার প্রশ্নে আপসহীন হবে, তখন তুমি হয়ে যাবে চরম বেয়াদব, আপস চামচা মনে যখন শিক্ষকের স্বরে-সুরে প্রশংসা করবে, অবশ্যই শিক্ষকের প্রীতি লাভ করবে।

এই যে ধরো তোমার মা; আমি দুর্নীতিপরায়ণ বলে, বিয়ের পর হতে তোমার মা সততার বড়ি পিষে-পিষে সকাল দুপুর সন্ধ্যাবেলা খাইয়েছে। আমার শরীরে করোনার মতো দুর্নীতির অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে বলেই আমাকে কাবু করতে পারেনি। সারাজীবন আমি দোলন হয়ে সবার মনে-প্রাণে গলায় দোল খেয়েছি, আরও খাব। আমার কোথায় মন, কোথায় প্রাণ, কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা, দিন-রাত কেউই বুঝতে পারবে না। মনে রাখবে, ‘চামচা মনে নিরাপদ জীবন।’

দোলনের ছোট ছেলে ‘নোয়েল’ আইসক্রিম না পেয়ে এখনো কী কাঁদছে? [পাঠক খোঁজ পেলে জানাবেন]

লেখক: রাজীব কুমার দাশ, প্রাবন্ধিক ও কবি, পুলিশ পরিদর্শক

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত