ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬ আপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:২৬

প্রিন্ট

মিশরে সরকার বিরোধী আন্দোলনের ‘স্ফূলিঙ্গ’ মোহাম্মদ আলী

মিশরের ‘স্ফূলিঙ্গ’ মোহাম্মদ আলী
অনলাইন ডেস্ক

দীর্ঘ পাঁচ বছর পর মিশরের স্বৈরশাসক জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি-র পদত্যাগের দাবিতে শুক্রবার উত্তাল হয়ে উঠেছিলে গোটা মিশর। ২০১৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর জেনারেল সিসি সরকারের বিরুদ্ধে দেশটিতে এ ধরনের বিক্ষোভ দেখা গেলো। স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে এই বিক্ষোভের খবর। অথচ এই বিক্ষোভের যিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি কিন্তু মিশরে থাকেনই না। অনলাইনে মিশরের সরকার বিরোধী গোটা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্পেনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা এই নেতা। তার নাম মোহাম্মদ আলী, যিনি পেশায় একজন ধণাঢ্য ব্যবসায়ী। বিদেশে বসে এ ধরনের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ার ঘটনা মিশরে বিরল।

মোহাম্মদ আলী (৪৩) একজন অভিনেতা, চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগকারী, যিনি দেশ ছেড়ে পালানোর আগে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে সেনাবাহিনীর ঠিকাদার হিসাবে কাজ করেছেন। এরপর তিনি স্পেনে পালিয়ে যান।

মিশরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মোহাম্মদ আলী। আর তার বাবা ছিলেন মিশরের বাডবিল্ডিং চ্যাম্পিয়ন দলের ম্যানেজার। একসময় অভিনেতা এমনকি রেসলার হিসবে কাজ করেছেন মোহাম্মদ আলী। ২০১৩ সাল পর্যন্ত মোট চারটি টিভি সিরিজ এবং তিনটি মুভিতে তাকে দেখা গেছে। ঠিকাদার হিসাবে কাজ করার আগে তিনি মোট ১৪টি পৃথক পেশায় কাজ করেন, একমাত্র রাজনীতি ছাড়া। তিনি জানান, দেশে থাকতে তিনি কখনও কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেননি, এমনকি কোনো সংগঠনের কর্মী হিসাবেও কাজ করেননি। জীবনে একবারই মিছিলে গেছেন ২০১২ সালের নভেম্বরে, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে। মেই তিনিই কিনা মিশরে সরকার বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আলোড়ন তৈরি কেরছেন।

ভিডিও দিয়েই নেতা

আগেই বলেছি এই লোক জীবনে কখনও কোনো রাজনৈতিক দলে য্গে দেননি, নিজেও কোনো দল গঠন করেননি। কেবল সামাজিক সোশ্যাল মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট সিসির দুর্নীতি নিয়ে একাধিক ভিডিও বের করেই মিশরের জনগণের নায়ক বনে গেছেন। শুক্রবার মিশরের রাজধানী কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, সুয়েজের মতো বড় বড় শহরগুলোর রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারী। এ সময় মিছিলকারীদের ‘ভয় নয়, জেগে উঠো, সিসি হটাও’স্লোগানে কেঁপে উঠে মিশরের রাজপথগুলো। রাজধানী কায়রোর ঐতিহ্যবাহী তাহরির স্কয়ারেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এই বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলেন প্রবাসে থাকে মোহাম্মদ আলী।

তার অভিযোগ সিসি ও তার সেনাবাহিনী সরকারি রাজপ্রাসাদ, ভিলা আর হোটেল নির্মাণের নামে জনগণের থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। মঙ্গলবার প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি সিসিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তোমার সময় শেষ, এবার ক্ষমতা ছাড়।’

ওই ভিডিওতে তিনি বৃহস্পতিবারের মধ্যে জেনারেল সিসিকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানান। আর তা না করলে মিশরের জনগণকে শুক্রবার রাস্তায় নেমে আসার ডাক দিয়েছিলেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে শুক্রবার মিশরের বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে আসে। দেশটির ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতা মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত ও আটক করার পর বহু বছর মিশরে এ ধরনের বিক্ষোভ দেখা যায়নি।

তিনি চলতি মাসের গোড়ার দিক থেকেই সিসির বিরুদ্ধে নানা ভিডিও প্রকাশ করতে শুরু করেন। ফেসবুকে তার প্রথম ভিডিওটি প্রকাশ হয় গত ২ সেপ্টেম্বর। এটি প্রত্যক্ষ করেছিলো ১৭ লাখ মানুষ। এর পর থেকে তিনি মিশরে সিসি বিরোধিতার প্রতীকে পরিণত হন। আল-সিসির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে তাকে নিয়ে ইতিমধ্যে কয়েক শ’কার্টুন তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি তাকে অটোমান-যুগে মিশর শাসন করা বীর কমান্ডার মোহাম্মদ আলির সঙ্গে তুলনা করে প্রচুর চিত্র প্রকাশ করা হয়েছে।

এ সম্পর্কে দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্রাজুয়েট স্টুডিওর প্রধান মোহাম্মদ ইলমাসরি বলেন,‘এই মুহুর্তে মোহাম্মদ আলী হচ্ছে মিশরের সবচেয়ে জনপ্রিয়। লাখ লাখ মানুষ তার ভিডিও দেখছেন। সিসির বিরুদ্ধে দুর্ণীতির অভিযোগ এনে করা তার বক্তব্যের ভিডিওগুলো ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, তার এসব বক্তব্য সিসি সরকারের বিরুদ্ধে হুমকি তৈরি করেছে এবং তিনি তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন। কেননা মোহাম্মদ আলীকে গুরুত্ব না দিলে সিসি গত সপ্তাহের যুব সম্মেলনে মোহাম্মদ আলীর অভিযোগের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন না।

একটি স্ফূলিঙ্গের খোঁজে

২০১৩ সালের ৩ জুলাই সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দি করে ক্ষমতা দখল করেন সেনাপ্রধান জেনারেল সিসি। এর প্রতিবাদে মুরসি সমর্থকরা রাস্তায় নামলে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন ব্রাদারহুডের প্রায় হাজারখানেক নেতাকর্মী। সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করা হয়। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় দলটির প্রায় হাজারখানেক নেতাকর্মীকে। গ্রেপ্তার করা হয় কয়েক হাজার মুরসি সমর্থককে। কারাগারে পাঠানো হয় মিসরের ইতিহাসের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে। বন্দি অবস্থায় কারাগারেই মারা যান মুরসি

মুরসির পতনের পর থেকেই প্রতিবাদে ফেটে পরার জন্য মুখিয়ে ছিলো মিশরের সাধারণ মানুষ। কিন্তু তাদের সেভাবে সংগঠিত করতে পারছিলো না মিশরের নেতারা। জোর করে ক্ষমতা দখল করা সিসি কঠোর হাতে সে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। বিচারের নামে হাজার হাজার মানুষকে আটক ও ফাঁসি দেয়া হয়েছে।

আলী তার ভিডিওতে এসব রাজবন্দিদের মুক্তি দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের মুখোমুখি না হয়ে তাদের রক্ষার জন্যও আহ্বান জানান।

তবে সিসির সমর্থকরা বলছেন এ ধরনের সরকার বিরোধী বিক্ষোভ দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে। তারা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য প্রেসিডেন্ট সিসিকে কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন। যদিও গত জুলাইয়ে প্রকাশিত এক সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশটিতে প্রতি দিনজনের একজন অর্থাৎ ১০ কোটি লোক দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছে। দেশটিতে প্রশাসনের অব্যাহত দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে মিশরের জনতা একটি স্ফূলিঙ্গের অপেক্ষায় ছিলো। আর মোহাম্মদ আলী তাদের জন্য সেই স্ফূলিঙ্গ হয়েই এসেছে।

আল জাজিরা/মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত