ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৪ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭ আপডেট : ৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১৫:০৬

প্রিন্ট

অপারেশন বিজয়া ‘০০৯’

অপারেশন বিজয়া ‘০০৯’
ছবি প্রতীকী: মিস লুক্সেমবার্গ-২০

মোস্তফা কামাল পাশা

পায়ে নাইকির কেডস। মজবুত আরামদায়ক। সিঙেল স্ট্রাইপ সূতি ট্র্যাক স্যুট। উপরের অংশ ফুলস্লিভ। কালচে হাল্কা মেরুন লম্বা চুল হর্স টেইল। স্কিনটাইট কিন্তু ফ্লেক্সিবল স্যুট সকালের ব্যায়ামে খুব প্রিয়। মা, আপত্তি করলেও গা করে না। হাঁটা, শরীর চর্চায় খুব আরাম। দৌড় প্রায় শেষ।

শিরিষ তলায় বসবে। তারপর বাসায় ফিরে ছাদ জিম ও অ্যারোবেটিক্স। ফাঁকা ছায়াঢাকা সড়কে গাছের ডাল পাতা ছুঁইয়ে রোদের সোনালি মোজাইক বাতাসে খেলছে, নড়ছে। মাঝে-মাঝে হু হু বা ফোঁসফাঁস পাশ কাটাচ্ছে গাড়ি, বাইক। হঠাৎ রাফি খেয়াল করল, তাকে ঘিরে দৌড়াচ্ছে একটি দল, অর্ধবৃত্ত বানিয়ে! পাত্তা দিল না। জানে সে, তারে দেখে মুনীরও ধ্যান ভেঙে যায়। ছিপছিপে ধারালো শরীর, খাঁজ, বাঁক, রূপ!

দৌড় শেষ হলো বলে। কিন্তু অর্ধবৃত্ত পুরো বৃত্ত হয়ে গেছে, ঘেরাওয়ে রাফি। ঘামের পচা গন্ধ আছড়ে পড়ে নাকে। সাঁই করে মাথা নামিয়ে বৃত্ত ভেদ করে বেরিয়ে আসে মাইক্রো সেকেন্ডে! দাঁড়ায় বুনো গরিলার মত টান টান হয়ে। চোখ বুলায় এক ঝলক, বৃত্তে জনা পাঁচ। বেশ তাগড়া, ব্যায়ামপুষ্ট। রাফি মিটার দুই দূরত্বে। ফাঁকটা তৈরি করেছে ছোট্ট সুযোগ কাজে লাগিয়ে। দলের ধাড়িটা পেছনে, সামনে একজনের সানগ্লাসে তার নড়াচড়া স্পষ্ট। অকস্মাৎ ব্যাকষ্ট্রোক, ধাড়ির দু’উরু চিপার মোক্ষম স্থানে। নিখুঁত এবং দ্রুততম লক্ষ্যভেদ। ধাড়ির বিশ্রী ‘ওয়াক’ আর্ত চিৎকারে ঝাঁকড়া শিরিষ ডালে বসা ধ্যানী কাকের ঘুম ভেঙে যায়। বিশাল হট্টগোল তুলে উড়াল দেয় সবাই একলগে।

বাকি চার একটু থমকায়। সুযোগ নেয় রাফি। ফ্লাইং কিক, সাইট, ব্যাক স্ট্রোক, হুক, আপার, লোয়ার কাট, ভলি সমানে চালায় দর্জির কাঁচির দ্রুততায়। কোন প্রতিরোধ ছাড়াই দেড় মিনিটে অপারেশন শেষ। পাঁচ পাঁচটা রক্ত মাংসের বস্তা রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। রক্তের ছোট্ট ক’টি ধারা রোদ মোজাইকের উপর এগোয় ধীরে। বেশ কিছু গাড়ি, বাইক থেমে আছে চুপচাপ। দর্শনার্থীও জমে গেছে প্রচুর। রাফি আড়মোড়া ভেঙে ভাবে, ‘আইলো কইত্তুন, এত্তো মানুষ- মাটি ফুঁড়ে নাকি’!

কয়েক ফোটা রক্ত তার পোষাকেও! মা দেখলে খবর আছে নিশ্চিত! আপাতত পরিস্থিতি সামলানো আসল কাজ। ইশারায় দূরের ক’জন দর্শককে কাছে আসার নির্দেশ দেয়। জনা ষাটেক মানুষ। সবাই ঘোরে। চোখ ধাঁধানো সুন্দরী ছিপছিপে মেয়েটার হাত, পা এবং পুরো শরীরটা আস্ত স্প্রিং দোলক! আবছা উড়াল দেখেছে ঘোরের মাঝে! বস্তার মত শুয়ে থাকা সবাই নগরের সেরা মাস্তান। রাজনীতির লেজুড়ও আছে। মেয়েটা কিনা তাদের মুহূর্তেই ভর্তা বানিয়ে দিল, তাও খালি হাতে! কী অদ্ভুত প্রজাপতি নাচ, যেন বিদ্যুৎ ঝলক! ইশ আরো কতক্ষণ লড়াই চললে কী যে মজা হতো! কারো কারো চুপচাপ আক্ষেপ।

রাফি ওদের ভাবনা পড়ে নেয়, ‘এই যে মিস্টারেরা তামাশা শেষ, কাছে আসুন জলদি’, মেজাজ খিঁচে হুঙ্কার দেয়।

কজন সাহস বাড়াতে দোয়া ইউনুস পড়ে বুকে থুতু ঘষে এগোয়। একজন সাহসে ভর করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, কী হয়েছে ম্যাডাম?

-চোখ কী আধা, না ঠুলি পইরছেন! দেখেননি কিছু?

-হ্যাঁ দেখেছি বজ্জাৎরা আপনারে ফলো করছিল। রাস্তা নিরালাতো--+

-চুপ, নিরালা রাস্তায় আপনারা কি ল্যাম্পপোস্ট? কড়া ধমকে থামিয়ে দেয় তীক্ষ্ণ পাল্টা প্রশ্নের হুল ফুটিয়ে।

কয়েকজন সাহস করে এগুলেও রাফির অগ্নিদৃষ্টি, তীক্ষ্ণ শব্দ বুলেটে নারকেল পাতার মত কাঁপতে থাকে। সাহসের শেষ ফোটাও উবে যায়।

-এরা সবসময় মেয়েদের উপরও হামলা চালায়। বাধা দিলে স্বামী বা বাবার বুকে বন্দুক-ছোরা ঠেকায়। মারধর করে তুলে নিয়ে গণ নির্যাতন করে। চাঁদাবাজি ছিনতাইতো আছেই। সবাই জেলখাটা দাগী আসামি। রেলের জায়গা ও ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ে মারপিট, গোলাগুলিও হয়। প্রশাসনতো চুপ। সাহস করে বয়স্ক একজন হলবলিয়ে শব্দ বমি করেন।

-ঠিকাছে, জানি সব। এদের কী করা যায়? পুলিশে দেব না অন্যকিছু-+ না, পরে ঠিক করব, সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্রাগ করে রাফি। জ্ঞান ফেরার আগে পকেট-টকেট চেক করে অস্ত্র, মোবাইল, টাকা থাকলে ওগুলো বের করে আনুন, ঝটপট।

শুনে আগুয়ান জনতার কেউ কেউ পেছাতে চায়। কারণ পরে বড় বিপদ-আপদ জোড়া মিলিয়ে একলগে আসবে। এদের টাকার রশিতে বাঁধা আছে অনেক বড় উকিল-নেতা।

আঙুলে ঠুসকি বাজিয়ে সতর্ক করে রাফি। কেউ সরলে কিন্তু++ তর্জনীর ডগায় বাতাসে ক্রশ আঁকে সে। জনতা আবার থমকায়। অভিযোগকারী বক্তা জনতাকে অভয় দেন, -কী হইছে চল। এরা আমার মেয়ের খুনি, তোদেরও মাফ দেবে না, কইলাম। তিনি হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছে ধাড়ির কলার চেপে ধরে কষে কটা থাপ্পড় লাগান। ধাড়ির কুচকির তীব্র ব্যথা তখনো টাটকা। শরীরের সব বল বেয়ারিং ঢিলে। উঠার চেষ্টা করে ধপ করে আবার শুয়ে যায়। হাত পায়ের জোড়া সব এলোমেলো! এত কড়া ধোলাই জীবনে প্রথম। লোকটি নির্দয়ভাবে পকেট, শরীর ঘেঁটে তার মোবাইল, ছোট্ট বেরেটা পিস্তল, খাপবদ্ধ ভোজালি, মানিব্যাগ সব তুলে নেন। অন্যরা দেখাদেখি চার মাস্তানের সব অস্থাবর সম্পদ, অস্ত্রপাতি কেড়ে নেয়। কেউ কেউ মাথা তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু রাফির সতর্ক দৃষ্টির তীব্র বিদ্যুৎ ঝলকে সাহসের গাঠরি সায় দেয় না।

দুটো গামছা যোগাড় করে সব মালামাল স্তূপ করা হয়। মার্কিন ছোট্ট পয়েন্ট থ্রি টু বেরেটার দাম অন্তত ১৫ লাখ টাকা। অটো মেকানিজম। রাফি বাটন চেপে ম্যাগজিন খুলে সব বুলেট বের করে নেয়। অন্যগুলোর ম্যাগজিনসহ গুলিভর্তি এক্সট্রা দুটো ম্যাগজিনও খালি করে নেয়। সব মিলিয়ে ৩০টা তাজা বুলেট। বক্তা ভদ্রলোককে আড়ালে ডেকে নিয়ে কিছু জরুরি নির্দেশনা দেয় রাফি। তিনি মাথা নেড়ে সায় দিয়ে দ্রুত ছুট দেন।

ক’মিনিট পরই বিশাল নারী বাহিনীর আবির্ভাব। কলোনি কাছেই। কয়েক শ’ ক্রুদ্ধ নানা বয়সী মেয়ে ঘিরে ফেলে এলাকার অঘোষিত বাঘদের। সব বাঘ নির্জীব, হুতে আছে চুপচাপ। মেয়েদের হাতে ঝাঁটা, ঝাড়ু, খুন্তিসহ হাল্কা অস্ত্র। এদের অনেকেই নির্যাতিতা।

আজ দুর্গাপূজার আগেই স্বয়ং রুদ্র, রণরঙ্গিণী দেবীমাতা সামনে হাজির। হিন্দু মেয়েরা ঝাঁপ দিতে চায় রাফির পায়ে। রাফি হাত তুলে আটকায়। এরমাঝে কর্তব্য ঠিক করে ফেলেছে। মানিব্যাগ থেকে পাওয়া গেছে নগদ লাখ দেড় প্রায়। এটিএম কার্ডও। টাকাগুলো পূজা তহবিল ও ভূঁড়িভোজের জন্য বিলিয়ে দিয়ে কার্ড, মোবাইল সেট, অস্ত্র ও বুলেট পুলিশের জন্য রেখে দেয়। এরপর হাত তুলে মেয়েদের প্রতি অঙুলি নির্দেশ।

শুরু হয় ঝড়-তুফান। মার কত প্রকার ও কী কী? উদাহরণসহ চলে টানা ১৫ মিনিট। এই ফাঁকে চলে আসে রেল পুলিশসহ স্থানীয় পুলিশের বিশাল বহর। নেতৃত্বে একজন এডিসি। নিজের পরিচয় ও আইডি দেখিয়ে রাফি ৫ আসামি, অস্ত্র, কার্ড, বুলেট, মোবাইল সেট বুঝিয়ে দেয় এডিসি সাহেবকে। নিজের জবানবন্দি দিতে সময় চেয়ে নেয় বিকাল ৫টায়।

এডিসি সাহেব স্যালুট ঠুকে বলেন, আপনি ভয়ঙ্কর এক অপারেশন সফল করেছেন ম্যাম। তাও একলা! এদের কোনভাবেই ধরতে পারছিনা। নানা অবিশ্বাস্য শেল্টারের আড়াল নিয়ে আমাদের ঘোল খাওয়ায়! ধরা পড়লেও মাসের মাঝে ফিরে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে। বাঁধা আছে দুদে লইয়ার্স।

-ভাবতে হবে না। এবার জেলখানা থেকে সোজা

পঙ্গু হাসপাতালের স্থায়ী অতিথি হবে-নিশ্চিত থাকুন। আর যৌনলীলা! অপ্সরায় ডাকলেও ভয় পাবে বেটারা! চলি, দেখা হবে। এডিসিসহ সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বাসার ঠিকানা ধরে রাফি। মা দেখার আগেই কাপড় ভরতে হবে ওয়াশিং মেশিনের খোপে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত