ঢাকা, শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯ আপডেট : ৩ মিনিট আগে
শিরোনাম

ডিসকাউন্ট

  রাজীব কুমার দাশ

প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২২, ১৫:৩০  
আপডেট :
 ২৪ এপ্রিল ২০২২, ১৬:০৩

ডিসকাউন্ট
রাজীব কুমার দাশ

ভিক্ষুক লাল মিয়ার মনে, অনেকদিন ধরে একটি চিন্তাই বার বার অভিমানি প্রেমিকার মতো জিদ করে বসে আছে। ভালোবাসার আপেক্ষিক হৃদয়ে প্রেমিক যেমন,‘তাঁর প্রিয়ার মন বুঝে নিতেই অনন্তবেলা কাটিয়ে দেন!’ সে প্রকারে লাল মিয়ারও মতিগতি বাম-ডান সোনার বাংলার এখনো কেউ বুঝতে পারেনি।

আগে যে কেউ, দশ টাকা খয়রাত দিলে ভিক্ষুক লাল মিয়া কৃতজ্ঞতাবশত শূন্যে দু'টি হাত উঁচিয়ে বলতেন- শোকর আলহামদুলিল্লাহ্! যে ভাই বাবা বোনটি চলার পথে- এ অসহায় মিসকিন বান্দাকে দশটি টাকা দান করিলেন; তাঁর মনের সকল খায়েশ যেন পূরণ হয়।

বিনম্র হৃদয় নিংড়ানো মধুর রসালো শুভ কামনা স্তুতি শুনে, চলার পথে গ্রাম শহরের জনম দুখির পকেট, হৃদয় কেটে; দেদারসে মাল কামানো দুনম্বরি ভদ্রবেশি নারী পুরুষের দু'হাতে যা আসে; তাই দিয়ে ফকির বাবার কেরামতি স্তুতি শোনার লাইনটা চা বাগানের নিষাদ কলোনীর পচা আটা গম বিতরণে-- 'বাবু স্তুতি' শুনে তবুও খিস্তিখেউড় মনে সবাই ধন্য হতে সুপ্ত বাসনা দীর্ঘ করে।

ভিক্ষুক লাল মিয়া ' ইতর (ITOR)' অঞ্চলের মানুষ। তার বাবা, বাদশা মিয়া ছিলেন, দাগি চোর। তার বাবা, স্বভাব চোর ভিক্ষুক লাল মিয়াকে একটি কথা বার বার বলতেন- 'শোন লাল মিয়া! আমরা হচ্ছি ইতর এলাকার মানুষ। বৃটিশদের দেয়া উপাধি আমাদের ধরে রাখতে হবে।'

বাবার দোয়ার বরকতে সেদিন হতে এই দিনে এসেও ভিখারি লাল মিয়া ভুলতে পারেননি; পিতার দেয়া আদেশ উপদেশ হিসেবী বন্ধন।

ফুটপাতে ভিখারি লাল মিয়া বসে চারিদিকে দেখছে- দৃষ্টিনন্দন লাল নীল সবুজ মখমল কাপড়ে ঝুলছে চটকদার বিজ্ঞাপনী সুন্দর সুন্দর ব্যানার-ফেস্টুন। থেমে গেছে- বিক্রেতার হাঁক-ডাক, হয়েছে মুখের ভাষার আমূল পরিবর্তন! ইশতেহারের একটিই সুলভ ভাষা-' ডিসকাউন্ট। '

'ইতর' লাল মিয়ার মনে বেঈমান জাতিসত্তা লোভের এক মহাসমুদ্র ঝড় ওঠে। হাতগুলো কাঁপতে থাকে। কপালের শিশিরবিন্দু ঘামগুলো ফোঁটা হয়ে জমতে থাকে। হৃদয়টা সুখের বসন্ত বাতাসে দুলতে থাকে।

লাল মিয়ার হঠাৎ চিৎকার!

পাশের পান দোকানি অনিমেষের ভেজানো গামলা ভর্তি পানের ছিটানো পানিতে লাল মিয়ার হুঁশ হয়। অনিমেষ দেখে লাল মিয়ার চোখে জল, মুখে হাসি।

- লাল মিয়া কী হইছে? - ধুর মালাউন! দুনিয়াবি আশেকান তুই কী বুঝবি?

মুহূর্তে লাল মিয়ার হাতে ছাপরা টং দোকানের ঠেস দেয়া লাঠি চিরস্হায়ী বন্দোবস্ত সুখে অনিমেষকে ডাকছে-

- অনিমেষ?

- বলো, লাল ভাই।

- আমার নাম, মাস্তান বাবা! এইমাত্র গায়েবি বুজুর্গ বেহুঁশ করে আগের নামটি চিরতরে মুছে দিয়েছে। তুমি আমার হইবা প্রথম শিষ্য।

- বাবা, ক্ষমা করে দেন; আমি অধম আপনার সাগরেদ হতে পেরে ধন্য। তবে বেঈমানি করতে পারব না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। বিক্ষিপ্ত সময়ের বেদনার খানাখন্দে ভরা রাস্তাগুলো অনিমেষ মেরামত করছে। মাস্তান বাবার নির্দেশে চারিদিকে দোয়ার আকর্ষণীয় মূল্যহ্রাস চলছে। সাধু চলিত প্রমিত ভাষায় বিবর্তিত ভিক্ষাই এখন হবে দান।

মাস্তান বাবার হাতে একদম সময় নেই। উনি কারোর দশ-বিশ টাকা মেরে খাবার লোক নন। চলছে-- মাস্তান বাবার অবিস্মরণীয় দোয়ার অভাবনীয় ডিসকাউন্ট।

>পঞ্চাশ হাজার টাকা দানের প্রথম পুরস্কারে থাকছে: মাস্তান বাবা সরাসরি মাথায় হাত রেখে দোয়া পড়ে ফুঁ দেবেন।

>তিরিশ হাজার টাকা দানে দ্বিতীয় পুরস্কার: হাতে হাত রেখে আসমান জমিনের পার্থক্য বোঝাবেন।

>বিশ হাজার টাকা দানে তৃতীয় পুরস্কার: বুকের মাঝখানে দিল বরাবর টোকা দেবেন।

>দশ হাজার টাকার সান্ত্বনা পুরস্কারে থাকছে একটি সিডি/পেনড্রাইভ।

>তবে যাঁরাই লাখের উপরে দান করবেন, তাদের মূল্যহ্রাসে রয়েছে ৯০% পর্যন্ত ডিসকাউন্ট। তাঁদেরকে সরাসরি 'মাস্তাননিবাস' ভবনের তৃতীয় তলা, লটারিযোগে তাপানুকূল 'খাসদিল' খুশবু রুমে সরাসরি মেহমান করা হবে। বিবিধ আনন্দযোগ সমাপনান্তে- ‘বাবা তোমার দরবারে সব বেঈমানের মেলা’ থিয়েটার মঞ্চ নাটক দেখার সুযোগ দেয়া হবে। সরাসরি অভিনয় না করে পল্টি নাটক, বেঈমান সিনেমা নির্মাণে দানের সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দেয়া হবে। মাস্তান ফকির বাবার সুনজরে পড়ে পাবেন, কাড়ি-কাড়ি টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স গাড়ি বাড়ি পিস্তল মেশিনগান, ট্যাংক মর্টার কামান।

বদনজরে- সব হারিয়ে নেংটা বাবা সেজে পথে পথে দশ-বিশ টাকা ভিক্ষা করবেন।

সামনে পূর্ণিমা তিথি। এ তিথিকে সামনে রেখে মাস্তান বাবার ভক্তদের চলছে-খানদানি আয়োজন। অক্ষত যোনী যুবতী কিশোরী বাবাকে দুধে স্নান করাবেন। মাস্তান বাবা বিবর্তিত ইতর দয়াল বাবা নামে জগতে বিখ্যাত হবেন।

পান দোকানি অনিমেষের শেষ প্রশ্ন-

- বাবা, আমি কী করব?

- সব দিয়ে দাও।

- কী?

- তোমার হৃদয় মন চিরসুখী যৌবন।

- তারপরে?

- রক্তের পুষ্টি হিমোগ্লোবিন।

- দয়াল বাবা! ভয়ে ছোট বুকে বইছে--পদ্মার সর্বনাশা ভাঙন

- তুমি একদম চিন্তা করোনা; বাকিটা হবে- ডিসকাউন্ট।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কবি, পুলিশ পরিদর্শক, বাংলাদেশ পুলিশ

মেইল:[email protected]

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত