ঢাকা, সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ১১ শ্রাবণ ১৪২৮ আপডেট : ২৫ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২১, ১৯:২৩

প্রিন্ট

বিভ্রম

বিভ্রম

রাবিয়া আলাম

অনেকদিন পর আয়নার সামনে এভাবে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছি। মানুষ নিজেকে ভালো ও সুন্দর দেখানোর জন্য সাজে। মানুষ নিজের আসল রূপ ঢাকার জন্য সাজে। মানুষ অন্য কাউকে খুশি করানোর জন্য সাজে। এবং, এক মানুষ থেকে অন্য মানুষ হতে সাজে। তবে আমার সাজার কারণ অন্য সবার কারণ থেকে ভিন্ন। আজকে আমি আয়নায় একটা অত্যন্ত সুন্দর মেয়েকে দেখছি। সে চোখে কাজল দিয়েছে, তার ঠোঁট লাল টকটকে। তার ঘন চুল বাতাসে তার পুরো মুখ বারবার ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

ভাইদের খোঁজ করার জন্য বের হওয়ার আগে আমি মনে মনে বলি, ‘‘আমার এই ভয়ানক আত্মা আমার ভেতরই যেন থাকে, মানুষ যদি আমার হাতেই মরে তাহলে তাদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যেন তারা আমাকে না বোঝে।’’

বৃষ্টির আওয়াজ পাচ্ছি। তাই মনে হয় ভাইয়েরা আসতে দেরি করছে। আমার কামরায় কোনো জানালা নেই বলে আমি আমার কামরা থেকে বের হয়ে দেখলাম বাইরে প্রচুর বৃষ্টি আর ছোট ছেলে-মেয়েদের খুব হইচই। সবাই আম কুড়ানো নিয়ে ব্যস্ত। বাড়ির সব দরজা জানালা বন্ধ করে দিলাম তাই। আজকে খুব অদ্ভুত অনুভতি হচ্ছে এই অন্ধকার ঘরে। মানুষ যখন বৃষ্টির পানিতে খুশিতে মাতামাতি করে, তখন আমি বাড়ির ভেতর সব দরজা জানালা বন্ধ করে বসে থাকি। কারণ, আমার বৃষ্টি একদমি পছন্দ না।

এই সাগরদারিউ গ্রামে আমার জন্ম। আমার কোনো বন্ধু নেই এখানে। আমার ভাইয়েরাই আমার সব। আমাদের মায়ের মৃত্যুর পর থেকে ছোট খালা আমাদের দেখেছে। আমার বয়স তখন ১১ যখন ছোট খালা ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তারপর থেকে আমি আর আমার দুই ভাই থাকছি। আমার বড় ভাই তাহির আলাম একজন ব্যবসায়ী। সে খুব পরিশ্রমী, কিন্তু খুব অভদ্র। আমার ছোট ভাই তারেক আলাম এখন দশম শ্রেণির ছাত্র। সেও এখন টুকটাক কাজকর্ম করে টাকা আয় করে। আমাদের মায়ের মৃত্যুর ঘটনা এখনও আমাকে চিন্তিত করে, কারণ আমি কিছুই দেখিনি কি হয়েছিল। আমি শুধু শুনেছি। অনেক মানুষের মুখে অনেক কথা শুনেছি। কিন্তু আমি আমার ভাইদের কথাই বিশ্বাস করি, আর করবও, কারণ তারা সব দেখেছে। আমার নাকি তখন ৮ বছর, তাহির ভাইয়ের বয়স ১৫ এবং তারেক ভাইয়ের বয়স ৬- যখন বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান এর মধ্যে যুদ্ধ। জামিল অস্মান আমার মাকে হত্যা করে আমার ভাইদের সামনেই। জামিল অস্মানের খবর আমি জানি না, তবে আমার ভাইরা অনেক চেষ্টা করেছে তার আর তার পরিবারের খবর রাখতে। আমার ভাইদের কাছে আমি ঐসব শুনেই বড় হই।

বৃষ্টি খুব আগেই থেমে গেছে যখন ভেজা গাঁ নিয়ে দুই ভাই ঘরে ঢুকে তাদের পকেট থেকে টিকেটগুলো খাবার ঘরের টেবিলে রাখলো। আর ঘরের সব জানালা খুলে দিয়ে ভেজা টিকেটগুলো শুকাতে দিলো।

তাহির ভাই আমার দিকে এসে চোখ ছোট করে ভ্রু কুঁচকিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুরে বললো, ‘অনেক দিন ধরে সেই একটাই যুবককে দেখছি সেই বাড়ির আশেপাশে। জানি না কি তার রহস্য। আমাদের তো ধারনা ছিলো জামিল অস্মানের পুরো পরিবার সেখানে থেকে যাবে। পুরো অস্মানের বংশ সেভাবে ধ্বংস করা যেতো।’’

আমি বললাম, “হ্যাঁ, তা ঠিক কিন্তু, সমস্যা নেই। একজনকে ধ্বংস করেও একটু না একটু শান্তি আমাদের মনে ঠিকই আসবে।”

তারেক ভাই আজকে খুব চুপচাপ। হয়তো আমার জন্য সে চিন্তিত। অথবা, সে মায়ের কথা ভাবছে। অথবা সে কিছু বলতে চাচ্ছে, কিন্তু বলতে পারছে না।

তাহির ভাই আবার বলে উঠল, “তুমি খুব সাবধানে অভিনয় করবে।” আমি বললাম, “ঠিকাছে ভাই।”

“তারেক রিভলভর বের কর।” তারেক ভাইয়ের মুখ আগে থেকে বেশি ফেঁকাসে হয়ে গেলো। তার চোখ পানিতে ঝলমল করছে। আমি তাও তাকে জিজ্ঞেশ করলাম না তার কি হয়েছে। তাহির ভাই দিয়ে বললো, “কি? বের কর!” তারেক ভাই যখন তাহির ভাইয়ের দিকে তাকায় তখন তাহির ভাই বুঝে যায় তারেক ভাই কাঁদছে।

“তুই জানিস না? রাবিয়া কত চতুর, কত সাহসী? রাবিয়ার বয়স মাত্র ১৪ হলেও সে সব বোঝে, এটা আমি আর তুই দুজনই জানি।”

কিছুক্ষণ পরে তারেক ভাই নীরবে তার পাশে থাকা জামা-কাপড়ের আলনা চাবি দিয়ে খুলে রিভলভরটি বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, “পুলিশ যেখানে আমাদের কোনো সাহায্য করতে পারে নাই ১০ বছর ধরে, তুই পারবিতো?”

“দেখো ভাই তোমরা আমার ওপর সব ছেড়ে দাও। আমার এই খোপ দিয়ে আমি তাকে হত্যা করে তোমাদের সাথে ট্রেনে করে কলকাতা চলে যাব। কেউ কিছু বুঝবে না। দয়া করে কান্না থামাও। বিশ্বাস রাখো আমার ওপর।” এখন আমি দুইজনের চোখেই অস্রু দেখছি। সেটা ভয়ের নাকি অতিতের সব খারাপ স্মৃতির জন্য? আমি আমার শাড়ির ভিতরে রিভলভরটি রেখে দিলাম। ভয়, কষ্ট, সব কিছু আমাকে ঘিরে ধরে আছে। হ্যাঁ, অবশ্যই ভয় কাজ করছে। এতোই ভয় করছে যে আমি আমার নিজের হৃদয়ের ধকধক শব্দ শুনতে পাচ্ছি। হাত এবং পায়ের সব শক্তি যেন সর্বসান্ত, ভিতরে দুর্বল লাগছে তাই খুব।

মাত্র দেখলাম তাহির ভাই তার পকেট থেকে ম্যাচ বের করলো। সে এগিয়ে গিয়ে তার কামরার ভেতর ঢুকে একটা সিগারেট নিয়ে এসে ধোঁয়া ওড়ানো শুরু করলো আর বললো, “আজকের মধ্যে মনে হয় না সম্ভব হবে। আর যদি হয়ই তাহলে রাতের মধ্যে সব সমাপ্ত করবে। এটাই বেশি ভালো হয়, কারণ কারো কিছু দেখার কথা না।”

আমি হাজার বার তাহির ভাইয়াকে বলেছি সিগারেট ছাড়তে। আমার কথা কে শোনে? সে আমার সামনেই ধূমপান করছে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার কথার কোনো গুরুত্ব নাই কারো কাছে।

তারেক ভাইয়া একজন অন্তর্মুখী হলেও আমার সব কথা রাখার চেষ্টা করে। আমি তাকে বললাম, ‘ভাই আমার, ভাগ্যিস বৃষ্টি থেমেছে। নয়লে দেখো এতো সুন্দরভাবে সেজেছি, এতো নিষ্পাপ লাগছে, আজকে না যেতে পারলে সব বৃথা হবে।”

সে একটু হাসলো, কিন্তু আমার দিকে তাকিয়ে আবার আগের মতো মুখ গম্ভীর করে রাখলো। আমি চেয়ারে রাখা একটা কালো কাপড় নিজের মাথায় পরে মুখ ঢাকার চেষ্টা করলাম আর বাড়ির দুয়ার খুলে বের হওয়ার আগে টেবিলে রাখা টিকেটগুলোর দিকে লক্ষ্য করে দেখলাম দুইটা টিকেট রাখা। বুঝলাম না, আরেকটা টিকেট গেলো কোথায়? মনে হয় কোনো টিকেটের নিচে পানির জন্য আটকে আছে, তাই বোঝা যাচ্ছে না।

সহসায় তাহির ভাই বললো, “কি হলো? সূর্য ডুবে গেলে আর যেতে পারবি না-তো।” আমি কিছু না বলে দুয়ার খুলে কপোতাক্ষ নদীর খোঁজে বের হয়ে যাই।

কপোতাক্ষ নদ

সূর্যের কিরণ এখনও মেঘ দ্বারা আচ্ছন্ন। ধূসরাভ প্রকৃতির মাঝে পাখিদের কিচিরমিচির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আশেপাশে রাস্তায় গাছের পাতাগুলো ছড়িয়ে আছে। এখন আমি সোজা প্রধান সড়কের দিকে হেটে যাচ্ছি। আমি একা। আশেপাশে দু-একটা বাচ্চা-কাচ্চা ছাড়া কেউ নাই। আমাদের বাড়ি থেকে নদীটা খুব দূরে। তাই আমাকে হেটে যেতে হবে অনেকক্ষণ ধরে।

কিছু পথ হেটে যেয়ে হঠাৎ পিছে তাকাই। দেখছি কথাও কোনো মানুষ নেই। আমি ভাবছি এই গ্রামের সবার কথা আর পুরো এই পৃথিবীর কথা। একদিন না একদিন আমি অবশ্যই ফাঁসবো, আর সেটা ভেবে আমার আবার ভাইদের কাছে যেতে ইচ্ছা করছে। এসব ভাবতে ভাবতে আমি রাস্তার পাশে একটা গাছের কাছে বসে পড়ি। ভাবি আমার মায়ের কথা। আমার তার কথা একদমি মনে নেই। সে কেমন দেখতে ছিলো, তার কণ্ঠ কেমন ছিলো, সে আমাকে কিভাবে কোলে নিতো আর সে কিভাবে আমাকে ঘুম পারাতো? আমার মা শুনেছি অনেক সুন্দর ছিলো আর আমি নাকি তার মতো চখ, ঠোঁট আর চুল পেয়েছি। আর বাকি সব বাবার পেয়েছি। আমি নাকি ছোটবেলায় আমার মাকে ছাড়া আর কারো কোলে যেতে চাইতাম না। জানি না কেনো এতো পাগল ছিলাম মা’র। মাকে হারানর ভয় পেতাম মনে হয়, তাই ছাড়তে চেতাম না। আমি মনকে যত পারি শক্ত করার চেষ্টা করছি। আমি কাঁদতে চাচ্ছি না কিন্তু তাও চখ ভারি হয়ে আসছে। সামনের সবকিছু ঘোলা দেখাচ্ছে। নিজেকে শক্ত করে আবার হাঁটা শুরু করলাম।

রাত হয়ে গেছে। আজকের চাঁদটা খুব বড় মনে হচ্ছে। আশেপাশে কোনো বাড়িঘর নেই দেখে সব নীরব আর অন্ধকার। যেভাবে তাহির ভাই বলেছিল, ডানে বামের সব পথ মনে রেখে এতদূর হাঁটতে হাঁটতে এসে আমি বুঝি না নদী কথায়। আমি কি পথ হারিয়ে ফেললাম? আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আছে। মাঝে মাঝে পাখি পোকামাকড়ের আওয়াজ পাচ্ছি। ঐসব আওয়াজ আমার ভয় আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমি সব ভুলে যাচ্ছি, আমাকে যা যা করতে বলা হয়েছে সব ভুলে যাচ্ছি। আমি আবার সব পরিকল্পনার কথা মনে করার অনেক চেষ্টা শুরু করলাম।

অনেক্ষণ পর একটু ভালো লাগলো যখন আমি বুঝতে পারি আমি ঠিক স্থানেই এসেছি। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি চাঁদের আলোয় কপোতাক্ষ নদীর পানি ঝিকমিক করছে। এগিয়ে যেয়ে দেখলাম ঘাটের কাছে বাঁধা ৩টি নৌকা। সেই সুদর্শন দৃশ্য দেখে কিচ্ছুক্ষণ গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। ক্ষোভ যেন সেই প্রকৃতি দেখে কমে যাচ্ছে। সেটার জন্য আমি আবার সব খারাপ স্মৃতি মনে করলাম, আর আমার আবার সেই ক্রোধ থেকেই ইচ্ছা হলো জামিল অস্মান আলীর বাড়ি যেয়ে প্রতিশোধটা নেওয়ার।

সুদীপ্ত আলী

আজকে সারাদিন যা যা ভালো জিনিস ঘটেছে আমার সাথে, আমি তা সবকিছু আমার নিজের দিনলিপিতে লিখলাম। কারণ আমাকে একজন মনস্তাত্ত্বিক বলেছেন আমি যাতে আমার সব নেতিবাচক চিন্তা মাথা থেকে মুছে ইতিবাচক চিন্তা মাথায় রাখতে পারি, সাধারণভাবে জীবনে আগাতে পারি। এই জিনিসটা আসলেই কাজে দিচ্ছে। দুই সপ্তাহের মধ্যে আমি লক্ষ্য করছি নেতিবাচক থেকে ইতিবাচক জিনিসই বেশি ঘটে আমার সাথে। আস্তে আস্তে পরিবার হারানোর কষ্টটা কোমছে আর আমার মনও ঠিক হচ্ছে।

অনেক অদ্ভুত একটা আওয়াজ শুনতে পাই যখন আমি আমার দিনলিপি লেখা শেষ করে মোমবাতি নিভিয়ে দেই। তাই আবার দেশলাই নিয়ে মোমবাতি জ্বালাই। হাতঘড়ির ওপর দেখছি অনেক পিঁপড়া। এখানে এই একটা সমস্যা। পিঁপড়াগুলো পত্রিকার কাগজের সাহায্যে সরিয়ে দিয়ে ঘড়ি হাতে নিয়ে দেখছি, এখন রাত ১টা ৩৯ মিনিট। এমন সময় এরকম অদ্ভুত একটা আওয়াজ শোনা অপ্রত্যাশিত। আমি সাগরদাঁড়ি গ্রামে এই কপোতাক্ষ নদীর পাশে এই মাটির ঘড়ে থাকছি প্রায় তেইশ দিনের মতো হয়েছে। আমি দেখেছি এই নদীর পাশে আমার এই দাদার জমি ছাড়া আর কারো কোনো জমি নেই আশেপাশে। এটা কী বিড়ালের আওয়াজ পেলাম তাহলে? কারণ আশেপাশে বিড়াল, মুরগি বা পাখি ছাড়া কেউ থাকার কথা না এই সময়।

এই সময় আমার মাথায় প্রচুর কৌতুহল। ক্লান্ত মস্তিষ্ক নিয়ে কিছু না বোঝারই কথা। আমি আমার হাতে মোমবাতিটা নিয়ে আমার কামরা থেকে বের হয়ে সোজা জানালার কাছে যেয়ে দেখি, চারিদিকে অনেক অন্ধকার আর শুধু ঝিঁঝিঁপোকার আওয়াজ। আমি সেই আওয়াজটা দ্বিতীয়বার শোনার জন্য অপেক্ষা করলাম। কিন্তু পেলাম না। সেটা কী কোনো মানুষের চিৎকারের আওয়াজ ছিলো? হঠাৎ এই চিন্তা আমার মাথায় আসলো। আমি এই মাটির বিশাল এক বাড়িতে একা আছি, ভয় আমি একদমি পাচ্ছি না।

কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ল, আমি ঢাকায় যেই মনস্তাত্ত্বিক দেখাতাম, সে আমাকে বলেছিল এখানে দুই সপ্তাহের জন্য একা থাকতে আর দুই সপ্তাহের পরে আবার হাশিম ভাইয়ের সাথে থাকতে। কিন্তু, আমার তো তেইশ দিন হয়েছে আমি একা থাকছি। আমি কি তাহলে ভুল করে ফেললাম? এটা ভেবেই কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। আমি এখন হাশিম ভাইকে ডেকেও কোনো লাভ পাবো না, কারণ তার বাড়ি অনেক দূর। আমাকে এই ভয়ের মধ্যেই থাকতে হবে সারা রাত? না, এটাতো আমার পক্ষে সম্ভব না। আমার মন চাচ্ছে আমার হাতের এই মোমবাতিটা নিয়ে আমি এক্ষনি এই সময়ই হাশিম ভাইয়ের কাছে যাই। হঠাৎ মেঘের গর্জন শুনে আমার ভয় বেড়ে গেছে মনে হচ্ছে। আমি মোমবাতির সাহায্যে টেবিলে রাখা হারিকেনটা নিয়ে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করলাম, সেটা নিয়ে পায়ে জুতা পরে বের হয়ে যাই। বাইরে খুব বেশি অন্ধকার না, কারণ আকাশে চাঁদ আর তারা-নক্ষত্রে ভরা। আসেপাশে কোথাও কোনো পশু-পাখি নেই। গাছপালাগুলো আর আমি, আমার হাতের হারিকেন, আর আমার হারিকেনের আশেপাশে মশার দল।

চমকে গেলাম আমি! এমন কিছু দেখব তা আমি কখনও কল্পনাও করতে পারি নাই। এটা কী কারো লাশ? আমি দূর থেকে দেখছি একটা মেয়ে শাড়ি পরে নদীর পাশে শুয়ে আছে। সে কি মারা গেছে? কেউ কী তাকে হত্যা করেছে? আমি তাই আমার মাথা ভরা কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে যাই। দেখছি কালো শাড়ি পরে ঘাসের ওপর শুয়ে আছে সে। হারিকেন তার মুখের সামনে নেই, তার কপালের রক্ত তার চুল পর্যন্ত যাচ্ছে। সে কেনো এমন সাজগোজ করেছে? তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলো বা যাবে ভেবেছিলো। আমি জানি না সে বেঁচে আছে নাকি নেই। তাই আমি আমার হাত তার নাকের কাছে নিয়ে দেখলাম। সে নিশ্বাস নিচ্ছে! তাকে ধাক্কা দিয়ে অনেক ডাকলাম কিন্তু সে চখ খুলছে না। জানি না কেনো এই অচেনা মেয়েটার জন্য আমার এতো কষ্ট লাগছে।

বাতাসে ধুলা উড়ছে, মেঘ গর্জন করছে, এই সময় আমি এরকম একটা পরিস্থিতিতে। একটু পরেই বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে। তার অবশ্যই সাহায্য দরকার। আমি ছাড়া আশেপাশে কেউ নেই। আমি যদি তাকে না সাহায্য করি তাহলে এটা আমার কাছেও খারাপ লাগবে। আমি তাকে উঠানোর চেষ্টা করলাম। তাকে উঠিয়ে কাঁধে নিলাম আর বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। আর হারিকেনটা ওখানেই রেখে আসলাম।

সে মোটেও ভারি না। সে নিশ্বাস নিচ্ছে আর আমি তার হৃদস্পন্দন বুঝতে পারছি। সে বেঁচে আছে। আর এটাই ভালো। আমি তাকে আমার ঘরের খাটে শুইয়ে দিলাম। হাতঘড়িতে দেখি ৫টা বেজে গেছে। আর আমি অন্য ঘরের জাজিমে এ শুলাম, কারণ সেই একটাই খাট এই বাড়িতে। আমি অনেক ঘুমানোর চেষ্টা করছি, কিছুতেই ঘুম আসছে না!

বিভ্রম

আমি অনুভব করতে পারছি আমার হাতের নিচে ঘাস ও পায়ের নিচে কিছু পোকামাকড়। খুব ক্লান্ত লাগছে। এতোই ক্লান্ত লাগছে যে আমি আমার চোখ খুলতে পারছি না, শরীরও নড়াতে পারছি না। আমি আস্তে আস্তে আমার চোখ খোলার চেষ্টা করলাম। ঘোলা চোখ নিয়ে দেখছি সাদা রঙের কিছু একটা আমার সামনে।

কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম সব! আমি ঘাসের ওপর শুয়ে নেই, আমি খাটে শুয়ে আছি। আশেপাশে কোনো পোকামাকড়ও নেই! আমি ভাইদের কাছে। তার মানে আমি নিরাপদ! আমার কিছু হয়নি।

না! এটা আমার ঘর না! ভাইদেরও কারো ঘর না! হায়রে! তাহলে আমি কোথায়? আমি তাড়াহুড়া করে বিছানা থেকে উঠি। হঠাৎ একটা কাপড়ের টুকরা পড়লো মেঝেতে। বুঝতে পারলাম আমার কপালে জড়ানো ছিল ওই কাপড়। কামড়ার দুয়ারের পাশে একটা ছোট্ট টেবিল আর তার ওপর রাখা একটা গ্লাস, যেটা একটা থাল দিয়ে ঢাকা। আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবো নাকি বাড়িটা ঘুরে দেখবো? হঠাৎ মাথায় আসলো রিভলভলের কথা। আমি চমকে গেলাম এটা দেখে যে, আমার কাছে রিভলভরটা নেই! মাথায় সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলো।

আমি যেই কামরায়, সেই কামরাটা বেশ বড়। আমার সামনে একটি আয়না, যেটা দেয়ালে টানানো আর আশেপাশে জানালা নেই বলে আমি জানি না আমি আসলে কোথায়, কার বাড়ি। বেলা কয়টা বাজে, এখন আমার তাও জানা নেই। কিন্তু, আমার মনে পড়লো আমি এই অস্মানের বাড়ির দিকেই আসছিলাম, কিন্তু হঠাৎ আমি পায়ে একটা বড় পাথরের সাথে আঘাত লাগে। তারপর কিছু মনে আসছে না। মনে হয় তারপরেই আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি।

আমি কামরা থেকে বের হয়ে বুঝে গেলাম বাড়িটা খুব বড়। এগিয়ে যেয়ে দেখছি আমার পাশে একটা কামরা, যেটার দুয়ার বন্ধ। এখানে কে? আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। সে যদি আমার ক্ষতি করে ফেলে? আমার সাথে রিভলভরটাও নেই যে আমি নিজেকে রক্ষা করবো। আমার হৃদয়ের মনে হচ্ছে এখনি বিস্ফোরণ হবে এই ভয়ে।

বাড়ি থেকে বের হয়ে বুঝতে পারলাম আমি ঠিক জায়গায় এসেছি। কোথাও কেউ নেই। আমার রিভলভরটা কী তাহলে তার কাছে, যে দুয়ার বন্ধ করে আছে? যে আমাকে এই বাড়িতে এনেছে? যার কথাই তাহির ভাই বলেছিল? আমার কাছে তো আসল জিনিসই নেই, তাই আমি কী দৌড়ে পালাবো আমাদের বাড়ির দিকে? কিন্তু তাহির ভাই তো আমাকে খুব বকবে! মারতেও পারে! আমি তাই করবো বলে আমি নদীর দিকে আগানো শুরু করি। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম ঘাসের ওপর পরে থাকা রিভলভরটা দেখে। আশেপাশে আরেকবার দেখে নিলাম কেউ আমাকে দেখছে কিনা। যখনই দেখলাম আশেপাশে কেউ নেই, আমি দ্রুত রিভলভরটা আমার কাছে নিতে না নিতেই শুনলাম কেউ চিৎকার করছে। পিছে তাকিয়ে দেখি বাড়ির সামনে সেই যুবক! সে তার হাত নাড়াচ্ছে আর আমার দিকে আসছে। আমি কী করবো? কোথায় যাবো? সে আমাকে মারার আগেই কী আমি তাকে মেরে ফেলবো? আমি কি আসলেই এতো ভীত যে অস্ত্র নেওয়ার আগেই এতো ভয় পাচ্ছি? কাউকে মারা এতোই কষ্ট? এখন কয়টা বাজে? আমার তো আজকে ট্রেনে করে কলকাতা যাওয়ার কথা। একবার কিছু হওয়ার আগে আমি তাকে জিজ্ঞেস করবো এখন কয়টা বাজে?

“কয়টা বাজে এখন?” আমি কাঁদছি দেখে, গলা ভারি শুনাচ্ছে আমার। সে এতক্ষণে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। সে আমার থেকে বেশ লম্বা। তাকে দেখে যে কেউ বলবে সে একজন ভদ্র মানুষ।

“আমি একটু আগে দেখেছি সাড়ে ৯টার মতো বাজে! তুমি কী এখানে...”

সে কিছু বলার আগেই আমার মনে পড়ে আমি সব এলোমেলো করে ফেলেছি। আমি কী করবো জানি না। মাথা এতো এলোমেলো হয়ে আছে যে আমি রিভলভরটা না নিয়েই যত দ্রুত পারি দৌড়াতে থাকি।

আমার সামনে শিউলি আপু। সে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তার সাথে ধাক্কা খেয়েছি তাই এতো অবাক য়য়ার কি আছে?

“ভাবি, এখন আমাকে দেখা বাদ দিয়ে আমাকে যেতে দেন দয়া করে।” আমি আবার দৌড়ানো শুরু করতেই সে আমার হাত ধরে বলে, “রাবিয়া, তুই এখানে কেনো?”

“আজব! কি বলবে তারাতারি বলো। আমার সময় নেই তোমার পেকর-পেকর শোনার।”

“কিসের পেকর-পেকর? তোর ভাইরা তোকে ছাড়াই যে ট্রেনের স্টেশনে গিয়েছে, তা আমি জানবো না কেনো, তোকে নেয়নি? আর- কী হয়েছে তোর?”

“মিথ্যা বলছ আমাকে!” ভাবি খুব হাসছে। তাকে আমি এক ফোটাও বিশ্বাস করি না। আমি তাই বাড়ির দিকে যেয়ে দেখি, ঘরা তালা মারা। তার মানে শিউলি আপু ঠিক বলেছে। ভাইয়েরা আমাকে রেখেই চলে গেছে। কিন্তু কথা তো এটা ছিল না। কথা ছিল সকাল ১০টায় আমরা এই এলাকা থেকে বের হয়ে যাবো। তাহলে ভাইয়েরা আমাকে ধোঁকা দিয়েছে? আমার মনে হচ্ছে পা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। আমি শোকাগ্রস্ত হয়ে পরলাম। তখন সেই সময়, সেই যুবকটার গলা শুনতে পারলাম। মাথা ঘুড়িয়ে ঘোলা চোখে দেখি লাল রঙের এক শার্ট পরে আছে একজন।

“তোমার কোনো সাহায্য লাগবে? আর এই খেলনা রিভলভরটা কী তোমার?” যুবকটা বললো।

“খেলনা রিভলভর?...কী?...আচ্ছা, আমাকে আপনি পিছু করেছেন কেনো?”- আমি বললাম আর ভাবলাম সে কী গাধা? সে আমার প্রশ্ন শুনে চুপ করে থাকলো। আর আমি অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

সে অনেকক্ষণ সেই রিভলভরটা এদিক সেদিক দেখে বললো “হ্যাঁ, এটায় কোনো গুলি নেই। তাই এভাবে বললাম।”

এইসব কী হচ্ছে আমার সাথে? এইসব কখনো আমার সাথে হবে, তা আমি জীবনে ভাবতেও পারিনি। আমাকে কী মানুষজন ধোঁকার বাক্সে বন্দি করে দিলো?

আজ প্রায় ৩ মাস হয়ে গেলো আমি আমার ভাইদের কোনো দেখা পাইনি। এখন আমি যাকে মারতে চেয়েছিলাম, তারই আশ্রয়ে আছি ও তারই ঘরে বসবাস করছি। হ্যাঁ, সত্যি খুবই আজব আমার জীবন!

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত