ঢাকা, শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১, ১ কার্তিক ১৪২৮ আপডেট : ২ মিনিট আগে

বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি: প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা

  মো. আনারুল ইসলাম

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:১০  
আপডেট :
 ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:৫০

বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি: প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা
ছবি- নিজস্ব
মো. আনারুল ইসলাম

১৯৭১ এ যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে ঢেলে সাজাতে এবং শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে যেমন দরকার ছিলো একটি শক্তিশালী সরকার, তেমনই দরকার ছিলো তার সুদক্ষ ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি।

আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা যতই স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক না কেন সৎ প্রতিবেশী নীতি এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে তার সম্পর্ক ও ক্রিয়াকলাপ দিয়ে নির্ধারণ করা হয় তার সক্ষমতার অবস্থান। আর সেজন্য আমাদের মত ছোট দেশের দরকার বন্ধুত্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ এই নীতির উপর ভিত্তি করে বঙ্গবন্ধু যে বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপন করে গেছেন তার নজির বিশ্বে দৃষ্টান্তস্বরূপ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার ছিলো অনেক প্রভাব। আর চীন ছিলো উদীয়মান শক্তি। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু সবার আগে বড় যে বৈদেশিক নীতিতে সফলতা লাভ করলেন তা হলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায়। যে দেশ যুদ্ধের সময় পাকিস্তানকে সমর্থন করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রণতরী প্রেরণ করলো, সে দেশই দুই মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়ে দিলো এবং সঙ্গে দিলো ৩০০ মিলিয়ন আর্থিক ডলার অনুদান। এমন কারিশম্যাটিক পররাষ্ট্রনীতি এর আগে আর কোথাও বিশ্ববাসী দেখেছে কিনা তা সন্দেহ। যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়া বাংলাদেশের পক্ষে থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের এমন সমর্থন পাওয়া বাংলাদেশের পক্ষে স্বপ্নের মত একটা ব্যাপার ছিলো।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে তিনি এক বেতার ভাষণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট ও বুদ্ধিদীপ্ত ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘‘পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য- লড়াইয়ে আমরা কোনোমতেই জড়িয়ে পড়তে পারি না। আমরা ইতিপূর্বে ‘সিয়াটো- সেন্টো’ ও অন্যান্য সামরিক জোট থেকে সরে আসার দাবি জানিয়েছি। ভবিষ্যতেও এ ধরনের কোনো জোটে জড়িয়ে না পড়ার ব্যাপারে আমাদের বিঘোষিত সিদ্ধান্ত রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নির্যাতিত জনগণের যে সংগ্রাম চলছে সে সংগ্রামে আমরা আমাদের সমর্থন জানিয়েছি’’ (ড. এ. এইচ. খান, ২০০৯)। একইভাবে তিনি তার আত্মজীবনীতে বলেন, ‘‘আমাদের বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য সাহায্য করা দরকার। দেশের জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও তা জরুরি” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষায় তার এই শান্তির অগ্রিম বার্তা তিনি তার লেখা ‘আমার দেখা নয়া চিনে’ও দিয়ে গেছেন।’’

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চট্টগ্রাম ও চালনা সমুদ্র বন্দরকে মাইন মুক্ত করার জন্য সোভিয়েত রাশিয়া প্রস্তাব দিলে বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামের বন্দরের দায়িত্ব রাশিয়াকে দিলেও চালনা বন্দরের দায়িত্ব দেন জাতিসংঘকে। সোভিয়েতকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বিশ্ব মোড়লদের কাছে যেনো চোখের বালি না হতে হয় সেজন্যই বঙ্গবন্ধু এমন অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। অথচ চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন অপসারণে ভারতীয় নৌবাহিনীরও আগ্রহ ছিলো। কিন্তু ভারতের প্রতি নির্ভরশীলতা কমাতে বঙ্গবন্ধু তাদেরকে এ সংশ্লিষ্ট কাজ থেকে দূরে রাখলেন। এমন প্রত্যুৎপন্নমতি রাষ্ট্র নায়ক তখনকার বিশ্বে একেবারেই কম ছিলো বলা যায়। স্বাধীন হওয়ার পর মাত্র দুই বছরের মধ্যে ১১৬টি রাষ্ট্রের সমর্থন আদায় করার জন্য কতটা কৌশলী ও বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া দরকার তা আজকের স্বাধীনতা সংগ্রামী ও নবীন দেশের নেতৃবৃন্দ মাত্রই হাড়ে হাড়েই উপলব্ধি করেন।

স্বাধীন হওয়ার পর পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ চির বন্ধুত্বের নীতি ঘোষণা করলেও পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। একটি দেশ স্বাধীন হলে সে নবীন দেশের সবচেয়ে বড় ও স্পর্শকাতর চ্যালেঞ্জ হলো মিত্র দেশের সৈন্যদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। কুয়েত, ইরাক, আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এটা বেশ উপলব্ধি করতে পারি। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুজিব সরকারের প্রথম বিদেশ সফরকালে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাত করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিনয়ের সাথে অথচ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন যে বাংলাদেশের মত একটি দরিদ্র দেশের পক্ষে তার দেশের বিশাল বাহিনীকে লালন পালন করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি তিনি এদেশের মুক্তি সংগ্রামে তার দেশের সাহায্য সহযোগিতার কথা সবার আগে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। নিপুণ ও দূরদর্শী এই আলাপচারিতায় পরের মার্চ মাসের মধ্যেই ভারত সরকার বাংলাদেশ থেকে তাদের বাহিনী ফিরিয়ে নেয়। কতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ তিনি ছিলেন তা আজকে বিদেশি সৈনিকদের বিভিন্ন দেশে তাদের অবস্থানকাল দেখেই উপলব্ধি করা যায়।

১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্স এ তৎকালীন সৌদি আরবের বাদশা ফয়সালের সঙ্গে যে সাহস ও প্রত্যয় নিয়ে ধর্মীয় সিদ্ধান্ত তথা হজ্জের বিষয়ে আলাপ করেছিলেন তা ছিলো বাদশা ফয়সালকে অনেকটা পরাজিত করে ফিরে আসার মত। তখন বাংলাদেশি মুসলমানগণকে ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে হজ্জ করতে যেতে হতো এবং অনুমোদন পেতো এমন হাজির সংখ্যা ছিল খুবই কম। কয়েক মিনিটের এক বৈঠকে সৌদি দাবি করেছিলেন নিজ দেশের পাসপোর্ট নিয়ে হজ্জে আসতে হলে বাংলাদেশকে তার নাম পরিবর্তন করতে হবে। তবেই তিনি তার সমর্থন দিবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেখানে চোখে আঙ্গুল দিয়ে ফয়সালকে নিজের দেশ দেখিয়ে দিলেন এবং বললেন যে, বাদশা সৌদের নামে যদি সৌদি আরব রাখা যায় তাহলে কেনো বাংলাদেশ বাঙ্গালি জাতির নামে হতে পারে না। পাশাপাশি তিনি এটাও বুঝিয়ে দিলেন যে হজ্জ পালন করা অন্যান্য মুসলিমদের মত বাঙালী মুসলমানদের হক। একজন মুসলমান হয়ে তিনি বাঙ্গালি মুসলমানদের সে অধিকার রহিত করতে পারেন না। বাদশা ফয়সাল আলোচনা থেকে রেগে উঠে যাবার সময় তিনি তাকে শুনিয়ে সুরা কাফিরুনের শেষ আয়াতটি পাঠ করে বলে দিলেন, ‘লা-কুম দ্বীনুকুম ওয়ালিদ্বীন।’’

বঙ্গবন্ধুর শাসনকালেই ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়। একই দিনে স্বীকৃতি দেয় তুরস্ক। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় স্বাধীনতার এক মাসের মধ্যে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কাজ করেন বিশ্ব মানবতা ও শান্তির লক্ষে। আর তারই স্বীকৃতি হিসেবে তিনি লাভ করেন জুলিও কুড়ি শান্তি পুরস্কার। একজন ইতিহাস জানা ও বিবেক সম্পন্ন মানুষ মাত্রই তার এই দূরদর্শী পররাষ্ট্র নীতিকে গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে স্বীকার করবেন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো যখন বুঝতে পারলো যে শেখ মুজিব গণতন্ত্রপন্থী হলেও তার চিন্তায় বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের বীজ রয়েছে তখনই তাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এদেশি ক্ষমতালোভী ও বিবেকহীন কিছু কথিত নেতার সাথে যোগাযোগ শুরু করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের শেষ রাতে, খুব ভোরে নিজের পরিবারের সকল সদস্যসহ ও আত্মীয় স্বজনসহ কিছু বিশ্বাসঘাতক ও বিপথগামীদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন। ভাগ্য গুণে বেঁচে যান তার দুই তনয়া- হাসিনা ও রেহানা। আর তারই সুযোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে তার পররাষ্ট্র নীতির আদলে দেশ পরিচালনা করছেন সেই বেঁচে যাওয়া বড় কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জানাই। তার পরিবারের সকল সদস্যদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং দেশ নায়ক শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের উত্তরসূরিদের নেক হায়াত ও কল্যাণময় জীবন কামনা করি। যতদিন এ দেশ বেঁচে থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু আমাদের হৃদয়ে এদেশের সেরা বাঙ্গালি, মহান নেতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন রাজনীতিবিদ হিসেবে স্মরণ করা হবে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে এই কামনাই করি।

লেখক: প্রভাষক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত