ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২ পৌষ ১৪২৫ অাপডেট : ৩৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:২১

প্রিন্ট

‌‌‌‌‘আপনাকে ইতর বলবো নাকি স্টুপিড বলবো’

‌‌‌‌‘আপনাকে ইতর বলবো নাকি স্টুপিড বলবো’
নিঝুম মজুমদার

ব্ল্যাক ব্যান্ডের সাবেক ভোকাল জন কবির এবং উপস্থাপিকা/মডেল মিথিলার একটি ছবি আমার ফেসবুক ফিডে অন্তত গোটা ১৫ বন্ধু পোস্ট করেছেন এবং পোস্ট করে নানাবিধ মন্তব্য করেছেন। এসব ছবি আর পোস্টের মধ্যে একজনের পোস্টের মন্তব্য ছিলো ভয়াবহ। ভয়াবহ মানে ভয়াবহতম।

আসুন একটু দেখে নেই সে ব্যক্তি কি মন্তব্য করেছেন- ‘আগে জন ও তাহসান শুধু 'ভাই' ছিল এখন তারা ভাই থেকে ‘চুদিরভাই পদে’ প্রমোশান পেয়েছেন কারন তারা দুভাই একজনকেই ‘দেছেন সেই হিশেবে’

এই নোংরা মন্তব্যের পর আপনাদের গা ঠিক যেমন গুলাচ্ছে, গুলাচ্ছে আমারও। এসব নিয়ে আমি বলছি একটু পরে। তার আগে চলুন জন কবিরের ফেসবুকের সেই পোস্ট থেকে ঘুরে আসি। ছবি দেখেই মূল পোস্ট অর্থ্যাৎ জন কবির সাহেবের ফেসবুকে গিয়ে ছবিটি দেখলাম। আসলে বলা উচিৎ ছিলো, ছবিটির নীচের মন্তব্যগুলো দেখলাম।

মন্তব্য গুলো পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো বাংলাদেশে ঠিক এই লেভেলে অসভ্য আর বর্বরদের চাষ কি করে হলো? এসব দেখে হুমায়ুন আজাদের মত করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিলো

যে তুমি ফোটাও ফুল, বনে বনে গন্ধ ভরপুর;

সেই তুমি কেমন ক’রে বাঙলা, সে তুমি কেমন ক’রে...

দিকে দিকে জন্ম দিচ্ছো- পালেপালে শুয়োর কুকুর..

জন কবিরের পোস্টে গিয়ে বাংলাদেশের এমন অসংখ্য অসভ্য শুয়োর আর কুকুরদের দেখা পেলাম কিন্তু তার থেকেও ভয়াবহ হচ্ছে এই অসভ্যদের পাশাপাশি মূল পোস্টদাতা জন কবির নিজেও এই পুরো ব্যাপারটিতে এক ধরনের পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছেন।

অভিনেতা/গায়ক তাহসান আর মিথিলার ডিভোর্স বা বিচ্ছেদ নিয়ে যে লেভেলের নোংরামি করেছে মন্তব্যকারীরা ঠিক সেটিকে উষ্কে দিয়েছে খোদ জন কবির। মুখ ভর্তি দাঁড়ি আর গোঁফ সদৃশ এই সক্রেটিস মনে হওয়া লোকটিকে আমার কাছে এক ধরনের ইতর ব্যক্তি মনে হয়েছে। এমন ইতর মনে হয়েছে যে ইতর ঠিক জানেন না একটি মেয়েকে নিয়ে যখন গণহারে ট্রল করা হয়, অসভ্যতা করা হয় সেটিকে ঠিক কিভাবে নিয়ন্ত্রন করতে হয়।

জনের ফেসবুক প্রোফাইলে মিথিলা আর জনের ছবিটি জন ‘কন্টেন্ট’ শিরোনামে পোস্ট করেছিলেন। শিরোনামটির পাশে জন কবির আবার একটা বদমাইশি হাসির ইমোটিকনও দিয়ে রেখেছে।

আর তার পর পর যে অকথ্য ভাষায় সেখানে মন্তব্যগুলো এসেছে সেটিকে খুবই শক্ত হাতে দমন করতে পারতেন জন। সেটি সে না করে ফুয়াদ মুক্তাদির নামে আরেক লোকের সাথে সে মশকারি শুরু করে দিয়েছিলো। আসুন আমরা দেখে নেই মশকারির কিছুটা প্রমাণ-

Fuad Almuqtadir: Bhabi

Jon Kabir: Amaro bhabi

শুধু এখানেই ব্যাপারটা থেমে গেলো যে হোতো তা নয় বরং তাহসানের গানের কথা ব্যাঙ্গ করে ফুয়াদ মুক্তাদির নামে লোকটি মন্তব্য করেছে এবং জন কবির সেখানে খুব স্বাভাবিক ভাবে এসে মন্তব্য করে যাচ্ছে।

আমিও সেখানে একটা মন্তব্য করে এসেছিলাম জন কবিরকে উদ্দেশ্য করে। সেটিও উল্লেখ করে দিচ্ছি এই লেখায়- ‘অন্য ব্যক্তিরা এখানে কি নোংরা মন্তব্য করেছেন এটি বিবেচনায় এনে কথা বলতে গেলে থিসিস সাবমিট করবার মত করে বিস্তর লিখতে হবে। কিন্তু ফুয়াদ মুক্তাদিরের সাথে আপনার মন্তব্যের যে আদান-প্রদান লক্ষ্য করেছি, তাতে মনে হয়েছে এই ভদ্রমহিলাকে নিয়ে আপনিও নোংরামি কম করেন নি এবং ইনফ্যাক্ট উষ্কেছেন। আপনাকে দূর থেকে ভদ্রলোক মনে করতাম। এখন মনে হচ্ছে ফুয়াদ, আপনি ইনফ্যক্ট আপনাদের পুরো গ্যাংটির ভব্যতা সমস্যা রয়েছে। একজন ভদ্রমহিলাকে উত্যক্ত করছে আপনার পোস্টের কারনে এবং আপনি মন্তব্যে রীতিমত মশকারী করছেন। আপনাকে ইতর বলব নাকি স্টুপিড বলব আমি জানিনা। দাড়ি বেড়েছে লকলকে শীম গাছের মত, কিন্তু বুদ্ধি এক ছটাকও হয়নি। আফসোস...’

আমরা সাধারণত আমাদের ফেসবুক প্রোফাইলে যখন কোনো বন্ধু-বান্ধবের ছবি দেই তখন লক্ষ্য রাখি সে বন্ধুর সম্মানের দিকে। যেমন সেই ব্যাক্তিকে কেউ গাল দিলো কিনা কিংবা তাকে নিয়ে অশালীন বা কুরুচিপূর্ণ কিছু বল্লো কিনা। আমার ফেসবুকে আমার দায়িত্ব আমার বন্ধু কিংবা পরিচিতের সম্মান রক্ষা করা। সেটি তো জন কবির করেই নি বরং খুবই পরোক্ষ ভাবে এই পুরো ইতরামির মধ্যে সে সামিল হয়েছে জেনে ও বুঝে।

তাহসান আর মিথিলার সংসার টেকেনি। সংসার টেকেনা এমন অসংখ্য উদাহরন রয়েছে কিংবা ঘটনা রয়েছে। বাংলাদেশের একজন পরিচিত মিডিয়া ব্যাক্তির যদি ডিভোর্স হয় তবে সেটি কি করে যেন অধিকাংশ বাঙ্গালীর বড় আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়। যেমন হুমায়ুন-গুলতেকিন, সাকিব-অপু বিশ্বাস, তাহসান-মিথিলা ইত্যাদি।

এই অধিকাংশ হাফ পশু জাতীয় মানুষ সুযোগ পেলেই এই ব্যাক্তিগত বিষয়াদি নিয়ে মন্তব্য করতে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এরা খুব অবলীলায় মনে করেন যে, যে কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে বোধকরি নাক গলানো যায় কিংবা মন্তব্য করা যায়।

জন কবির আর মিথিলার পোস্ট করা ছবিটিতেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে। মিথিলা আর জন কবিরের ছবিটি দেখে সবচাইতে যে ব্যাক্তিটিকে ট্রল করা হয়েছে, সেই ভদ্রলোকের নাম তাহসান। কোনো কারন নেই, কারো আগেও নেই, পিছেও নেই, এই মানুষটিকে নিয়ে অযথা ট্রল আর গালাগালির বন্যা বয়ে গেছে। কেন গেলো, কি কারনে গেলো এর কোনো ব্যখ্যা স্বয়ং এই হাফ পশুদের সৃষ্টিকর্তাও বলতে পারবেন কিনা আমার তা জানা নেই।

আমি খুব বুঝতে পারি মিথিলার কেমন লাগছে এইসব নোংরামো দেখে কিংবা অনুমান করতে পারছি তাহসান লোকটির কেমন লাগছে এসব দেখে। এই মানুষগুলো আমাদের মিডিয়া জগতে কাজ করেন, আমাদের বিনোদন দেবার চেষ্টা করেন, আমাদের অজস্র আনন্দের মুহুর্ত তৈরী করেন অথচ সুযোগ পেলেই আমরা এই মানুষগুলোকে নিয়ে এমন সব আচরণ করি যেন মনে হয় এই বাংলাদেশ একটি শুয়োরের খামার। মনে হতে পারে যেন এই দেশটি কোনো এক অদ্ভুত কারনে লক্ষ লক্ষ হারামীদের অভয়ারণ্য হয়ে গেছে।

এই পর্যন্ত এসে আমি থেমে যেতে পারি। থেমে যাবার আগে আপনাদের এইবার মনে করিয়ে দেই এই পোস্টের একেবারে শুরুতে যে লোকটির মন্তব্য আমি কোট করেছি সেটিকে।

যে ব্যাক্তিটি এই মন্তব্য করেছেন তার নাম অদেবপ্রিয় মজুমদার। হয়ত ব্যাক্তি জীবনে তিনি অনেকের কাছে ভালো স্বামী কিংবা ভাই কিংবা পূত্র। এসবের কিছুই আমার জানা নেই তার ব্যাপারে। শুধু এইটুকু জানা গেলো যে এমন দেব অপ্রিয়ের মত চিন্তা ভাবনা অধিকাংশ বাংলাদেশীরা করেন। এসব অদেবপ্রিয়, এসব জন কবির, এসব ফুয়াদ আল মুক্তাদিরে পুরো দেশটা ভর্তি হয়ে আছে।

পাছার ঠিক তল বরাবর দু'টো লাথি মেরে কিংবা কানের ঠিক নীচে একটা গভীর চড় দিয়ে যদি জন কবির কিংবা অদেবপ্রিয়দের বোধশক্তিকে ভব্যজগতের মধ্যে নিয়ে আসা যেতো, তবি আমি হয়ত সমস্যা সমাধানে সেসব শক্তিকেই বিনিয়োগ করতে বলতাম। কিন্তু আদতে এসব অর্ধ পশুদের মেরে কিংবা কেটে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। ইনফ্যাক্ট হবেও না। এসব ভব্যতা শিখতে হয় পরিবার থেকে। বাবা মায়ের কাছ থেকে। যিনি পরিবার থেকে বিকশিত হতে ব্যর্থ হয়েছেন তাকে বুড়ো বয়সে আপনি বিকশিত করতে পারবেন না।

মনে নেই আপনাদের? প্রকাশক দীপন ভাইকে যখন খুনীরা খুন করে রঞ্জিত করে পালিয়ে গেলো তখন তাঁর বাবা কাশেম স্যার এই হত্যার বিচার চান নি। তিনি শুধু বলেছিলেন, "আমি সকলের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক এটিই চাই"

জন কবির, ফুয়াদ আল মুক্তাদির কিংবা অদেবপ্রিয়ের মত ব্যাক্তিদের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক, তারা মানুষের মত আচরণ করতে শিখুন... এই চাওয়া ছাড়া আর কি-ই বা করতে পারি আমরা?

লেখক, ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close
close