ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭ আপডেট : ৩৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২০, ১৬:২৫

প্রিন্ট

সাক্ষাতকারে বিদিশা (পর্ব-১)

জাতীয় পার্টির ভবিষ্যতের জন্য আমাকে প্রয়োজন

জাতীয় পার্টির ভবিষ্যতের জন্য আমাকে প্রয়োজন
ছবি: সৈয়দ মেহেদী হাসান
শেখ তৌফিকুর রহমান

দেশের রাজনীতিতে আলোচিত চরিত্র বিদিশা। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্ত্রী হিসেবে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে এক সময় চমক হয়ে এসেছিলেন। তার কথায় জাতীয় পার্টির কার্যক্রম চলতো। রাজনীতিতে বেশ এগিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ সব কিছু থেমে যায়।

শুধু রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েননি, বিদিশাকে তালাক দেন এরশাদ। মোবাইল চুরির মামলায় যেতে হয় জেলে। কিছুদিন জেলও খাটেন। তার জেল-হাজতবাস এবং এরশাদের সঙ্গে সংসার করা নিয়ে ‘শত্রুর সঙ্গে বসবাস’ নামে একটি বই লেখেন। যেখানে তার প্রতি এরশাদ এবং তখনকার হাজতবাসের নির্যাতনের করুণ কাহিনী উঠে আসে।

এরশাদ-বিদিশার এক সন্তান রয়েছে। নাম শাহাতা জারাব এরিক এরশাদ। এই সন্তানের সূত্র ধরে পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে কম-বেশি কথাবার্তা হতো। তবে বিদিশা রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। মৃত্যুর আগে ট্রাস্ট করে এরিকের নামে রেখে যান সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ।

এরিক থাকেন রাজধানীর বারিধারার কূটনীতিকপাড়ার ‘প্রেসিডেন্ট পার্ক’-এ। সেই সূত্র ধরে সেখানে বিদিশার বসবাস। দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টিতে নিষ্ক্রিয় থাকার পর রাজনীতিতে আবারো সক্রিয় হতে চাচ্ছেন তিনি। অংশ নিতে চান ঢাকা ১৮ আসনের আসন্ন উপ-নির্বাচনে।

দীর্ঘদিন পর রাজনীতিতে সক্রিয়তা, সন্তান এরিকের সঙ্গে বসবাস, তার বিরুদ্ধে এরশাদসহ অনেকের করা বিভিন্ন অভিযোগের খোলামেলা জবাব দিয়েছেন বিদিশা।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বাসভবন ‘প্রেসিডেন্ট পার্ক’- এ বিদিশার দীর্ঘ সাক্ষাতকার নিয়েছেন বাংলাদেশ জার্নালের নিজস্ব প্রতিবেদক শেখ তৌফিকুর রহমান

দুই পর্বের স্বাক্ষাতকারের প্রথম পর্ব আজ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

বাংলাদেশ জার্নাল: গুঞ্জন রয়েছে আপনি রাজনীতিতে আসছেন?

বিদিশা: রাজনীতিতে আসার কিছু নাই। রাজনীতিতে আগেও ছিলাম, এখনো আছি। কিছু দিন নিষ্ক্রিয়তা ছিলো। এখন আবার সক্রিয় হবো। এটা জনগণের চাহিদা।

বাংলাদেশ জার্নাল: রাজনীতিতে কি জাতীয় পার্টি থেকেই সক্রিয় হবেন, নাকি নিজে আলাদা দল গঠন করবেন?

বিদিশা: না। আলাদা দল গঠনের প্রশ্নই আসে না। জাতীয় পার্টির লোকজন আমাকে নতুন করে অন্য কোনো পার্টিতে দেখতে চায় না। তারা আমাকে জাতীয় পার্টিতেই দেখতে চায়।

বাংলাদেশ জার্নাল: জাতীয় পার্টিতে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মশিউর রহমান রাঙ্গাকে বাদ দিয়ে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে মহাসচিব করা হয়েছে। পার্টির এ পদে আমরা বারবার পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। মহাসিচব পরিবর্তনের মাধ্যমে কি জাতীয় পার্টিতে কোনো গুণগত পরিবর্তন হবে বলে আপনি মনে করেন?

বিদিশা: যে ঘটনাটি ঘটলো, তা চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতাবলে ঘটেছে। এটা অশোভনীয়। এটা একদমই ঠিক না। কারণ দলের সিনিয়র নেতাদের সাথে বসে, প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে মহাসচিব পরিবর্তন করা যায়। তাহলে বিষয়টি এত দৃষ্টিকটু হতো না। কারণ এখন যে মহাসচিব আসলেন, উনাকে এ পদ থেকে আগেও একবার ফেলে দেয়া হয়েছিল। এখন বর্তমান চেয়ারম্যান সাহেব তাকে মহাসচিব করে আনলেন। এখন তিনি কত দিন মহাসচিব পদে থাকেন, উনার উপর কী হয়... সেই একই ধারায় দেখা যাবে যে ভবিষ্যতে উনাকেও বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। এটিতেই আমার ভয়।

বাংলাদেশ জার্নাল: এটার সমাধান কোথায়?

বিদিশা: বর্তমান পরিস্থিতিতে তরুণ প্রজন্মই ঠিক করবে, তাদের নেতৃত্ব কে দেবে। তাদের কথা-বার্তা, তাদের কাজ-কর্ম, তাদেরকে পরিচালনা করা... তরুণদের শক্তি নিয়েই আমি মাঠে নামবো।

বাংলাদেশ জার্নাল: জাতীয় পার্টিতে কি তারুণ্য নির্ভর কোনো নেতৃত্ব রয়েছে বলে আপনার মনে হয়?

বিদিশা: দলের সিনিয়র নেতাদের বেশিরভাই সত্তরের বেশি বয়স হয়ে গিয়েছে। এনার্জেটিক কোনো নেতা বা ক্যারিশমেটিক কোনো নেতা আমি জাতীয় পার্টিতে দেখি না। বয়সের ভারে তারা ন্যূব্জ নিচু হয়ে গিয়েছে। তারা ক্যারিশমা দেখাবেন কীভাবে? তারা করোনার মধ্যে কতদিন মাঠে নেমেছেন? একদিন দেখলাম তারা সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ করেছে। করোনার মধ্যে আমি নিজে বিদিশা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রতিদিন খাবার বিতরণ করেছি। আমি নিজে বের হয়ে কাজ করেছি। আমি করোনাকে ভয় পাই না। প্রতিদিন কাজ করেছি। আমি বস্তিতে কাজ করেছি। এখন বর্ষার মধ্যে যেমন বৃষ্টিরোধক ত্রিপল বিতরণ করছি। আমরা কাজ-কর্ম করছি। করোনার মধ্যে আমি ঘরে হাতগুটিয়ে বসে নেই। মানুষের জন্য কাজ করে গেছি। বর্তমান প্রজন্ম কিন্তু এটাই দেখবে, যে কারা কাজ করে যাচ্ছে। তাদেরকে সাথে নিয়ে চলাটাই প্রধান কাজ।

বাংলাদেশ জার্নাল: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় আসন্ন ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনে আপনার অংশ নেয়ার বিষয়ে গুঞ্জন উঠেছে। এর সত্যতা কতটুকু?

বিদিশা: জাতীয় পার্টির জোটের নেতারা আমার কাছে এসেছিলেন এ প্রস্তাবটা নিয়ে। আমি মনে করি যে পার্লামেন্টে এখন যাওয়ার সময় হয়েছে। এতদিন আমি চাইনি, এখন আমি মনে করি যে পার্লামেন্ট একটি প্লাটফর্ম, যেখান থেকে আমি ভালোভাবে মানুষের জন্য কথা বলতে পারবো। এখন যেমন একটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আমার কথা বলার সীমাবদ্ধতা আছে, সেখান থেকে বের হয়ে বড় প্লাটফর্মে আমি কথা বলতে চাই। সে লক্ষ্যে আমি কাজ করবো।

বাংলাদেশ জার্নাল: প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মরহুম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সাহেবের জন্মভূমি রংপুর। সেখান থেকে নির্বাচন করতে চান? নাকি ঢাকা থেকে?

বিদিশা: আমার এতটুকু আত্মবিশ্বাস আছে যে, বাংলাদেশের যে কোনো স্থান থেকে আমাকে নির্বাচন করতে দেয়া হোক, যে কোনো পার্টি থেকে আমাকে নির্বাচন করতে দেয়া হোক, আমি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবো। আমার জায়গায় আমি নিজেকে নিয়ে যেতে পেরেছি বলে আমার বিশ্বাস রয়েছে। রংপুর বা আমার নিজের এলাকা রাজশাহী, খুলনা কিংবা ঢাকা যে কোনো জায়গা থেকে আমি নির্বাচন করতে প্রস্তুত। মহাজোট গঠনের সময় আমার ভূমিকা ছিলো অন্যতম। আমি সেই অর্থে সরকার থেকে এক টাকার বেনিফিট কোনো দিন নিই নি। আমার নিজের প্রয়োজনও নেই। আজ যদি সরকার মনে করে আমাকে জাতীয় পার্টির ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন, তাহলে ঢাকা-১৮ আসনে সাহারা খাতুনের জায়গায় আমার কথা ভাবতে পারেন।

বাংলাদেশ জার্নাল: গত বছর ১৪ নভেম্বর জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বারিধারার ‘প্রেসিডেন্ট পার্ক’ বাসভবনে আপনি আসেন। জাতীয় পার্টির বিভিন্ন শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সেখানে আপনি জোরপূর্বক সেখানে প্রবেশ করে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন।

বিদিশা: জোর করে কেউ যদি কোথাও আসে তাহলে তো তাকে পুলিশ বা প্রশাসন বের করে দেবে। আমি তো লোকবল নিয়ে এখানে আসিনি। এটা আমার সন্তানের (এরিক এরশাদ) বাসা, আমার সন্তান আমাকে ডেকেছে, আমি এসেছি। সন্তানের বাসায় তার মা আসবে এটাই স্বাভাবিক, আমি এখানে আসলে আমার সন্তান আমাকে আর যেতে দেয়নি, সে আমাকে আটেকে রেখেছে। সে বলেছে তুমি না থাকলে আমাকে মেরে ফেলবে। পৃথিবীতে মায়ের থেকে বড় কেয়ারটেকার কেউ হতে পারে না। মামা, খালা চাচা কেউ না। মায়ের বিকল্প কখনো চাচা মামা হতে পারে না।

‘আমার সন্তান দিনে ২০০ মিনিট জিম করছে, তার পায়ের সমস্যা আছে। তার ব্রেইন অতিরিক্ত ফার্স্ট, তাকে লেখাপড়া করিয়ে আমি যে আনন্দটা পাই এটা কেউ পাবে না। আমি না থাকলে তিন মাস পরে হয়তো ওকে পাগলা গারদে রেখে দিয়ে আসত। মেন্টাল সার্টিফিকেটি লিখিয়ে, যারা আমার সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলেছে তারাই ওর (এরিকের) সম্পদ আত্মসাৎ করতো। মা কখনো সন্তানের সম্পদ আত্মসাৎ করতে পারে না।’

বাংলাদেশ জার্নাল: প্রেসিডেন্ট পার্কে আপনার কেমন কাটছে?

বিদিশা: এখানে মানুষ জন আসছে। এটা এরশাদ সাহেবের রাজনৈতিক ঠিকানা। এটা তিনি রেখে গেছেন এরিকের জন্যই। তার দুটি রাজনৈতিক ঠিকানা। একটা হচ্ছে রংপুরের ‘পল্লী নিবাস’ আরেকটা হচ্ছে ঢাকার ‘প্রেসিডেন্ট পার্ক’। দুটোই ট্রাস্টের। এই সম্পদ কখনো কেউ ভোগ করতে পারবে না। এরিক হচ্ছে এই সম্পদের বেনিফিশিয়ারী। এরিক যদি না চায় তাহলে সে এটা ভেঙে ফেলতে পারে, তবে সেই ক্ষেত্রে সব সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাবে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসটি/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত