ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ আপডেট : ৪ মিনিট আগে

এগিয়ে আসছে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ভয়ঙ্কর আঙ্কেল

  রাজীব কুমার দাশ

প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২১, ১০:৫৩

এগিয়ে আসছে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ভয়ঙ্কর আঙ্কেল
রাজীব কুমার দাশ
রাজীব কুমার দাশ

বর্তমানের পিচ্ছিগুলো অনেক চালাক। ডিজিটাল সংস্কৃতির কারণে ওরা ভূতের গল্প না শুনে-পৃথিবীর আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায়।

মাতা-পিতার পায়ের নিচে সন্তানের স্বর্গ-বেহেশত বাক্যটিও ওরা সহজ-সরল মনে মেনে নিতে পারছে না। এমনকি সন্তানদের সামনে মেসেঞ্জারে টুং-টাং শব্দও যদি আসে; তাদের কাছে সন্তোষজনক কৈফিয়ত দিতে হয়।

একটা সময়, সন্তানরা যখন বুঝতে পারে ‘তাদের কেতাদুরস্ত বাবা-মা প্রচণ্ড মিথ্যুক, জাতীয় ভণ্ড, ঘুষখোর- তাদের জন্য দেশ-বিদেশে কাড়ি-কাড়ি টাকা, গাড়ি-বাড়ি সযন্তে বানিয়ে রেখে অপেক্ষা করছে; তখন তাদের দিয়ে সততা, মূল্যবোধ মাতা-পিতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য, রচনা, ভাবসম্প্রসারণ মুখস্ত করানো নিরর্থক অর্বাচীন ছাড়া কিছু মনে হয় না।

চেঙ্গিস খানের মতো এক জনমের লুণ্ঠিত ধন, সাত জনম উত্তরসূরিদের বসিয়ে খাওয়াবেন দুর্নিমিত্ত সংস্কৃতির হাত ধরে ব-দ্বীপের নতুন চেঙ্গিস খান, হালাকু খান, বখতিয়ার, কাশিম, সুলতান মাহামুদ, উর্মি চাঁদ, জগতশেঠ ভয়ঙ্কর ভাবনার বিলাসী অর্জনগুলো পুত্র নাতি-পুতিও শেষ করে যেতে পারবে কি-না সন্দেহ থেকে যায়।

‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা’ প্রলাপী মাতাল নীতিবাক্যগুলো জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পরে চিরতরে নির্বাসনে পালিয়ে গেছে। আবার ফিরতে পারবেন কি না, যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ব-দ্বীপের অসৎ সুইপার কাঠকুড়ানি হয়ে কারো নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাচ্ছে না, সততার মোহিনী বড়ি কেউই গিলছে না।

চরম সৎ মানুষগুলো এক সময়ে পরম অসৎ হয়ে নির্লজ্জ বদনে রাষ্ট্রের গোলটেবিলে বসে হাসেন, ভণ্ড মনে নিরবে চোখের জল ফেলে মাসে-মাসে গার্লফ্রেণ্ড বদলিয়ে সৈকতে লাল-নীল জার্সি, গেঞ্জি ও হাফ প্যান্ট পরে বলে বেড়ান, হাই বেবি, তুমি আমার সন্ধ্যাতারা সকালের কুয়াশা মাখা সোনারোদ’ তখন নেতিয়ে পরা জাতীয় নির্লজ্জ নাতিশীতোষ্ণ হৃদয়ে অনুভব করি, সমৃদ্ধ অবশিষ্ট বলতে কিছু আর বাকি নেই।

সরকারি-বেসরকারী, বেহিসেবি ‘জাতীয় আঙ্কেল সংস্কৃতি’ আমাদের ঘরে ঘরে কড়া ভেঙে ঢুকে পড়েছে অনেক আগেই।

দুষ্ট বড়লোক বাবার সন্তানের দেখাদেখি ছোটলোক অসহায় বাবার সন্তানেরাও বখে গিয়ে এমন কোনোও নৈতিবাচক কাজ নেই যা করতে বিন্দুমাত্র বিবেকের দংশনে হৃদয়ের কাঁপুনি হাতের ঝাঁকুনি দিয়ে পেছনে ফিরে তাকিয়েছে!

সবার দেখাদেখি- লেখালেখি জনসেবা বিয়ে শ্রাদ্ধ কুলখানি শ্মশানের একটাই জাতীয় শুদ্ধাচার বিশুদ্ধ উচ্চারণ, ‘আরও টাকা চাই, আরও টাকা দেন।’

বড় চাকুরে, রাজনীতিবিদ বিশিষ্ট সমাজ সেবক, ব্যবসায়ী, দানবীরের কথা বাদই দিলাম।

মুচি, মেথরগিরি, কেরানিগিরি, মদ্য মাংস বিক্রি করে বাস ট্রাক চালিয়ে এমনকি পতিতার দালালি করে যাচ্ছে তাই মনে জাস্ট সিস্টেম মেনে কোনোও কিছুর তোয়াজ না করে- যে দেশটি রাতারাতি রাজা ও টুনি পাখির গল্পের মতো রাজার নাক কেটে দিতে পারেন; সে দেশটি আমাদের দুর্ভাগা স্বদেশ।

যে রাষ্ট্র এখনও জাতির জনকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর জাতীয় বিশুদ্ধ কুশীলবের ব্যর্থতা’র হিসেব মেলাতে পারেনি; ব্যর্থ সিপাহীদের সঙীন কেড়ে নিয়ে বিচারের কাঠগড়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারেনি: সেই দুর্ভাগা দেশটির নাম, ‘আমার প্রিয় লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ।’

পৃথিবীর কৃতঘ্ন নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডে জাতির জনককে রক্ষার পূর্বাপর ব্যর্থ সিপাহীদের ব্যর্থতা’র সামান্যতম ‘টুঁ’ শব্দটি’র কৈফিয়ত স্বাধীনতার পঞ্চাশটি বছর পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্র নিতে পারেনি! কেউ দিতে চায়নি, দিতে হয়নি। অসহায়দৃষ্টে মনে হচ্ছে, কখনো কাউকে দিতে হবেও না।

ধানায়-পানাই কথার ইন্দ্রজালে ছেলের মনভোলানো টক শো, দু’একটা বই লিখে সারি সারি কৈফিয়ত বন্দী করে রেখেছে কেউ কেউ। কেউ কেঁদে কেঁদে পুলকিত অভিনয়ে বলেন, ‘আহা! আমি রক্ষা করতে পারিনি, কিছুই করতে পারিনি।’

২০২১ সালের সোনামিয়া ও ৭১ হতে ৭৫ মধ্যবর্তী সময় পেরোনো সোনামিয়াদের আদর্শিক ভাবধারা কিন্তু এক। একটাই চিন্তা আদর্শ ‘যা পাও লুটে পুটে খাও।’ সকাল সন্ধ্যায় এর ওর বিরুদ্ধে কান ভারি করে দেশপ্রেমিক সিপাহীদের বিরুদ্ধে গিঁট লাগাও।

জাতির জনক যে মাত্র- একুশ সালের লুটেরা ঘুষখোর চামচা পূর্বসূরি সোনামিয়া চাঁনমিয়া চিনতে পেরে ব্যবস্থা নিতে চেয়েছেন; আমজনতার ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তিলাভে আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন, তখনি হিমালয় সমান উঁচু ঋজু ব্যক্তিত্বের মানুষটাকে চিরতরে সরিয়ে দিয়েছে।

ব-দ্বীপের এই যে, জবাবদিহিতার ‘নাই’ উড়ন্ত টুনি পাখিটিকে সুইপার হতে বিসিএস, সার্বভৌম সীমান্ত নদী পেরিয়ে মাঝপথ, সাগরপথ আকাশপথে এ পর্যন্ত কেউই ধরতে পারেনি। দিনে দিনে টুনি পাখিটা অদৃশ্য বনে পালিয়ে অট্টহাসি মগডালে বসে রাজার মতোই আমাদের উপহাস করে বলছে, ‘তোমার ঘরে যা নাই, আমার ঘরে আছে। উজির নাজির হ্যাণ্ডকাপ কোর্ট-কাচারি বন্দুক ফাঁসি-ডরাইনা টাকা আছে পাছে।’

জাতীয় পাজি আঙ্কেলগুলো নিয়ে আর পারছি না। ওরা জাতীয় চেতনার গোদের বিষফোঁড়া, ওদের ম্যাক্সিমাম বাহন রোলস রয়েলস হয়ে মিনিমাম বাইক পালসার হোন্ডা। বেসরকারী দামি স্কুল বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে পৃথিবীটা হাতের মুঠোভর্তি করে রেখেছে। সোনামিয়াদের ছেলে মেয়ে এখন ভয়ঙ্কর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন আঙ্কেল। তারা এতোটাই দাপুটে যে, ওদের সোনামিয়া বাবারা হাফ টাইম, ফুল টাইমে মাদক, বডিগার্ড, রুম ডেট করতে নতুন বান্ধবী সাপ্লাই দিয়ে বাবার ভীষণ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেন।

দেশের ঘরে ঘরে ভয়ঙ্কর আঙ্কেল টুনিপাখি বাসা বেঁধেছে। সভ্য-অসভ্য জাত পাত নেই, নাই কোনোও কৈফিয়ত! জবাবদিহিতা।

টুনটুনি পাখিগুলো মোটাতাজা। ছানাগুলো বেশ আনন্দে কখনও মদ্যে, কখনো গদ্যে, কখনও বা পদ্যে। সবাই বহুরূপি বহুডালে চিন্তার সময়ে কিচিরমিচির একজোট, মগডালে বসে বাঁধছে নতুন গীত; হাতে নেই হারমোনিয়াম তবলা সারিন্দা একতারা, একি! এখনও সবার হাতে ভয়ঙ্কর গ্রেনেড পিস্তল মিডিয়া কামান, বায়োলজিক্যাল ওয়েপন।

হিটলার গোয়েবল টিভিতে এবার প্রচার হবে; ‘শোনেন শোনেন দেশবাসী, শোনেন দিয়া মন! অভাগা টুনটুনি এবার করিব বর্ণন:

জাতে মাতাল তালে ঠিক, আমরা সকল ভাই একসাথে হাসি খেলি, নেই দিবানিশি,

কখন হাসি, কখন কাঁদি মোরা সবি বুঝি; পঁচাত্তরের পর হইতে আমরা সবই খুঁজি!

শ্রোতা: ওস্তাদ কি খুঁজেন?

ওরে বোকা, ওরে সোকা, ওরে চুদির ভাই;

সময় হইলে পাইবা টের, মিশে যাবো আমজনতায় ঢের বলছি- খনার বচন!

‘নাই এখনও কারো কৈফিয়ত, বাবার পয়দা ভয়ঙ্কর আঙ্কেলের শিশ্নে মাখছি এখন ‘সোনামিয়া ব্র্যান্ড’ চুলকানি মলম।

সোনামিয়া, তারা মিয়ার পুত্র নাতি পুতিগণ জাতীয় ভয়ঙ্কর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন আঙ্কেল হয়ে আক্কেল দাঁতে সান দিয়ে বরাহ শাবকের মতো জাতিসত্তা পশ্চাৎদেশে গুঁতো দিয়ে শক্তি পরীক্ষা করতে দিকে-দিকে এগিয়ে আসছে।

লেখক: রাজীব কুমার দাশ, প্রাবন্ধিক ও কবি, পুলিশ পরিদর্শক

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত