ঢাকা, রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৫৯

প্রিন্ট

লবণের সঙ্কট নেই, কমতি আছে আয়োডিনের...

লবণের সঙ্কট নেই, কমতি আছে আয়োডিনের...
ইফতেখার উদ্দিন

এই নিয়েছে ঐ নিল যাহ! কান নিয়েছে চিলে, চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে। চিরসবুজের কবি অনেক আগেই লিখেগিয়েছিলেন ‘পণ্ডশ্রম’ নামে এই কবিতা। যখন লিখেছিলেন তখন প্রযুক্তির এত উৎকর্ষ ছিলো না। কিন্তু গুজবের ভয়াবহতা ঠিকই ছিলো। কিন্তু এখন অবাধ তথ্য প্রযুক্তির যুগে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। সবার হাতে হাতে আছে স্মার্ট ফোন।

একবিংশ শতাদ্বীর এই বৈজ্ঞানিক আর্শিবাদে সংবাদ ও তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে ঝড়ের বেগে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলে এসেছে লাইভ সেবা। কোনো ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই তা জেনে যাচ্ছে পুরো বিশ্ব। কিন্তু ধানের যেমন চিটা থাকে, তেমনি প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে তৈরি হয়েছে কুচক্রী মহল।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কমিউনিটিতে এক নতুন শ্রেণির প্রাণীর উদ্ভব হয়েছে। বানরকে যেমন বিমান চালাতে দেয়া ভুল, তেমনি এমন কুরুচিশীল ফন্দিবাজদেরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উপস্থিতি কাম্য নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে এই মহল ঠিকই ফায়দা লুটে নিচ্ছে। বিভিন্ন বার বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের তৈরি করা প্যানিকের খেসারত দিতে হয়েছে জাতিকে। পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব কান্ডে গণপিটুনির শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে অনেকেই। এসবের কোনো বিচার হয় না। কিন্তু ফেসবুক বা অনান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৈরি গুজব এসব হত্যার জন্য দায়ী।

সুকৌশলে এসব গুজব ছড়াচ্ছে স্বার্থান্বেষী মহল। গতকাল সন্ধ্যা থেকে জনমনে গুঞ্জন লবণের দাম বাড়ছে, দেশে লবণের সঙ্কট। এ বিষয়ে জানতে গতকাল রাতেই কর্তব্যের প্রয়োজনে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করি বিসিকের চেয়ারম্যানের সাথে। তিনি জানান, সিলেটের জকিগঞ্জে এক যুবক ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিসে দেশে নাকি লবণের সংকট, সারাদেশে দাম বেড়ে গেছে।

এই খবরকে পবিত্র বাইবেল মনে করে কিছু মানুষ লবণ সংগ্রহ করা শুরু করছে, লবণ নিয়ে হুড়োহুড়ি এবং রীতিমতো মারামারির মতোও অবস্থা। গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-মাঠে কিংবা চায়ের দোকানে একটাই গুজব, লবণের দাম বেড়ে গেছে। লবণ মজুদ করতে হবে। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা লবণের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ৩৫ টাকার লবণ কেজিপ্রতি চলে গেছে ১৩০ টাকায়।

সত্যিকার তথ্য হলো, লবণের এই বিষয়টিকে গুজব বলে উল্লেখ করেছেন বিসিকের চেয়ারম্যান। আমাদের দেশে মাসে প্রয়োজন ১ লাখ টনের কম লবণ। কিন্তু বর্তমানে মজুদ আছে প্রায় সাত লাখ টন। প্রয়োজনের তুলনায় তা অতিরিক্তের চেয়েও বেশি। কিছু সাধারণ মানুষ ফেসবুককে গুজবীয় প্রচারকে পবিত্র সত্য মনে করে নিজেদেরই ক্ষতি করে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেন ফন্দিবাজের আখড়া। উদ্দেশ্যমূলকভাবে এখানে গুজব ছড়ায়। আমজনতা তা ঐশ্বরিক বাণীর মতো বিশ্বাস করে।

তবে সবচেয়ে হতাশার বিষয়, সমাজের যারা কথিত ‘সচেতন’ বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র সমাজ, প্রগতীশীল চিন্তাধারার মানুষেরাও সঠিক তথ্য না জেনে চিলের পেছনে ছোটেন। না বুঝে গুজব নিয়ে মজাদার লিখা লিখে গুজবকেই সত্য প্রমাণে সহায়তা করেন। ভাবখানা এমন যে, এদেশের মানুষ নিজ চোখকেও অবিশ্বাস করবে, কিন্তু গুজব বিশ্বাস করে জীবনও দিতে পারে।

ছোটবেলায় আমরা আয়োডিনযুক্ত লবণ খাওয়ার কথা পড়েছি। স্কুলে শেখানো হতো লেবুর রস দিয়ে লবণের আয়োডিন পরীক্ষা করার নিয়ম। পরিতাপের বিষয়, ‘আয়োডিন ও লবণ রিসার্চ সেন্টার’ এর গবেষকদের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬ কোটি মানুষই আয়োডিন স্বল্পতার শিকার। আর ৩ কোটি মানুষ জানে না, তারা আয়োডিন ঘাটতির শিকার হয়ে স্বল্পবুদ্ধি ও শিখন ক্ষমতা কমে যাওয়াসহ নানা জটিল রোগে ভুগছে।

বর্তমান পরিস্থিতি দেখে তাই বলা যায়, দেশে লবণের কোনো ঘাটতি নেই, কমতি আছে আয়োডিনের।

লেখক: সংবাদকর্মী

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত