ঢাকা, সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ আপডেট : ৪০ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০১৯, ১৭:৪৯

প্রিন্ট

ঐতিহ্যের আহসান মঞ্জিল

বুড়িগঙ্গার তীরে অষ্টাদশ শতাব্দীর ইতিহাস

বুড়িগঙ্গার তীরে অষ্টাদশ শতাব্দীর ইতিহাস
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর ইসলামপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ‘আহসান মঞ্জিল’। এক সময় এটি বাগানবাড়ি থাকলেও এখন সেখানে দর্শনার্থীদের ভিড়।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঢাকার মোগল সূত্রীয় নবাবীর প্রতিনিধি তথা নিমতলীর নায়েবে নাজিম বংশের বিলুপ্তি ঘটলে এখানে মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে শূন্যতা সৃষ্টি হয়। এই শূন্যতা পূরণ করতে সফলভাবে এগিয়ে আসে কুমারটুলীর খাজা পরিবার। পরবর্তী প্রায় শতবর্ষ ধরে তারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে বংশপরম্পরায় নবাব উপাধি ব্যবহারের অধিকার পেয়ে খাজা পরিবার পরবর্তী সময় ঢাকার নবাব পরিবার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে তখনকার জামালপুর পরগনার (বর্তমান ফরিদপুর-বরিশাল) জমিদার শেখ ইনায়েতউল্লাহ রংমহল প্রতিষ্ঠা করেন। তার মৃত্যুর পর জমিদারের ছেলে শেখ মতিউল্লাহ এটি ফরাসি বণিকদের কাছে বিক্রি করেন।

১৮৩৫ সালের দিকে বেগম বাজারে বসবাসকারী নবাব আবদুল গনির বাবা খাজা আলীমুল্লাহ এটা কিনে নিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন।

১৮৭২ সালে নবাব আবদুল গনি নতুন করে নির্মাণ করে তার ছেলে খাজা আহসানউল্লাহর নামে ভবনের নামকরণ করেন ‘আহসান মঞ্জিল’।

আহসান মঞ্জিলের বিবরণ: দোতলা ভবন। বারান্দা ও মেঝে মার্বেল পাথরে তৈরি। প্রতিটি কক্ষের আকৃতি অষ্টকোণ। প্রাসাদের ভেতরের অংশ দু’ভাগে বিভক্ত। পূর্বদিকে বড় খাবার ঘর। উত্তরদিকে লাইব্রেরি। পশ্চিমে জলসাঘর।

ভবনের ছাদ কাঠের তৈরি। নিচতলায় রয়েছে বিলিয়ার্ড খেলার জন্য আলাদা জায়গা। দরবার হলটি সাদা, সবুজ ও হলুদ পাথরের তৈরি। দোতলায় বৈঠকখানা, গ্রন্থাগার আর তিনটি মেহমান কক্ষ। পশ্চিম দিকে আছে নাচঘর আর কয়েকটি আবাসিক কক্ষ।

আহসান মঞ্জিলই ঢাকার প্রথম ইট-পাথরের তৈরি স্থাপত্য। যেখানে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা হয় নবাবদের হাতে। মঞ্জিলের স্থাপত্যশৈলী পশ্চিমাদের সবসময়ই আকৃষ্ট করতো। লর্ড কার্জন ঢাকায় এলে এখানেই থাকতেন।

১৯৯২ সালে বাংলাদেশ সরকার আহসান মনঞ্জিলকে জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়।

আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে এখন পর্যন্ত সংগৃহীত নিদর্শন সংখ্যা ৪ হাজার ৭৭। এই রং মহলের ৩১টি কক্ষের মধ্যে ২৩টিতে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ১৯০৪ সালের আলোকচিত্রশিল্পী ফ্রিৎজকাপের তোলা ছবি অনুযায়ী ৯টি কক্ষ সাজানো হয়েছে।

আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য আছে নবাব আমলের ডাইনিং রুম, নবাবদের ব্যবহৃত বড় বড় আয়না, আলমারি, সিন্দুক, কাচ ও চীনামাটির থালাবাসন, নবাবদের অতি বিশ্বস্ত হাতির মাথার কঙ্কাল গজদন্তসহ নবাব আমলের বিভিন্ন ধরনের অলঙ্কৃত রুপা ও ক্রিস্টালের তৈরি চেয়ার-টেবিল, বিভিন্ন ধরনের তৈলচিত্র, ফুলদানি, আতরদানি, পানদান, নবাবদের ড্রয়িংরুম, নাচঘর, সোনা ও রুপার তারজালি কাজ আহসান মঞ্জিলের মডেল।

আহসান মঞ্জিলে ঢুকতে হলে জনপ্রতি ২০ টাকা করে টিকিট কেটে নিতে হয়। অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জনপ্রতি ৫ টাকা। সার্কভুক্ত নাগরিকদের জন্য প্রতিটি টিকিটের মূল্য ৭৫ টাকা। আহসান মঞ্জিল বন্ধের আধঘণ্টা আগ পর্যন্ত টিকিট পাওয়া যায়।

বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিন জাদুঘর বন্ধ থাকে। গ্রীষ্মকালীন সময়সূচি হলো এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর শনি থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা। শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা।

শীতকালীন সময়সূচি অক্টোবর থেকে মার্চ শনি থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা। শুক্রবার দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা।

জাদুঘরের পরিচিতি:

গ্যালারি-১: এখানে আহসান মঞ্জিলের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, আলোকচিত্র ও চিত্রকর্মের সাহায্যে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও আছে ভবনের একটি মডেল।

গ্যালারি-২: বিভিন্ন সময়ে ভবনের যে বিবর্তণ হয়েছে তা আলোকচিত্রের সাহায্যে প্রদর্শন করা হয়েছে এখানে। এছাড়াও আছে কাটগ্লাস ও ঝাড়বাতির নমুনা।

গ্যালারি-৩: নবাবদের আনুষ্ঠানিক ভোজন কক্ষ। এখানে প্রদর্শিত হয়েছে আলমারি, আয়না, কাচ ও চিনামাটির তৈজসপত্র। সবই আহসান মঞ্জিল থেকে প্রাপ্ত নির্দশন।

গ্যালারি-৪: বড় কাঠের সিঁড়ি। হাতির মাথার কঙ্কাল, ঢাল-তলোয়ার। কাঠের বেড়ার মূল নির্দশন।

গ্যালারি-৫: আসল ঢাল-তলোয়ারের অনুরূপে সাজানো।

গ্যালারি-৬: আহসানুল্লাহ মেমোরিয়াল হাসপাতালের বেশকিছু ব্যবহৃত সরঞ্জমাদি ও খাতাপত্র এই কক্ষে প্রদর্শিত হয়েছে।

গ্যালারি-৭: এই বড় কক্ষটি নবাবদের দরবার হল হিসেবে ব্যবহৃত হত। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠনের সময় শাহবাগের সম্মেলন আসা সর্বভারতীয় মুসলিম নেতাদের তৈলচিত্র এই গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে। এছাড়াও আছে ঢাকার নবাবকে ইতালি থেকে দেওয়া একটি অষ্টকোণ টেবিল।

গ্যালারি-৮: বিলিয়ার্ড কক্ষ, বিলিয়ার্ড টেবিল, লাইট ফিটিংস, সোফা ইত্যাদি তৈরি করে কক্ষটি সাজানো হয়েছে।

গ্যালারি-৯: সিন্দুক কক্ষ। ঢাকার নবাবদের কোষাগার হিসেবে ব্যবহৃত কক্ষটিকে তাঁদের প্রাচুর্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সাজানো হয়েছে।

গ্যালারি-১০: নবাব পরিচিতি। ঢাকার নবাব পরিবারের স্বনামধন্য ব্যক্তিদের পরিচিতি স্থান পেয়েছে এই গ্যালারিতে।

গ্যালারি-১১, ১২ ও ১৩: এই গ্যালারিগুলোতে যথাক্রমে বরেণ্য ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি, স্যার সলিমুল্লাহ স্মরণে এবং নবাবদের সমসাময়িক মনীষীদের প্রতিকৃতি দিয়ে সাজানো হয়েছে।

গ্যালারি-১৪, ১৫, ১৬, ১৭: যথাক্রমে হিন্দুস্থানি কক্ষ, প্রধান সিঁড়িঘর, লাইব্রেরি কক্ষ ও তাসখেলার ঘর।

গ্যালারি-১৮ ও ১৯: ঢাকায় পানীয় জল সরবরাহ বিষয়ক নিদর্শন যেসব আহসান মঞ্জিল ও অ্যাডওয়ার্ডস হাউজে পাওয়া গেছে। ঢাকা ওয়াটার ওয়ার্কের কয়েকটি দুষ্প্রাপ্য ছবি এখানে আছে।

গ্যালারি-২০ ও ২১: ১৯০১ সালের আগে ঢাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ছিল না। নবাবের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা করার তথ্য, তৈজসপত্র ও ফুলদানি সবই নবাবের আমলের।

গ্যালারি-২২: দোতলায় অবস্থিত এই গ্যালারিতে আহসান মঞ্জিলে থেকে পাওয়া অস্ত্র প্রদর্শিত হয়েছে। উঁচু গম্বুজটি এই ঘরের উপরেই অবস্থিত।

গ্যালারি-২৩: এটি ছিল নাচঘর। ১৯০৪ সালে তোলা ছবি অনুযায়ি এটি সাজানো হয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/কেআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত