ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯ আপডেট : ৭ মিনিট আগে

কিশোর গ্যাং ও টিকটকাররাই কি যুবসমাজের আদর্শ

  গাজী কাইয়ুম

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২২, ১৯:১৭

কিশোর গ্যাং ও টিকটকাররাই কি যুবসমাজের আদর্শ
গাজী কাইয়ুম

মেলা দিন ধরেই টিকটকারদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন মহলে কথা হচ্ছে। হাইকোর্টেও টিকটক কেন বন্ধ হবে না তার জন্য রিট জারি করা হয়েছিলো। টিকটক সম্পর্কে তেমন ধারণা ছিলো না। কিন্তু যখন শুনলাম এরাই নাকি নব্য কিশোর গ্যাং। ভারতে একটি নারী পাচার সিন্ডিকেট ধরা পড়ার পর জানা গেলো এরা মূলত টিকটকার। তখন থেকে একটু জানার আগ্রহ জাগলো।

বাংলাদেশ কিশোর গ্যাংয়ের উৎপত্তি সম্পর্কে সঠিক ইতিহাস না বলতে পারলেও ২০০৬/৭ এর দিকে দৌরাত্ম্য বাড়ে। ততকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকার টপ গ্যাংস্টাররা সব আত্মগোপনে চলে যায়। তখন বিভিন্ন স্কুলের সার্কেল গ্রুপের একেকটি নাম রাখার মধ্য দিয়ে একেকটি গ্যাং ফোকাসে আসে।

তারা বিভিন্ন ইংরেজি ব্যান্ডের গান বা মুভির নাম থেকে নিজেদের গ্রুপের নামকরণ করে। যেমন গান্স অ্যান্ড রোজ, নাইট রাইডার, এক্স-পজিটিভ। গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে বখাটে বালকের একটি করে টাইটেল থাকতো। তাদের সেই নামে সে সময়ে তাদের গ্রুপের নামকরণ হতো। ৯০-এর দশকে ঢাকা শহরে গ্রুপের নাম বলতে শুধু সেভেন স্টার আর ফাইভ স্টারের নাম শুনেছি বিভিন্ন মাধ্যমে। যারা ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড কন্ট্রোল করতো। কিন্তু ২০০৬/৭ এ মূলত আমেরিকার হিপহপ কালচারকে ফলো করে ঢাকার অভিজাত এলাকায় কিশোর গ্রুপগুলোর উৎপত্তি ঘটে।

তবে এরা শুরুতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কর্তৃত্ব নিতে না পারলেও তাদের মূল কাজ থাকত এলাকায় বসার জায়গা দখল, নিজ ব্যাচের ছেলেদের কাছ থেকে সিনিয়রশিপ নেয়া আর মেয়েদের কাছে নিজেদের জাহির করতে শো-ডাউন দেয়া। আর দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি করে নিজের বা গ্রুপের নাম লিখে এলাকা দখলে নেয়াও ছিল তাদের ধান্দা। যে এলাকার দেয়ালে যেই গ্রুপের নাম লেখা থাকতো সেই এলাকা সেই দলের হয়ে যেতো। সে জন্য এই দেয়ালিকা করা নিয়ে গ্রুপে গ্রুপে দ্বন্দ্ব শুরু হতো। যেগুলোকে অনেকে তখন বয়সের দোষ বলে উড়িয়ে দিতেন। কারণ এরাই পরবর্তীতে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে গিয়ে বদলে যেত। কেও ব্রাইট স্টুডেন্ট হিসাবেও ছাড় পেয়ে যেত।

উত্তরা, ধানমন্ডি, মোহম্মদপুর, মিরপুর, ফার্মগেট, মতিঝিল এলাকায় এসব গ্রুপের নাম বেশি চোখে পড়ত। অনেক সময় ঢাকা শহরে চলাচলকৃত বাহনগুলোতে এরা নাম লিখে রাখত।

এই হিপহপ গ্র্যাফিতি গ্রুপটাই মানুষের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো, যখন ওদের পেছনে কথিত বড় ভাইয়েরা শেল্টার হিসেবে থাকতে লাগলো। এখানে চলতে লাগলো বিনিময় প্রথা। যেই হিপহপ কালচার ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে কথা বলা থেকে জন্ম নিয়েছিলো এই দেশে সেই হিপহপ কালচারকে রুপান্তরিত করা হয় ক্ষমতাবাজদের চামচামি বা মিছিলে শো-ডাউন দেয়ার মাধ্যমে। যার পরিণতি উত্তরার আদনানসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হত্যাকাণ্ড। গুগলে সার্চ করলেই অনেক নিউজ পাওয়া যাবে। তাই এইগুলো নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। কিন্তু এই হিপহপ কালচারের গ্যাংবাজী কিভাবে টিকটকারদের সাথে জুড়ে গেলো।

যেই গ্রাফিতি একসময় ছিলো প্রতিবাদের ভাষা, সেটাই হয়ে গেলো অন্যায়ের পথে পা দেয়ার প্রথম ধাপ। কিন্তু কিভাবে?

টিকটক হৃদয়ের নামা অনেকেই শুনেছেন। যার সিন্ডিকেট ভারতে নারীপাচারের সাথে জড়িত ছিলো। টিকটকের আড়ালে অল্পবয়সী কিশোরীদের নিয়ে বিভিন্ন পুল পার্টির আয়োজন করতো সে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন করানো হতো। পার্টিতে আসা বেশিরভাগই নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের। তাদের মিডিয়ার রঙিন দুনিয়ায় প্রবেশের স্বপ্ন দেখানো হতো। আর তারকা স্বপ্ন দেখা সেই কিশোরীরা পাচার হয়ে যেত পাশের দেশের পতিতালয়ে।

এটাতো এক টিকটকার হৃদয়ের গল্প। রাস্তায় বের হলেই হাজারো টিকটকার দেখা যায়। কখনো রাজধানীর হাতিরঝিল, ৬০ ফিট, দিয়াবাড়িসহ ব্যস্ততম সড়কে। এদের মূল কাজ একটা ওয়ারলেস সাউন্ড বক্স নিয়ে ১৫-২০ জন মিলে রাস্তা দখল করে রাখা। আর সেখানে মোবাইল দিয়ে ভিডিও শ্যুট করবে। যেসবে উশৃংখলতা আর বখাটেপনা ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। কিন্তু মূল সমস্যা হয়ে যায় সেই সময় যারা রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেন তাদের। একে তারা দলবদ্ধভাবে রাস্তা অবরোধ করে শ্যুটিংয়ের নামে টিকটক বানায়। আর সেই রাস্তা দিয়ে যাওয়া কোনো বাহন যদি তাদেরকে হর্ন দিয়ে রাস্তা দিতে বলে তখন তারা গালাগাল শুরু করে। এদের মাঝে অনেকে থাকে বখাটে। যারা নিজেদের জাহির করতে গিয়ে পথে চলাচলকারীদের গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করে না।

২০২০ সালে এরকমই একটা ঘটনা উঠে আসে টিকটকার পুর নামে। সে নাকি বাংলাদেশের শীর্ষ টিকটকার। তার নেতৃত্বে আরেক টিকটকার মামুন গ্রুপের সাথে নাকি প্রায়ই সংঘর্ষ হতো। কিন্তু এই সংঘর্ষ চাঁদাবাজি বা এলাকার কর্তৃত্ব নিয়ে না। তাদের জনপ্রিয়তা নিয়ে। কে কতো জনপ্রিয় তাই নিয়ে সংঘর্ষ হতো। তাদেরকে কন্ট্রোল করা বা মনিটরিং করার মতো কেউ ছিলো না। যেমনটা ছিলো আদনান হত্যাকাণ্ডের আগে কিশোর গ্যাংদের ব্যাপারে। কিন্তু যখন সেই টিকটকার অপুর গ্যাং উত্তরায় এক দল পথাচারীর উপর আক্রমণ করে বসে, তখনই প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। গ্রেপ্তার করা হয় দেশের স্বঘোষিত শীর্ষ টিকটকার অপুকে। এখন সেই অপু ওয়েব ফিল্মের নায়ক। ঢাকাসহ বাংলাদেশের এমন হাজারো অপু রোজ সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে।

আর এতে সমাজ দিন শেষে কী শিখলো? যেসব কিশোর-কিশোরী রোজ সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে মরিয়া হয়ে থাকে তারা এখন কী শিক্ষা পেলো? যারা টিকটকার হৃদয়ের ঘটনার পর নিজেদের শুদ্ধ করতো, তারা কি এখন অপুকে দেখে অনুপ্রাণিত হবে না?

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত