ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ১৭ আশ্বিন ১৪২৭ আপডেট : ৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২০, ১৬:৩৬

প্রিন্ট

সাক্ষাতকারে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা রাজনীতিতে বড় দুর্ঘটনা

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা রাজনীতিতে বড় দুর্ঘটনা
কিরণ শেখ

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য। ছাত্রজীবনে প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল গঠিত হলে তিনি যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। পরবর্তীতে যুবদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পর তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় তৎকালীন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

পরে তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পরবর্তীতে স্থায়ী কমিটির সদস্য পদে মনোনীত হন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মত গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ঢাকা-৩ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে বিজয়ী হন। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি পুনরায় একই আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করেন।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং ১৫ আগস্ট খালেদা জিয়ার জন্মদিনসহ নানা বিষয়ে বাংলাদেশ জার্নালের সঙ্গে কথা বলেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশ জার্নাল-এর স্টাফ রিপোর্টার কিরণ শেখ

বাংলাদেশ জার্নাল: ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জড়িত বলে আওয়ামী লীগ অভিযোগ করছে, এবিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: এটা অসুস্থ রাজনীতির একটা চর্চা মাত্র। অর্থাৎ যা কিছু ঘটুক, আমরা প্রতিপক্ষের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করি। আর যখন যারা সরকারে থাকে, সরকারে থাকাকালীন সময় যা ঘটে তার জন্য সবাই সরকারকেই দায়ী করে। আর সরকারেরও একটা দায়িত্ব আছে যে, এই ঘটনাগুলো উদঘাটন করা এবং সঠিকভাবে বিচারের আওতায় আনা এবং বিচার করা। ২১ আগস্ট, এই ঘটনাটা কিন্তু অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় গণতন্ত্র কখনো সুস্থ থাকে না। আর গণতান্ত্রিক বিশ্বাসী কোনো মানুষই এ ধরনের ঘটনাকে সাধুবাদ জানায় না, নিন্দা ও প্রতিবাদই করে। যখন এই ঘটনাটা ঘটে তখন দেশের অবস্থাটা কী এবং ২০০১ সালের সরকারের সংসদে আসন সংখ্যা কতো ছিল? সকল বিরোধী দল মিলেও তো ১ শত না। সুতরাং জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার যখন গঠন হয় তখন তারা তার প্রতিপক্ষকে কেনো আঘাত করবে? কারণ বিরোধী দলবিহীন তো একটা সংসদ পুর্ণাঙ্গ হয় না। সেখানে একটা সরকার এটা কেন করবে? একটা স্থিতিশীল সরকার এই ঘটনা ঘটানোর মধ্যে দিয়ে নিজেদের উদ্বিগ্নতা এবং দেশে অস্থিতিশীলতা অবস্থা তৈরি কেন করবে? এটা কোনো বিবেচনায় আসে না।

প্রশ্নটা হচ্ছে, ওই দিনকার জনসভা যেকারণে করেছে, তখন তো অনুমতি লাগতো না। সিটি করপোরেশন রাস্তা-ঘাটসহ সব বন্ধ করেছে। এমনকি পল্টনও বন্ধ করেছে। কিন্তু মুক্তাঙ্গণ তো বন্ধ করেনি। এমনকি তারা মুক্তাঙ্গণে মঞ্চও বানিয়েছে এবং লোক সমাগমও হয়ে গেছে। সেখানে কেন হঠাৎ করে একটা চলন্ত ট্রাক নিয়ে…।

তিনি বলেন, এধরনের ঘটনা ঘটনোর পরে মানুষ তো সমবেদনা জানায়। আর এই ঘটনা ঘটনোর পরে প্রধানমন্ত্রীর যে সমবেদনা জানানো, প্রধানমন্ত্রীর তার বাসভবনে যাওয়া- কিন্তু যেতে পারবে না। এই মানসিকতা কেন? আর যখন কোন মতেই যেতে পারছেন না তখন তার ব্যক্তিগত সহকারীর মাধ্যমে যে লিখিত সমবেদনাপত্র পাঠানোর ব্যক্তিকে নাজেহাল করা হয়, এই সার্বিক ঘটনা কি মনে হয়? আর তদন্ত দেশে এবং বিদেশী সংস্থাও করেছে।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা আমার দৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য বড় ধরনের একটা দুর্ঘটনা। আমি শুধু আমার প্রতিপক্ষের ক্ষতি করবো আর প্রতিপক্ষ আমার ক্ষতি করবে। কেন? এটা কি অন্য কেউ করতে পারে না? তৃতীয় কোনো শক্তি এই সুযোগ নিতে পারে না? আর এই তৃতীয় শক্তি তো গণতন্ত্র বিরোধী শক্তি। যারা জনগণের সামনে যেতে পারে না। আর প্রশ্নটা হলো, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরে কি তারা (আওয়ামী লীগ) আর কোনো অনুষ্ঠান করেনি। তার মানে হলো জনমনে প্রশ্ন আছে, সরকারের সংশ্লিষ্টরা এটা করতে পারে না।

বাংলাদেশ জার্নাল: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য তার পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। উনি কি চিকিৎসা দেশে করাবেন না বিদেশে?

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: নেত্রীর চিকিৎসাটা অত্যন্ত জরুরি। এখন দেশে-বিদেশে চিকিৎসা ব্যাপার একই অবস্থা। মানে এখন উন্মুক্ত না। আর আমাদের দেশে চিকিৎসাটা যে কী তা করোনা বুঝিয়ে দিয়েছে। আর এই সীমাবদ্ধ চলাফেরার কারণে উনার চিকিৎসাটা না দেশে না বিদেশে হচ্ছে। আর উনি দেশে বা বিদেশে চিকিৎসা করতে চাইলেও তো শর্ত আছে।

বাংলাদেশ জার্নাল: শোনা যাচ্ছে, বিএনপি চেয়ারপারসন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ে বলেছেন, নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জোট করা ভুল ছিল এবং তার নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে যাওয়াও ভুল ছিল?

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: ম্যাডাম এমন কোনো আলোচনা করেননি। আর গত দুই ঈদে উনি রাজনৈতিক আলোচনা এড়িয়ে চলেছেন। শুধু আমরা কে কেমন আছি, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল: প্রতি বছর ১৫ আগস্ট জন্মদিনে বিএনপি চেয়ারপারসন কেক কাটতেন কিংবা দলের পক্ষ থেকে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হতো। কিন্তু এবছর কিছুই করা হয়নি, হঠাৎ করে ব্যত্যয় ঘটলো কেন?

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: যতদিন ধরে বেগম জিয়া রাজনীতিতে এসেছেন, ততদিন ধরে আমি উনাকে দেখছি। আর স্বউদ্যোগে (নিজের ইচ্ছায়) বেগম খালেদা জিয়া কখনো জন্মদিন পালন করেননি। যতো বার হয়েছে সেটা দলীয় নেতাকর্মীরা করেছেন। আর উনি শুধু আমাদের অনুরোধে উপস্থিত হয়েছেন। আর এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে আমরা কেউ যায়নি।

বাংলাদেশ জার্নাল: বিএনপি কি জামায়াত ছাড়ছে?

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: জোটের মধ্যে কখনো কখনো টানাপোড়েন দেখা যায়। আর আমরা অনেক দিন হলো ক্ষমতার বাইরে রয়েছি। আমাদের ২০ দলীয় জোট। এদের রাজনৈতিক আর্দশও এক না। আর এটা জাতীয়তাবাদী জোটও না। আবার জাতীয়তাবাদী বিশ্বাস করে না তারাও এই জোটে আছে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ের জন্য আমাদের জোট হয়েছে। এর প্রত্যেকটা কর্মসূচি গ্রহণের আগে ও পরে কে বেশি পারলো এবং কে পারলো না, এটা নিয়ে আমাদের মধ্যে তো একটু টুকাটুকি হবেই।

বাংলাদেশ জার্নাল: মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যার বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা নিয়ে অনেক রকমের কথা ও গুঞ্জন আছে। সরকার বলেছে যে, এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বিচ্ছিন্ন ঘটনায় দুই বাহিনীর প্রধানের তো যাওয়ার দরকার নাই। আর পুলিশকেই তো ফাইনাল চার্জশিট দিতে হবে। কাজটা তো পুলিশের। সেখানে তো পুলিশের প্রধানই যথেষ্ট। সেখানে সেনা কর্মকর্তাকে কেন যেতে হলো? এটার পরে সরকারের মুখে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা তো বেমানান। আর প্রথমে যে কাহিনীগুলো সাজানো হয়েছে, সেই কাহিনীর সাথে ঘটনা এখন তো সামঞ্জস্যপূর্ণ না। কী এমন ঘটনা ঘটলো? এটাই তো প্রশ্ন। ওখানে ২ শ ৬৪ বা এর অধিক কিংবা কম এই একই ওসির অধিনে ক্রসফায়ার হয়েছে। ক্রসফায়াসের চিত্রনাট্য কিন্তু সব এক রকমই। আর আইনের না, সরকারের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পুলিশের কিছু লোক উশৃঙ্খল হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ জার্নাল: ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার হঠাৎ ঢাকা সফরকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: এটা আমি অবশ্যই বাঁকা চোখে দেখি না। কারণ একটা রাষ্ট্রের পৃথিবীর সকল দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক থাকে। তবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কটা একটু কম আর বেশি থাকে। আর প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকাটা তো স্বাভাবিক। তবে যে কোনো কূটনৈতিক সফরে যাওয়া এবং আসার বিষয়ে কিছু কিছু জায়গায় কিছু রুটিন থাকে। যেমন সময় দেয়া থাকে। কিন্তু এই সফর সরকার জানলো, জনগণ জানলো না। জনগণের কাছে মনে হলো নোটিশ ছাড়া। আবার দ্বিপাক্ষিক যখন কোনো আলোচনা হয়, এটা একান্তই সৌজন্য আলোচনা হয় না। কিছু না কিছু দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাপার থাকে। সেটা কিন্তু স্বাগতিক দেশ হিসেবে আগেই এজেন্ডা নির্ধারণ হয়। কারণ তারা (ভারত) যখন বলেছে যে আসছি, তখন তারা কোনো কিছু নির্ধারণ করে না। তারা শুধু ইচ্ছা প্রকাশ করে যে কী বিষয়ে আলোচনা হবে। সেটাও কিন্তু কেউ আসার আগেই উভয় দেশের সম্মতিতে এজেন্ডা তৈরি হয়। উনি আসলেন। উনার সঙ্গে আলোচনা হলো। প্রায়ই আসেন। অনেকেই আসেন। আর আলোচনাও হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ ও মিডিয়া জানতে পারে না।

এখানকার (বাংলাদেশ) পররাষ্ট্র সচিব কোনো ব্রিফিং করলেন না। আগমনের কী বার্তা, কী আলাপ ও আলোচনা এবং কী ব্যাপার। এটা তো কোনো ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক ব্যাপার না। বিষয়টা রাষ্ট্রীয়। রাষ্ট্রীয় বিষয় তো দেশের জনগণ জানবেই। এটা জানার সাংবিধানিক অধিকার। তারা (ভারত) কিন্তু ওখানে গিয়ে ব্রিফিং করলো! তারা গিয়ে ব্রিফিং করে তাদের দেশের জনগণকে জানালো, আমরা বাংলাদেশে গেলাম- এই এই বিষয়ে আলোচনা হলো। সেখান থেকে আমাদের সাংবাদিকরা কিছু নিউজ…। একটা যৌথ ব্রিফিং হতে পারতো। তাও হয় নাই। আবার সংসদ সদস্যরাও জানেন না কখন কী হয়।

বাংলাদেশ জার্নাল: বিএনপি কি আগামীতে কোন ইস্যুতে আন্দোলনে যাবে?

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: আন্দোলন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বাইরে না। আর নির্বাচনটা হচ্ছে আমাদের মুভমেন্টের অংশ।

বাংলাদেশ জার্নাল/কেএস/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত