ঢাকা, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬ আপডেট : ২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০১৯, ১৫:৪৩

প্রিন্ট

মিড ডে মিল শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক না সাংঘর্ষিক?

মিড ডে মিল শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক না সাংঘর্ষিক?
সাইদুল হাসান সেলিম

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে। শিক্ষাবান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সদিচ্ছায় জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন, ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ, ১ম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, বৃত্তি ও উপবৃত্তি প্রদান, ৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থীদের স্কুলে ভর্তি, নতুন নতুন ভবন নির্মাণ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন শিক্ষাক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক অবদান।

২০২৩ সালের মধ্যে সারাদেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে’ মিল চালুর লক্ষ্য নিয়ে মন্ত্রিসভায় ‘জাতীয় স্কুল মিল নীতি-২০১৯ খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি পৃথক জাতীয় স্কুল মিল কর্মসূচি কর্তৃপক্ষ 'ন্যাশনাল স্কুল মিল অথরিটি' গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বৃদ্ধি, ঝরেপড়া রোধ, এবং শিশুর পুষ্টি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এই প্রকল্প।

পরামর্শক কর্মকর্তারা এককোটি ৪০ লক্ষ শিক্ষার্থীর মিলের ব্যয়ের হিসাব দিয়েছেন এভাবেই।

কেবল বিস্কুট সরবরাহে সরকারকে বছরে ২ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা খরচ করতে হবে।

৫দিন রান্না করা খাবার ও একদিন বিস্কুটে খরচ হবে= ৫ হাজার ৫৬০ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

বিস্কুট, ডিম, কলা ও রুটি দেয়া হলে খরচ হবে মাত্র= ৭ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা।

মন্তব্য: এই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রকল্পে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও গবেষকদলকে নিয়োজিত করতে হবে। নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। একটি উদ্যোগ কতটুকু ফলপ্রসূ বা শিক্ষার কল্যাণ বয়ে আনবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে জনমনে। ইতিমধ্যেই নতুন বই ছাপানোর কাজে নিয়োজিত করতে হয়েছে এনসিটিবির গবেষকদের। পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের দায়িত্ব প্রাপ্ত গবেষকেরা এখন ছাপাখানায়। এতে ভুলে ভরা ছাপানো হচ্ছে নিম্নমানের পাঠ্যপুস্তক আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

দেশের বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে আমার কতিপয় প্রস্তাবনা তুলে ধরছি।

১। এমপিওভুক্তির নীতিমালা বাতিল করতে হবে। সরকার প্রয়োজন অনুসারে স্কুল কলেজ স্থাপন করবে এবং শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন ভাতা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দিতে হবে।

(২) শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ও মানোন্নয়নে দেশের বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে স্কুল-কলেজে মেধাবী শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে হবে। দেশের ৯৭% শিক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত এমপিওভুক্ত সকল স্তরের প্রতিষ্ঠান সত্বর জাতীয়করণ করতে হবে।

(৩) আধুনিক বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে নূন্যতম দুটি কারিগরি বিষয় বাধ্যতামূলক করতে হবে।

(৪) শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে প্রতিটি জেলায় সরকারি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করে শিক্ষকদের ধারাবাহিক বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

(৫) প্রান্তিক অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণে এবং স্বল্প খরচে শিক্ষার সুযোগ প্রদানে এখন-ই এমপিওভুক্ত সকল স্তরের শিক্ষক কর্মচারীদের চাকরি সরকারিকরণ করতে হবে।

(৬) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন ও অন্যান্য ফি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হারে আদায় করতে হবে। ঝরেপড়া রোধে শিক্ষা ব্যয় কমিয়ে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে।

(৭) সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সংখ্যক মেধাবী ও অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতন-ভাতা এবং সতন্ত্র বেতন স্কেল দিতে হবে।

(৮) অবিলম্বে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করতে হবে।

(৯) শিক্ষক কর্মচারীদের চাকুরীর নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তার জন্য দ্রুত নীতিমালা প্রণয়ন করে তা কার্যকর করতে হবে।

(১০) কলেজ শিক্ষকদের বিতর্কিত ৫:২ অনুপাত প্রথা বাতিল করতে হবে। অভিজ্ঞ ও মেধাবী শিক্ষকদের প্রণোদনা দিতে হবে।

(১১) জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আধুনিক যুগোপযোগী ও গুণগত মানের শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অবিলম্বে জাতীয় শিক্ষানীতি অনুসারে শিক্ষা আইন প্রকাশ করতে হবে।

(১২) শিক্ষকদের শারীরিক মানসিক ভাবে অত্যাচার নির্যাতনকারীদের কঠোর হস্তে দমন এবং বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

(১৩) শিক্ষকদের সম্মান, মর্যাদা ও আকর্ষণীয় সতন্ত্র বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় করতে হবে।

(১৪) পিএসসির আদলে আলাদা শিক্ষক নিয়োগ কমিশন গঠন করতে হবে। মেধাবী ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলী ও দুর্গম অঞ্চলে ভাতা প্রদান করতে হবে।

(১৫) সময় ক্ষেপণ না করে,অবিলম্বে শিক্ষকদের টাইমস্কেল/ উচ্চতর স্কেল প্রদান করতে হবে।

সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকায় দেশের এমপিওভুক্ত সকল শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ/সরকারিকরণ করা সম্ভব। এতদসত্ত্বেও জাতীয়করণের যৌক্তিক ও সর্বজন গ্রাহ্য দাবিকে অগ্রাহ্য করে মিড ডে মিল প্রকল্প গ্রহণ কতটা যুক্তিযুক্ত? তা ভবিষ্যতের উপর ন্যস্ত থাকবে। আমাদের আগামী প্রজন্মকে নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন গুণগত মানের শিক্ষা দিতে না পারলে সকল উন্নয়ন অগ্রগতি ও পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হবে এটা নিশ্চিত। তাই আর কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবি জানাচ্ছি। এই যৌক্তিক দাবি শুধুমাত্র শিক্ষকদের নয়, দেশের সর্বস্তরের মানুষের। এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ করা হলে অন্ততঃ এতটুকু বলতে পারি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষায় অবদানের জন্য ইতিহাসে চিরকাল স্বরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত