ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ৪ মাঘ ১৪২৮ আপডেট : ৫৮ মিনিট আগে

কাণ্ডারি: হাল সামলান শক্ত হাতে

  মোস্তফা কামাল পাশা

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ২২:৫৪

কাণ্ডারি: হাল সামলান শক্ত হাতে
মোস্তফা কামাল পাশা

ভয়ঙ্কর ঘোট পাকাচ্ছে -অন্ধকারের ভূত-প্রেত! সরকারি দায়িত্বশীল, মন্ত্রী, এমপি, নয়া বুদ্ধি বণিক, পেশাজীবী নেতা সবাই আছে মৌতাতে। সাথে পদ বোঝার অহংকারে ন্যূব্জ নেতাসকলের মস্তি-মউজ, ফূর্তির ঢেউ চার দেয়াল পেরিয়ে বাইরেও আছড়ে পড়ছে! বাক্য বিলাসি ভিআইপিকুল ফুটপাত ক্যানভাসারের সাথেও বুদ্ধি-জ্ঞানে পাল্লা টানতে ব্যার্থ! আয়েশ, আমেজ, কথামালার খইভাজা চলছেতো চলছেই! টানা ক্ষমতার তাপ এদের বুদ্ধিবৃত্তি-মননের আব্রু পুড়ে খুলে এক্কেবারে দিগম্বর সর্বভুক বানিয়ে দিয়েছে। দিগম্বরদের চারপাশে টানা নেচে-গেয়ে যাচ্ছে উচ্ছিষ্ট শিকারি নানা নাম ও বর্ণের অকর্মা বেকার টোকাই দল। এরা পদভারে কাহিল নেতাদের আকাশে তুলে আরামের দোল দেয় আবার ধুম করে ফেলে আলুভর্তাও বানায়!

সুযোগটা লুফে নিয়েছে অন্ধকারের কীটপতঙ্গ ও মাফিয়া কর্পোরেট! তারা মিলেজুলে নেতাদের হিস্যা বুঝিয়ে দিয়ে পুরো বাজার ব্যবস্থা ও রাজনীতিকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে, যাতে দ্রুত সরকারকে উল্টে দেয়া যায়। এর মাঝে ডালপালা ছাটাই ও শিকড়ে বিষাক্ত অনুজীব ছড়ানোর প্রক্রিয়া প্রায় শেষ। এখন শুধু জননেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কাবু করা গেলেই ধাক্কা দিয়ে আওয়ামী বটবৃক্ষ উপড়ে ফেলার যত আয়োজন! কখন যে মাননীয়দের ঘুম ভাঙবে! নেশাকাতর সুখী বপু বা মর্দন, মালিশ পলিশের স্লিম তনু শরীফ পাঁচতারা আয়েশ থেকে বাস্তবতার কঠিন জমিতে বস্তার মত আছড়ে পড়বে? খোদাই জানেন!

মাঝে মাঝে গায়ে চিমটি কাটি। নিজের অস্তিত্ব বায়বীয় কি-না যাছাই করতে! হ্যাঁ,ব্যাথা পাই- বুঝি শরীর আছে, বায়বীয় বা জেলি জাতীয় পিছলা পদার্থ না। মানুষ হিসাবে জন্মসূত্রে প্রাপ্ত রক্ত মাংসের পিণ্ডটা বয়ে বেড়াচ্ছি, নিজ হেফাজতে! কিন্তু চারপাশের চলমান ঘটনাপ্রবাহ, বাস্তবতা বারবার আচ্ছন্ন ও বিভ্রান্ত করে দেয়। বুঝি নিজে মাানুষ না-দু'পেয়ে একখণ্ড মাংসপিণ্ড! মানুষ হলেতো মানবিক বৈশিষ্ট্য থাকতোই, একফোঁটাও নাই! মানুষের মানচিত্রখান আছে! তাহলে? জেলিফিশ! তা কেন হতে যাবে? এমন হলে স্বচ্ছ, পিছলা, পৃথিবীর সবচে' বিষাক্ত কুৎসিত কিলবিলে জীব হতাম! হইনিতো-ধ্যাৎ হয়নি, দাবি কোন সাহসে? আসলে মানবিক অবয়বে আমিও এক ভয়াল জেলিফিশ! মানবিক গুণ বিলকুল নেই-উল্টো মিথ্যা, ভণ্ডামি আর ব্যক্তিস্বার্থ শিকারের ক্রূরতায় বিষাক্ত জেলিফিশ আমার কাছে খরগোশ শিশুর চে'ও আনাড়ি! না, বিষয়টা তাত্বিক কিছু না। যা সত্য তাই অকপটে স্বিকার করছি। জেলিফিশের সাথে সহাবস্থান করে কীভাবে মানুষ থাকি?

দেখুন চারপাশে, অগুনতি সুখী দু'পেয়ে কতো না আমোদ-আহলাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরা সবাই আমার জাত ভাই। ভায়রা ভাই নাইবা হলো, দোষ কী! পৃথিবী কাঁপানো মহাপুরুষেরা কেউ বিলিওনিয়ার এমনকী মিলিওনিয়ার ক্লাবেরও মেম্বর ছিলেন না। দেশে-বিদেশে তাদের নামে-বেনামে বিপুল বৈধ-অবৈধ সম্পদের পাহাড় ছিল না। তারা অন্য দশ সাধারণের মতো খুবই সাধারণ জীবন নির্বাহ করেছেন। দূরদেশ ঘোরার পেরেশানি নেয়ার দরকার নেই। ঘরের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের মহান জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর জীবনচিত্র ঘুরে আসুন এক ঝলক। দেখুন, তাদের একজন মাত্র ৫৫ বছরের জীবনের অর্ধেকের বেশি কাটিয়েছেন জেলে। বাকিটা অর্থাৎ ২৫ বছর ছিলেন দৌড়ের ওপর। একটাই লক্ষ্য ও অভিষ্ট, বাংলার শোষিত মানুষের মুক্তি। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কী খেয়েছেন বা খাননি, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা বা পরিবারের সদস্যরা ভুক্ত না অভুক্ত, এসব ভাবার সময় কখনো পাননি। মন-মগজেও নেননি। সম্পদের পাহাড়-টিলা গড়াতো তাঁর দুঃস্বপ্নেও ঠাঁই পাবার কথা না। মওলানা ভাসানীতো যেখানে রাত সেখানে কাত! কেউ দিলে খেয়েছেন, নাহলে পোটলা বাঁধা শুকনো চিড়ে গুড়। বেশি উদাহরণ টানার সুযোগ এখানে নেই। ওনাদের জীবনী, আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, চীন ভ্রমণসহ বইগুলো পড়লে পুরো বিষয় ফর্সা হয়ে যাবে।

তাহলে আমরা কী করছি বা কোথা যাচ্ছি! ইউপি ভোট, মনোনয়ন, প্রার্থী ও মার্কা বাছাই বাণিজ্য, অতপর ডিগবাজি, এ নিয়ে যা একখান কাণ্ড হয়ে গেল সরকারি দলে! ভোটের আগে বুকে, গলায় নৌকা সেঁটে আড়ালে ডিগবাজি খাওয়ার টাকা গিলে নৌকা ফুটো করার উদাহরণ বিস্তর। এদের ছায়া ও বল দিয়ছে 'আামার ভাই-তোমার ভাই' স্লোগান ডোবায় সাঁতরানো নানা গ্রুপ, উপ-গ্রুপের নেতার ঝাঁক। নিজের ইউনিয়নে বাস্তব ডেমনেস্ট্রেশান খুব কাছ থেকে দেখেছি। দলীয় শৃঙ্খলার অভাব ও আদর্শিক চ্যূতি সরকারি দলের এখন সবচে' ভয়াল রোগ। আদৌ সুচিকিৎসা হবে কিনা জানি না। না হলে সংক্রমণ বাড়বে আরও দ্রুত।

ভাবতেও কষ্ট হয়-নিজেদের শিক্ষিত, জ্ঞানী দাবি করি আমরা। কিন্তু মূল মজুদ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি! ওটাই গুলে খাই পুরো জীবন। সারা পৃথিবী সব'কটা জানালা খুলে দিয়েছে সামনে! বিপরীতে আমরা গড়ান দিচ্ছি নুন-পিঁয়াজের বস্তায় অথবা ভেজাল তেলের পিপেয়! নিজের বিষয়-আসয়, স্বার্থ ছাড়া দ্বিতীয় চিন্তা মগজে নেই। ন্যাতা- কেতাদের কথা বাদ থাক! পাশের মানুষটি এমনকী মায়ের পেটের ভাইবোনও ভুক্ত না অভুক্ত, সুস্থ কী অসুস্থ, উঁকি দেয়ার সময় নেই। নিজের কাছের বা একই পেশার যোগ্য মানুষটি কষ্টে থাকলে, অস্বচ্ছল বা অসুস্থ হলে আনন্দ পাই-নিজের বিশাল বৈভব বা গ্রহ-গ্রহান্তর পরিভ্রমণের মজার বাড়তি আনন্দে দু'ঢোক বেশি গিলে ভূড়িতে তবলা ঠুকি! এটাকে বলে 'স্যাডিষ্ট প্লেজার'! রাজনীতি থেকে শুরু করে সবখানে হুজুগ আর গুজবের চাষ! বিশ্ব বাতায়ন খোলা থাকলেও আমরা এমনকি সুশীলরাও অন্ধ। টিভি টক 'শো, ভাষণ-বাসন-বাণীতে নিজের ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম, টুইটার হ্যান্ডেলে ভুল-শুদ্ধ মিশেলে সুন্দর নীতিকথা, আদর্শের কথা প্রচার করি। কেউ কেউ সব সামাজিক বন্ধন গুটিয়ে ফেলে সাইবার যোগাযোগ মাধ্যমে গুঁজে রেখেছি। তাইতো মূলধারার গণমাধ্যম নয়, ফেসবুকের ভাইরাল আইটেমের উপর আস্থা রাখি বেশি। এর সাথে আস্তাকুঁড়ের মশা, মাছির মত অবাধ বংশবৃদ্ধি ঘটছে আইপি টিভি নামের 'ফেবু টিভির'। গ্রাম মহল্লা সবখানে 'প্রেস' স্টিকার ঝুলিয়ে এরা হাবিজাবি গিলাচ্ছে, বেকুব পাবলিককে। ইউপি নির্বাচনী প্রচারনা ব্যবসা ঘিরে এদের জন্ম হার বেড়েছে বানের তোড়ে। তদারকি কর্তৃপক্ষের 'পিঠে কুলো, কানে তুলো'!

সাথে নতুন যোগ ডিজেল, গ্যাসের দাম ববৃদ্ধিজনিত পরিবহন সঙ্কট। সড়ক শৃঙ্খলা ফেরাতে ছাত্র জাগরণের পর নতুন পরিবহন আইন পাশ করে তা শিথিল ও সীমিত বাস্তবায়নও সম্ভব হয়নি, পরিবহন সেক্টরের চিহ্নিত চাঁদাখোর নেতাদের শক্তিশালী প্রভাব ও দাপটে। এতে তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথেই অঘোষিত ধর্মঘটের নামে জেলায় জেলায় শুরু হয় আকস্মিক পরিবহন চাকাবন্ধ কার্যক্রম। পরপর দেশব্যাপী! একের পর অনাহুত দুর্ভোগ নামে জনজীবনে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় পরিবহন ভাড়া আরও ৫% বেশি বানানো হয়। আবার ছাত্রদের আধা ভাড়ায় যাতায়াত সুবিধা লাভের দাবি ঝুলিয়ে রাখা হয় পরিবহন মালিকদের অন্যায় দাবির চাপে। শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয় পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আগে। কিন্তু তাও রাজধানীর জন্য। বিশ্বাস, দেশব্যাপী সিদ্ধান্তটি শীগগির বাস্তবায়ন হবে।

এদিকে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির সুযোগে মজুদদারেরা বাড়াচ্ছে চাল, তেল, ময়দা, চিনিসহ অত্যাবশ্যকীয় সব নিত্যপণ্যের দাম। চালসহ বাজারে নতুন সবজি আসলেও দাম সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে! বিস্ময়কর নয় কি! এসব আজাব-হুজুগ জন দুর্ভোগের দায় সরকারসহ দায়িত্বশীল সব পক্ষকে নিতেই হবে। দায়মুক্তির সুযোগ কারও নেই। এ দেশে পেঁয়াজের মতো চামচিকেও হঠাৎ হাতি হয়ে যায়! বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের ন্যূনতম দায়বদ্ধতা নেই বলে এমন সব কাণ্ড ঘটে। গত বছরের আক্রার সময় হাজার হাজার টন পেঁয়াজ পচিয়ে পরিবেশ পূষনের পাশাপাশি দশগুণ বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এমন বিকৃত মানসিকতার লোভি দানব ছাড়া সুস্থ মানুষের পক্ষে অসম্ভব! বিকৃতি ও অন্যায় অর্থলোভ খুনের চে'ও বড় অপরাধ! বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিত্য পণ্য আমদানি ও জরুরি টাস্ক ফোর্স গঠন করে সীমিত দামে সরবরাহ করলে পরিস্থিতি সহজে সামাল দেয়া সম্ভব। ঢিলেমির ফলে মানুষ আস্থার সঙ্কটে পড়ে। সরকারের আশ্বাসে বিশ্বাসই রাখতে পারে না। চাল, ময়দাসহ অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্যেও এর কঠিন প্রভাব পড়ে। এটা দেশ ও জাতির জন্য কোনভাবেই ভালো লক্ষণ নয়। রাজনীতি চলছে নিজস্ব ধারায়, ছড়াচ্ছে পচন-দুষণ!

সরকারি দলের নেতারা ভোগ-বিলাসে ডুবে নীতি ও সততার দীক্ষা দিচ্ছে! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই দেশের একমাত্র ভরসা। তিনি বিভিন্ন ভাষণে বারবার বলছেন, 'সৎ পথে থেকে নুনভাত খাওয়ার আনন্দ, লুঠ বা দুর্নীতির পথে অর্জিত লাখ টাকার শানদার ভোজে মেলে না, চোর-চোর কাঁটা বিঁধে থাকে'। কিন্তু নেতারা শুনলেতো! তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দেশের মানুষের কল্যাণই তার একমাত্র চাওয়া-পাওয়া। মানুষের কল্যাণে বাবার মতো হাসিমুখে জীবন দিতে তিনি সবসময় প্রস্তুত আছেন। কিন্তু তার চারপাশে যে মাফিয়া কর্পোরেট, ভাঁড়, চামচা, জোকারের ঘৃণ্য পচা ফোমের স্তুপ! এই ব্যূহ ভেঙেচুরে এগুনো মোটেই সহজ না। বিএনপিতো বেগম জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসা ছাড়া দেশের সমস্যাই দেখছে না! দেশের সুশীল ও গলাবাজ পেশাজীবী নেতারাও ক্ষমতার মধু ছাড়া আর কিছুই দেখতে রাজি না! সরকারের সুবিধাভোগী মিডিয়া, পেশাজীবী নেতা বা রাজনীতিক কেউ সমস্যা উত্তরণে উদ্বুদ্ধকরণ প্রচারণা অভিযানে নামেনি। কুষ্ঠরোগীর মতো সমস্যার পাশ কাটাচ্ছে। বাস্তবে তারা ফুটপাত ক্যানভাসারের আধুনিক সংস্করণ! যুক্তি, জ্ঞান, মনন সব ফোকলা! তা'ছাড়া পরিবহন ভাড়া কিলো ২০ টাকা বা চাল-ডাল, তেল চিনি হাজার টাকা কেজি বিক্রি হলেও তাদের কী এসে যায়? ভাণ্ডারতো অফুরন্ত! হুজুগে মধ্যবিত্ত শ্রেণিটাও একটু সচেতন এবং দেশ ও মানুষের প্রতি ন্যূনতম দায়বদ্ধ হলে আমরা বহু আপদ নিজেরাই দূর করতে পারি। কিন্তু নিজের পাতে সব ঝোল মাখাতে গিয়ে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে ফেলছি। মাঝখানে গুজব দানব ও স্বার্থান্বেষীরা ক্ষমতাশ্রয়ীদের দলে টেনে গোলায় ফায়দা তুলে নিচ্ছে ষোলআনা। কৌশলে অনাকাঙ্ক্ষিত নানা ইস্যু তৈরি হচ্ছে! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান আটকে দিতে অন্ধকারের দানব শক্তি ঘরে-বাইরে অলিখিত জোট তৈরি করে চক্রান্তের এসব সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। এদের না থামালে দেশ ও জাতি ঘোর অন্ধকারে তলিয়ে যেতে বাধ্য।

মোস্তফা কামাল পাশা, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত