ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ৮ আষাঢ় ১৪২৮ আপডেট : ৬ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১০ মে ২০২১, ১০:১৮

প্রিন্ট

পৃথিবীর অষ্টম মহাদেশ আবিষ্কার, তবে নাম নেই কোনো মানচিত্রেই

পৃথিবীর অষ্টম মহাদেশ আবিষ্কার, তবে নাম নেই কোনো মানচিত্রেই
পৃথিবীর অষ্টম মহাদেশ জিল্যান্ডিয়া। ছবি: সংগৃহীত

ফিচার ডেস্ক

ছোটবেলায় সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে পড়েছি পৃথিবীতে মহাদেশের সংখ্যা কতটি? সহজে এই উত্তর ৭টি। যা এখনো আমাদের মাথায় ঢুকে আছে। তবে এই উত্তর এখন বললে একটু সমস্যা থেকেই যায়। কারণ আমাদের জানা এই ৭টি মহাদেশ ছাড়াও আরো একটির হদিশ রয়েছে এই পৃথিবীতেই। অবশেষে আবিষ্কার হলো পৃথিবীর অষ্টম মহাদেশ। ধারনা করা হয় যে এটি আবিষ্কার করতে সময় লেগেছে ৩৭৫ বছর। দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে ৪ বছর আগে সেই মহাদেশকে আবিষ্কার করা হয়েছিলো।

তবে কোনো মানচিত্রে বা কোথাও সেই নতুন মহাদেশের উল্লেখ আপনি পাবেন না। ইউরোপের অনেক অভিযাত্রীই মনে করতেন যে ল্যাটিন আমেরিকা ছাড়িয়ে আরো দক্ষিণ-পশ্চিমে গেলে একটা নতুন মহাদেশের খোঁজ পেতে পারেন তারা।

ইউরোপের অনেক অভিযাত্রীই মনে করতেন, ল্যাটিন আমেরিকা ছাড়িয়ে আরো দক্ষিণ-পশ্চিমে গেলে একটা নতুন মহাদেশের সন্ধান পাওয়া যাবে। সাধারণ মানুষ অবশ্য সেই ভাবনাকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিতেন। তেমনই এক ‘পাগল’ অভিযাত্রী আবেল তাসমান। ডাচ তাসমান একদিন জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন সেই নতুন মহাদেশের সন্ধানে। সেটা ১৬৪২ সাল। পুরু গোঁফে তা দিয়ে তাসমান জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি জয়ী হয়েই ফিরবেন।

ডাচ তামসান এই মহাদেশ আবিষ্কারের নেশায় ছুটেছিলেন একাই

নতুন মহাদেশের সন্ধান অবশ্য পেয়েছিলেন তাসমান। ল্যাটিন আমেরিকা পেরিয়ে আরও বেশ খানিকটা এগিয়ে যেতেই সমুদ্রের বুকে দেখা মিলল স্থলভাগের। তবে সেই আদিম জনজাতি অধ্যুষিত স্থলভাগে ইউরোপীয়দের পক্ষে পা রাখা সহজ ছিল না। বেশ কয়েক দফায় যুদ্ধ জিতে অবশেষে শুরু হল ‘সভ্যতার জয়যাত্রা’। তবে না, তাসমানের আবিষ্কার করা সেই মহাদেশ আমাদের অজানা নয়। এটি ওশেনিয়া মহাদেশ। মানে অস্ট্রেলিয়া নামেই যাকে বেশিরভাগ মানুষ চেনেন। অবশ্য এছাড়াও সেখানে আছে নিউজিল্যান্ডের মতো দেশও।

তবে অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কারেই কিন্তু অভিযান থেমে থাকল না। কারণ অনেকে তখনও বিশ্বাস করেন, যে মহাদেশের সন্ধান করতে গিয়েছিলেন তাসমান তা তিনি পাননি। অবশেষে ২০১৭ সালে পাওয়া গেল সেই অজানা মহাদেশের হদিশ। নিউজিল্যান্ডের একদল অভিযাত্রী সেই মহাদেশের সন্ধান দিলেন। মহাদেশটির প্রায় ৯৩ থেকে ৯৪ শতাংশ রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে নিমজ্জিত। নিউজিল্যান্ড এই মহাদেশের পানির ওপরে থাকা একমাত্র অংশ। বলা যেতে পারে, এই মহাদেশের পর্বতচূড়া। বাকি সবটুকু পানির নিচে। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা এই ‘মহাদেশ’টির নাম দিয়েছেন জিল্যান্ডিয়া। আকারে এটি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় সমান।

জিল্যান্ডিয়ার খুঁজতে গিয়েই আবিষ্কার হয়েছিল আস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড

সেই আবিষ্কারের প্রমাণও হাজির করলেন অভিযাত্রীরা। তারপরও এখনো পৃথিবীর মানচিত্রে নেই এই মহাদেশের অস্তিত্ব। বর্তমানে মানচিত্র আঁকতে তোন আর জাহাজ নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিতে হয় না। স্যাটেলাইটের ছবিতেই সব ধরা পড়ে। তাহলে সেখানে একটা আস্ত মহাদেশের অস্তিত্ব ধরা পড়ল না?

এর মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞদের বেশিরভাগ দাবি করেন, এটিকে মহাদেশ বলা হলেও তার অবস্থান কিন্তু সমুদ্রের নিচে। উপরে রয়েছে প্রায় ২ কিলোমিটার উঁচু জলস্তর। আর অভিযাত্রীরা তার নাম দিয়েছেন জিল্যান্ডিয়া। আর এর আয়তন ৪.৯ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার। তবে অনেকেই এখানে প্রশ্ন করতে পারেন, সমুদ্রের নিচে থাকা কোনো ভূখণ্ডকে কি মহাদেশ বলা চলে না? এর সপক্ষে অবশ্য বেশ কিছু সংজ্ঞা ও নথি হাজির করে নিউজিল্যান্ডের ভূতাত্ত্বিকরা প্রমাণ করেছেন, যেহেতু সমুদ্রগর্ভ থেকে ভূখণ্ড অনেকটাই উঁচুতে তাই তাকে মহাদেশ বলে মেনে নিতেই হয়। তবে ৩৭৫ বছর ধরে অনুসন্ধানের পর যে মহাদেশের হদিশ পাওয়া গেল, তাকে এখনও স্বীকৃতি দিতে রাজি নন অনেকেই।

তাসমানের আবিষ্কার করা সেই মহাদেশ ছিল ওসেয়ানিয়া

জিল্যান্ডিয়াকে মহাদেশ হিসেবে বিবেচনা করার জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ১১ জন ভূতাত্ত্বিকের দীর্ঘ গবেষণা করেছেন এবং তাদের ফলাফলও পেশ করেছেন। ভূবিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, জিল্যান্ডিয়ার মধ্যে এই সকল গুণই বিদ্যমান। জিল্যান্ডিয়ার কিছু মাটি ও পাথরের নমুনা নিয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন। এর মাটির সঙ্গে মহাদেশ ভিত্তিক যে ভূখণ্ড রয়েছে তার আশ্চর্যজনক মিল রয়েছে। কিন্তু সমুদ্রের তলদেশের গঠনের সঙ্গে এই মাটির কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই বলা যায় একটি মহাদেশ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চারটি বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান জিল্যান্ডিয়ার।

অন্যদিকে একদল গবেষক বলছেন, জিল্যান্ডিয়াকে বৃহৎ এবং সমন্বিত এলাকা হিসেবে এখনো বিবেচনা করা যায় না। এর অর্থ দাঁড়ায়, জিল্যান্ডিয়াকে মহাদেশ হিসেবে দাবি করা যায় না। তবে সম্প্রতি স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং সমুদ্র তলের মাধ্যাকর্ষণ মানচিত্র ব্যবহার করে জিল্যান্ডিয়াকে একটি সমন্বিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমুদ্রের প্রায় তিন হাজার ২৮০ ফুট নিচে নতুন এই মহাদেশটির সীমারেখা দেখতে পাওয়ার পর থেকেই তার উপর ভিত্তি করে ভূতাত্ত্বিকগণ জিল্যান্ডিয়াকে মহাদেশ হিসেবে মেনে নেয়া যায় বলে জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেন।

তবে এর পিছনে অবশ্য রাজনৈতিক কারণকেই দায়ী করছেন নিউজিল্যান্ডের গবেষকরা। আসলে এই মহাদেশকে স্বীকৃতি দিলেই নিউজিল্যান্ডকে আর ওশেনিয়ার অংশ বলা চলে না। কারণ একই ভূখণ্ডের কিছুটা উঠে এসেছে সমুদ্রের উপরে। আর তারই নাম নিউজিল্যান্ড। ফলে নিউজিল্যান্ডের সীমানা যেমন অনেকটাই বেড়ে যাবে, তেমনই বাড়বে রাজনৈতিক ক্ষমতাও। আর এইসব কারণেই নাকি চেপে রাখা হয়েছে আস্ত একটি মহাদেশের খবর। রাজনৈতিক চাপানউতোর চলতেই থাকবে। কিন্তু এই আবিষ্কারের কাহিনী সত্যিই রোমাঞ্চকর।

তবে এই মহাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে উঠে এলে বিশাল এক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এবার চলুন এই মহাদেশ আবিষ্কারের গল্পটা জেনে নেয়া যাক-

১৯৯৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ব্রুস লুয়েন্ডিক ‘জিল্যান্ডিয়া’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। ১৯৬০ সালে সমুদ্রের নিচে তেলের খনি অনুসন্ধানের সময় এই মহাদেশের অস্তিত্ব খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা। তারপর জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আরো বিস্তৃত গবেষণা কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। এ সময় বিজ্ঞানীদের হাতে এমন কিছু তথ্য আসে যার উপর ভিত্তি করে তারা জিল্যান্ডিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হন।

নিউজিল্যান্ডের জিএনএস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকদের দীর্ঘ ছয় বছরের গবেষণায় উঠে আসে মহাদেশটি সম্পর্কে নানা অজানা তথ্য। সমুদ্র তলদেশ থেকে প্রায় ১২ হাজার ২১৭ ফুট উচ্চতায় এই মহাদেশের অবস্থান। খুবই সম্পদশালী এই মহাদেশ। এর সমুদ্রের নিচে রয়েছে বিপুল পরিমাণের জীবাশ্ম জ্বালানি, যা পৃথিবীর ভবিষ্যতের দীর্ঘ সময়ের জ্বালানির চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এর মূল্য হবে বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। শুধু তাই নয়, ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে অস্ট্রেলিয়া এবং অ্যান্টার্কটিকার চেয়ে একেবারেই আলাদা হবে এই জিল্যান্ডিয়া মহাদেশ।

অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ থেকে এটি বিচ্ছিন্ন হয় ছয় থেকে আট কোটি ৫০ লাখ বছর আগে। পরবর্তীতে ১৩ কোটি বছর আগে জিল্যান্ডিয়া অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ ও অ্যান্টার্কটিকা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, ২৩ কোটি বছর আগে সম্ভবত মহাদেশটি সম্পূর্ণ নিমজ্জিত ছিল। বর্তমানে মহাদেশটির সিংহভাগই প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে নিমজ্জিত। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম মহাদেশীয় ভূখন্ডাংশ বা অনুমহাদেশ যার আয়তন প্রায় ৪৯,২০,০০০ কিলোমিটার।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত