রোকেয়া হলের দিনগুলি

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২২, ১৭:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ

  শিরিন হোসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম ১৯৭৪ এর মাঝামাঝি থেকে ১৯৮০ এর প্রথম পর্যন্ত। নব্য স্বাধীন দেশ, এ সময় স্বাধীনতার আনন্দ, উন্মাদনা যেমন ছিল, তেমন ছিল বিশৃঙ্খলা, এ সময়ে ঘটেছে নির্মম সব হত্যাকাণ্ড। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফ হত্যাকাণ্ডসহ বীনা কারণে আরও কত নিরীহ মানুষের হত্যাকাণ্ড। এরকম সময়েই পড়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ে, থেকেছি রোকেয়া হলে।

রোকেয়া হল, সে আর এক জগৎ। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে কিন্তু হলের আবাসিক ছাত্র/ছাত্রী ছিল না, তারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাজীবনের অর্ধেক আনন্দই মিস করেছে। হল জীবনের শিক্ষা, জীবন সংশ্লিষ্ট শিক্ষা। ভিন্ন পারিবারিক শিক্ষা, ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা সদ্য তরুণীরা এক রুমে অংশীদারিত্ব নিয়ে থাকা। এখানেই শিক্ষা অন্যের সাথে মানিয়ে চলার, শেয়ারিং, কেয়ারিং এর। নিজের ঘর, পোশাক পরিচ্ছদ গুছিয়ে পরিপাটি করে রাখা, রান্না-বান্না আরও কত কিছু।

রোকেয়া হল অনেকের কাছে, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কাছে এক রহস্যময় এলাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে বন্ধুরাও একেক সময় আবদার করতো,"আচ্ছা তোমাদের হলের ভেতরে একবার নিয়ে যেতে পার না"? 

রোকেয়া হলে কত গল্প, কত ইতিহাস!  কত তরুণীর শিক্ষার জন্য প্রাণপণ লড়াই। কেউ টিউশনি করে কেউবা নিষিদ্ধ জগতে পা রেখে পড়ার খরচ জোগার করেছে। তবে শুধুমাত্র আনন্দ আর বিলাসিতার হাতছানিতেও কেউ কেউ নিষিদ্ধ জগতে ঢুকে গেছে। দেখেছি হলের অভ্যন্তরীণ সামান্য সমস্যা কী ভাবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ভার্সিটির বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয়েছে হলে মেয়েদের মধ্যে মারামারি, ক্রমশ তা ছড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে, শেষ হলো গোলাগুলিতে। ফলস্বরুপ আমাদের অনার্স পরীক্ষা স্থগিত। তার ফলস্বরুপ অনেকের বিবাহ স্থগিত। একইসাথে জন্ম নিয়েছে কিছু নেতৃত্ব যাকে বলা হয় "সিচ্যুয়েশনাল লিডার"।

হলে ছিল খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান শেখাতেন বিখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী কলিম শরাফি। দেখা মিলেছে নামকরা সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্যের সাথে।

গল্প আড্ডায় ভূত হরহামেশা আসতো। কেউ কেউ তার সাক্ষাৎও পেয়েছে। ভাঙগা গড়া দেখেছি প্রেমের। 

দেখেছি হলের নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শনিবার সন্ধ্যায় দলবেঁধে একদল নারীর হল ছেড়ে ডিসকো পার্টিতে যেতে। হলে ছিল সমকামিতার মত ঘটনা। 

মজার বিষয়ও কম ছিল না। হল রুমে টিভি দেখা, উত্তেজনার মুহূর্তে সকলে একসাথে চিৎকার করে উঠা। সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান, হাওয়াই ফাইভ ও, নাইট রাইডার, ওয়ান্ডার ওম্যান এর মত জনপ্রিয় সিরিয়ালের দিনে সোফার সিট দখলের বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন, কত কিছু। মনে পরে সাবসিডিয়ারি পরীক্ষার আগের রাতে সারারাত জেগে নাটক 'ইডিয়ট' দেখা।

হলে রুমে রান্না করা নিষিদ্ধ ছিল কিন্তু বেশিরভাগ ছাত্রী রান্না করতো । হাউজ টিউটররা রুম ভিজিটে বের হলে সারা হলে কীভাবে যেন জানান হয়ে যেত। সাথে সাথে সবার হিটার, চাল, ডাল, তরি-তরকারি সব গায়েব। মনে হয় হাউজ টিউটর আপারা সবই বুঝতেন, কোথায় লুকিয়েছি তাও বুঝতেন কিন্তু হাতেনাতে ধরতেন না। সব রুম একবার চক্কর দিয়ে চলে যেতেন।

হলে খাওয়া বাধ্যতা মূলক করে মাসিক টাকার বদলে টিকেট সিস্টেম চালু করা হলো। কিন্তু সেই টিকিটের কোন তারিখ নেই, সিল নেই। আপারা টিকেট জমাও নিতেন না। রোজ একই টিকেট দেখিয়ে সামনের দরোজা দিয়ে ডাইনিং রুমে ঢুকে নীরবে পিছনের দরোজা দিয়ে বের হয়ে যেতাম। যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে লম্বা ছুটির কারণে হল বন্ধ হতো আর আমরা সবাই বাড়ি ছুটতাম তার আগের দিন রাতে হলে খেয়ে টিকিটটা জমা দিতাম। 

সুঃখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কত গল্প, কতকথা, সব কী একদিনে বলা যায়? তাই এবার লিখব "রোকেয়া হলের দিনগুলি"।

লেখক: উন্নয়ন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ

বাংলাদেশ জার্নাল/এমএম