ঢাকা, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ আপডেট : ২৫ মিনিট আগে

একজন আদর্শ শিক্ষক মজিবর স্যার

  রিয়াজুল হক

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:০৬  
আপডেট :
 ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:৪৪

একজন আদর্শ শিক্ষক মজিবর স্যার
খুলনার হ্যানে রেলওয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ মজিবর রহমান শেখ
রিয়াজুল হক

মোঃ মজিবর রহমান শেখ। বিজ্ঞানের শিক্ষক। মাধ্যমিকের গণিত স্পেশালিষ্ট। চাকরি জীবনে দীর্ঘ ৩২ বছর (১৯৮০-২০১২) খুলনার হ্যানে রেলওয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। রেলওয়ে স্কুল এবং স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রতি ভালোবাসার কারণে ১৯৮৭ সালে খুলনার মডেল স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পেয়েও তিনি স্কুল ছেড়ে যাননি।

তিনি চাইলে অন্য পেশায়ও যেতে পারতেন। কিন্তু হ্যানে রেলওয়ে স্কুল ছাড়া তিনি কিছু বুঝতেন না। কোন ধরণের নৈমিত্তিক ছুটি ছাড়াও বছরের পর বছর স্কুলে হাজির থেকেছেন। এটা শিক্ষকতার প্রতি প্যাশন ছাড়া সম্ভব নয়।

কেন শ্রদ্ধেয় মজিবর স্যারকে আদর্শ শিক্ষক বলছি, তার কিছু কারণ তুলে ধরছি।

১. মজিবর স্যারের কারণে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের অন্যান্য স্কুল বাদ দিয়ে রেলওয়ে স্কুলে পাঠাতেন। একজন শিক্ষকের প্রতি অভিভাবকদের এমন আস্থা, কোথায় পাওয়া যায়! যে কোনো জায়গায় রেলওয়ে স্কুলের কথা উঠলেই, মজিবর স্যারের কথা চলে আসত। অনেকেই বলতেন, মজিবর স্যারের স্কুলে তারা তাদের সন্তানদের পড়ান।

২. স্যারের ব্যক্তিত্ব ছিল অনুসরণীয় এবং তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল। স্যারকে কখনো ক্লাসে দেরি করে আসতে দেখি নি। আবার ঘন্টা বাজার আগে কখনো ক্লাসরুম ত্যাগ করতেও দেখিনি। ক্লাসের পুরো সময়টাই তিনি পাঠদানেই ব্যস্ত থাকতেন।

৩. হ্যানে রেলওয়ে স্কুল থেকে লেখাপড়া করে যারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, সবাই প্রিয় মজিবর স্যারের অবদানের কথা একবাক্যে স্বীকার করে নেন। স্যারের সাবেক শিক্ষার্থীদের সাথে দেখা হলে, তারা সেই কথাটিই বারবার উল্লেখ করে থাকেন। স্যারের শাসন কিংবা স্নেহ, কোনটাই তারা আজও ভুলতে পারেন নি।

৪. তের-চৌদ্দ বছরের ছাত্ররা জীবনের একটা ট্রানজীট পিরিয়ড সময় পার করে। বিগড়ে যাবার সময়ও বলা যায়। সেই সময় মজিবর স্যারের শাসন এবং স্নেহ তাদের বিগড়ে যেতে দিত না। ছাত্ররা স্যারকে ভয় পেলেও, তাদের বিভিন্ন সমস্যা প্রিয় স্যারের কাছে অনায়াসে শেয়ার করত, যেন তাদের প্রিয় স্যারের কাছেই সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে।

৫. স্যার কখনো টাকার জন্য কোন ছাত্রকে পড়ান নি। তিনি দায়িত্ব নিয়ে প্রতিটা ছাত্রকে পড়াতেন। ছাত্রদের জন্য একঘন্টা, দেড়ঘন্টা ছিল না। কোন শুক্রবার ছিল না। রাত দশটা, এগারটা পর্যন্ত পড়াতেন। যত সময় প্রয়োজন, স্যার ততসময় ছাত্রদের সময় দিতেন। মূলকথা, তার ছাত্র যেন পড়া বুঝতে পারে।

৬. ক্লাসের প্রথম বেঞ্চের ছাত্র থেকে শেষ বেঞ্চের ছাত্র সবার সাথেই স্যারের একটা আত্মিক সম্পর্ক থাকত। সবার নাম তার মুখস্থ থাকত। ছাত্রদের কাছে একজন মজিবর স্যার কতটা জনপ্রিয় ছিলেন, এটা শুধু তার ছাত্ররাই বলতে পারবে। অনেক ছাত্রকে বলতে শুনেছি, মজিবর স্যারের ক্লাস করার জন্যই তারা স্কুলে আসে। নাহলে, তারা স্কুলে আসত না। ভাবুন একবার, ছাত্ররা কতটা উপভোগ করত তাদের প্রিয় মজিবর স্যারের ক্লাস।

৭. স্কুলের বাইরেও মজিবর স্যার একনামে পরিচিত ছিলেন। রেলওয়ে গার্ড কলোনী, লোকো কলোনী, নিউ কলোনী, টিটি কলোনী, বড় বাজার, নিক্সন মার্কেট, হেলাতলা, কালীবাড়ী বাজার, ফেরীঘাট, ফরাজীপাড়া, শেখপাড়া এসব এলাকায় মজিবর স্যার একনামে পরিচিত। স্কুলের কোন শিক্ষকের এমন পরিচিত কখনোই ছিল না।

একজন আদর্শ শিক্ষক হবার জন্য আর কী কোনো গুণের প্রয়োজন আছে? না, নেই। ছাত্ররা তাকে আজও মনে রেখেছে, যোগাযোগ করে, সেটাই কী এক জীবনে স্যারের কম প্রাপ্তি!

লেখক: যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ জার্নাল/জিকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত