ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ৯ মাঘ ১৪২৬ অাপডেট : ১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:২৫

প্রিন্ট

মিষ্টিকুমড়া মার্কা ছেলে, শিক্ষিত মা ও একজন গর্ভবতী মহিলা

মিষ্টিকুমড়া মার্কা ছেলে, শিক্ষিত মা ও একজন গর্ভবতী মহিলা
এএসএম হাফিজুর রহমান রিয়েল

এবার কোরবানির ঈদের পরদিন। ঠাকুরগাঁও থেকে দিনাজপুরে আসছি। বাহন তথাকথিত গেটলক বাস। প্রচণ্ড গরম আর ভিড়ের মধ্যে উঠলাম ঠাকুরগাঁও থেকে। বাসের ভেতরে ঢুকেই ‘তিল ধারণের জায়গা নেই’ কথাটার সার্থকতা খুঁজে পেলাম। গেটলকের স্থানীয় বুকিং মাস্টার আমার পরিচিত থাকায় একটা সিট রাখতে অনুরোধ করেছিলাম।

অনেক মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমি না বসে অশীতিপর এক বৃদ্ধ চাচাকে আমার সিটে বসতে দিলাম। তিনি রাজ্যের আনন্দ নিয়ে হাসি মুখে বসলেন। আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। বললাম, ঢাকায় একটা চাকুরি করি (আমি সহজে কাউকে আমার পরিচয় প্রদান করতে পছন্দ করি না)।

গাড়ি ছাড়লো। গাড়ি ছাড়ার একটু পরেই ভাদ্র মাসের তালপাকা রোদের অস্তিত্ব টের পেলাম। গাড়িটা কবিরাজহাট নামক স্থানে এসে দাঁড়াতেই হুড়মুড় করে বেশ কিছু লোক উঠে পড়ল। তার মধ্যে একজন গর্ভবতী মহিলাকেও দেখলাম। বেচারি ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। বারবার শুধু আঁচল দিয়ে ঘাম মুছছিলেন। বসার মতো একটি সিটও নেই। কী করা যায় ভাবছিলাম।

আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখানেই দেখলাম একজন মহিলা বসে আছেন। পাশেই বসা তার ছেলে। নবম –দশম শ্রেণির ছাত্র হবে। বেশ হৃষ্টপুষ্ট। লম্বা হয়নি খুব একটা। মিষ্টিকুমড়ার মতো সাইজ।

হাপুস-হুপুস করে চিপস খাচ্ছে ও। ভদ্র মহিলাকে শিক্ষিত ও স্মার্ট মনে হল। আস্তে করে বল্লাম-আন্টি একটু জায়গা হবে? ‘আন্টি’ শব্দটা পছন্দ হয়নি। বুঝলাম উনার তাকানোর ভঙ্গিতে। (আপা করে ডাকলেই ভালো হতো ভাবলাম)

আমার এই আবদার শুনে তিনি বেশ উত্তেজিত হয়েই বললেন- ‘জায়গা হবে মানে? দেখতে পাচ্ছেন না আমি আর আমার ছেলে বসে আছি, জায়গা আমি বানাবো নাকি?’

মহিলার মাঝখানের দাঁতটা একটু ফাঁক ছিল। তাই আমার সাথে কথা বলার সময় অনুভব করলাম উনার দাঁতের ফাঁক দিয়ে দু–তিন ফোঁটা থুথু আমার গালে এসে পড়ল। সেটা মুছতে মুছতে বললাম- ‘না মানে, সিট বানাতে বলিনি, যদি আপনার ছেলেটিকে একটু সিট ছেড়ে দাঁড়াতে বলতেন, তাহলে ওই যে দেখছেন একজন গর্ভবতী মা তিনি এখানে বসতে পারতেন’।

‘না না তা হবে কেন? আমার ছেলেটা কেন দাঁড়িয়ে যাবে? আমি তো টাকা দিয়ে সিট কিনেছি, তাহলে সিট ছেড়ে দেব কেন?,আমার ছেলেটার কষ্ট হবে না?’- একথা শোনার পর ভাবলাম তিনি অন্য জাতের মানুষ। আর তর্ক করিনি। এরপর সামনের দিকের একজন ভদ্রলোককে অনুরোধ করে ওই মহিলাকে বসালাম।

আবার বাস চলা শুরু করেছে। আমার খুব ইচ্ছে হলো, ওই মহিলার পরিচয় জানার। কাছে গেলাম। ধীরে ধীরে ভাব জমানো শুরু করলাম। তবে এবার আন্টি নয় আপা দিয়ে শুরু হলো কথোপকথন।

‘আপা আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত’। আপা ডাক শুনে যেন খুশি হলেন। দুটো ঠোঁটকে একসাথে চেপে ধরে লিপস্টিকের রঙটা ঠিক করতে করতে বললেন- না, না ঠিক আছে, আমি কিছু মনে করিনি’।

পরিচিত হয়ে জানতে পারলাম তিনি একজন বেসরকারি কলেজে বাংলা পড়ান। ছেলেটি দশম শ্রেণিতে পড়ে।

এবার ভাবলাম তার মতো এরকম একজন অমানবিক,অভদ্র মহিলার কাছে তার ছাত্ররা কী শিখছে? ছাত্রদের কথা বাদই দিলাম, তার সাথে বসে থাকা তার সন্তানটিই বা কী বার্তা পেল তার মার কাছ থেকে। কী শিখল ও?

সন্তানের সবচেয়ে বড় শিক্ষক হলেন মা-বাবা। মা-বাবার কাছ থেকেই একজন শিশু নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা পায়। আমরা সেই শিক্ষা দিতে পারছি তো?

লেখক: অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড ওয়ার্কশপ বিভাগ, ডিএমপি

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close
close