ঢাকা, সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১১ মাঘ ১৪২৭ আপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১২:৩২

প্রিন্ট

ম্যারাডোনার সেরা পাঁচ গোল

ম্যারাডোনার সেরা পাঁচ গোল
দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা

স্পোর্টস ডেস্ক

‘চোখ-ধাঁধানো’, ‘অসাধারণ’, ‘অত্যাশ্চর্য প্রতিভাবান’, ‘বিতর্কিত’ - বহু ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনাকে। তিনি ছিলেন ফুটবলের এক আইকন, কিন্তু তিনি নিষ্কলংক ছিলেন না। ম্যারাডোনা ছিলেন ফুটবল খেলায় শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবানদের অন্যতম। তার খেলায় যে দক্ষতার প্রদর্শনী, গতি, চমৎকারিত্ব, আর খেলায় কখন কি ঘটতে পারে তা আগে থেকে বুঝে ফেলার ক্ষমতা ছিল - তা ফুটবল ভক্তদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতো।

তিনি ১৯৮৬’র বিশ্বকাপ ফুটবল শিরোপা আর্জেন্টিনার হাতে এনে দিয়েছেন প্রায় একার কৃতিত্বে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলায় ‘ঈশ্বরের হাত’ নামে সেই গোলের জন্য তিনি যেমন নিন্দিত হয়েছিলেন - তেমনি অবিশ্বাস্য নৈপুণ্যে কয়েকজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে, গোলকিপার পিটার শিলটনকে বোকা বানিয়ে তার পরের যে গোলটি করেছিলন ম্যারাডোনা- তা এখনো ‘সর্বকালের সেরা গোল’ বা ‘গোল অব দি সেঞ্চুরি’ বলে মানেন অনেকে।

সাবেক ইংল্যান্ড ম্যানেজার ববি রবসন বলেছিলেন, ‘প্রথম গোলটা ছিল সন্দেহজনক, কিন্তু দ্বিতীয়টা ছিল ঐন্দ্রজালিক।’

অন্যদিকে মাঠের বাইরে মাদকাসক্তি আর নানা রকম ব্যক্তিগত সংকট তাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে পুরো ফুটবল জীবন ধরেই।

ফুটবলের এই জাদুকরের সেরা পাঁচগোল নিয়ে বাংলাদেশ জার্নালের তারকাদের জন্য এই আয়োজন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড লড়াইয়ে ম্যারাডোনার দুই গোল স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। একটি পরিচিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল নামে, ‘অন্যটি গোল অব দা সেঞ্চুরি।’ সেই আসরেই বেলজিয়ামের বিপক্ষে দ্বিতীয় গোল এবং এর আগের বছর নাপোলির হয়ে দুটি গোল জায়গা পেয়েছে এই তালিকায়।

‘হ্যান্ড অব গড’ গোল

১৯৮৬ বিশ্বকাপে, মেক্সিকো সিটিতে ২২ জুনের সেই ম্যাচে গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধে গতিপথ পাল্টে দেন ম্যারাডোনা। অনেকে শুধু হাত দিয়ে গোলের কথাই মনে রেখেছেন। তবে এই গোলেও বাঁ পায়ের জাদু দেখিয়েছিলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। মাঝমাঠে বল পাওয়ার পর বেশ কয়েকজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে এড়িয়ে অনেকটা এগিয়ে হোর্হে ভালদানোকে খুঁজে নিয়ে এগোতে থাকেন তিনি।

ডি-বক্সের মুখে থাকা ভালদানো পাস পান একটু পেছনে। তার সঙ্গে লেগে থাকা স্টিভ হজ পেয়ে যান বলের নাগাল। তিনি বল ক্লিয়ার করার চেষ্টায় ছিলেন, কিন্তু ঠিকমতো শট নিতে পারেননি। বল যায় পেনাল্টি স্পটের কাছে।

৬ ফুট ১ ইঞ্চি লম্বা ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটনের চেয়ে ৮ ইঞ্চি খাটো হলেও ম্যারাডোনাই পান বলের নাগাল। বাঁ হাত বাড়িয়ে হেডের ভঙ্গিমায় খুঁজে নেন জাল। শিলটনসহ ইংলিশ খেলোয়াড়রা হ্যান্ডবলের দাবি জানাতে থাকলেও এতে সাড়া দেননি রেফারি আলি বিন নাসের। তিনি বুঝতেই পারেননি, ম্যারাডোনা মাথার জায়গায় হাত দিয়ে গোল করেছেন।

পরে ম্যারাডোনা জানান, রেফারি যেন কিছু সন্দেহ না করে, এ জন্য সতীর্থদের তাকে জড়িয়ে ধরতে বলেছিলেন।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা আর কিছুটা ঈশ্বরের হাতের সহায়তায় এসেছে এই গোল। সেই থেকে এই গোল ফুটবলের গল্প-গাঁথায় পরিচিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল নামে।

দা গোল অব দা সেঞ্চুরি

আগের গোল নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, পরের গোলটি যেন নিখাদ ফুটবলীয় জাদু। এতো বছর পরেও সেই গোল মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। প্রায়ই বলা হয়ে থাকে, চার মিনিট পরের সেই গোল ইতিহাসের সেরা একক গোল।

গোলটি নিয়ে চর্চা হয় এখনও। মিডফিল্ডার এক্তর এনরিকে নিজেদের অর্ধে পাস দিয়েছিলেন ম্যারাডোনাকে। ১০ সেকেন্ড স্থায়ী, ৬০ গজের জাদুকরী এক দৌড়ের গল্প। পিটার বেয়ার্ডসলে, টেরি বুচার (দুইবার), পিটার রিড, টেরি ফেনউইককে পেরিয়ে যান তিনি। ছুটে এসেছিলেন গোলরক্ষক, তাকেও কাটিয়ে ফাঁকা জালে বল পাঠান ম্যারাডোনা, ২-০ গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। শেষ পর্যন্ত ২-১ এ জিতে তারা যায় সেমি-ফাইনালে।

পরে এই গোল নিয়ে ম্যারাডোনা জানান, তিনি আসলে ভালদানোকে পাস দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে ঘিরে রেখেছিল ইংলিশ ফুটবলাররা। একটু জায়গার সন্ধানে পায়ের কারিকুরি উৎস সেই গোলের।

একের পর এক বাধা আসায় স্বভাবসুলভভাবে সব পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেই বল পাঠান ঠিকানায়।

ভালদানোর ধারণা, গতি আর ড্রিবলিংয়ের মিশেলে করা দুর্দান্ত এই গোলে ১০ সেকেন্ড ১০ স্পর্শে শতবার নিজের ভাবনা পাল্টেছেন ম্যারাডোনা। আর এভাবেই শেষ পর্যন্ত নিজেই খুঁজে নিয়েছেন জাল।

ইউভেন্তুসের বিপক্ষে দুর্দান্ত ফ্রি-কিক

১৯৮৫ সালে ঘরের মাঠে ইউভেন্তুসের বিপক্ষে ফ্রি কিকে দুর্দান্ত এক গোলে নাপোলিবাসীর হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা পেয়ে যান ম্যারাডোনা। সেই সময়ের ইউরোপ চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে নাপোলিকে জয় এনে দিয়েছিলেন তিনি।

মিশেল প্লাতিনির দলের বিপক্ষে ডি-বক্সের ভেতরে একটি ইন ডাইরেক্ট ফ্রি কিক পায় নাপোলি। বলা হয়ে থাকে ইউভেন্তুসের খেলোয়াড়দের গড়া দেওয়াল খুব কাছে থাকলেও সতীর্থ মিডফিল্ডার এরালদো পেস্সিকে বল তার দিকে গড়িয়ে দিতে বলেছিলেন ম্যারাডোনা।

তা-ই করেন পেস্সি। বাকিটুকু যেন ইতিহাস। ওই টুকু জায়গার মধ্যে ইউভেন্তুসের খেলোয়াড়দের মাথার উপর দিয়ে বল জালে পাঠান ম্যারাডোনা। স্রেফ এক পা এগিয়ে এতো নিখুঁত এবং গতিময় শট! কিছুই করার ছিল না গোলরক্ষকের।

সেমি-ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে দ্বিতীয় গোল

বিশ্বকাপের ওই আসরেই কোয়ার্টার-ফাইনালের মতো সেমি-ফাইনালেও আর্জেন্টিনার জয়ের নায়ক ম্যারাডোনা। বেলজিয়ামের বিপক্ষেও তিনি করেছিলেন জোড়া গোল।

৫১তম মিনিটে দলকে এগিয়ে নেওয়ার পর ৬৩তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন তিনি। এই গোল নিয়েও চর্চা কম হয়নি। ছয় সেকেন্ডে ছয়টি স্পর্শ, একটি ছিল তার দুর্বল ডান পায়ের। সপ্তম স্পর্শটি ভেঙে দেয় বেলজিয়ামের বিশ্‌কাপ স্বপ্ন।

ডিফেন্ডার হোসে লুইস কুসিইউফুর কাছ থেকে ম্যারাডোনা বল পাওয়ার সময় তার সামনে ছিলেন তিন বেলজিয়ান ডিফেন্ডার। পায়ের কারিকুরিতে অনায়াসে তাদেরে এড়িয়ে যান তিনি।

বিপদ দেখে এগিয়ে আসেন একটু পিছিয়ে থাকা বেলজিয়াম অধিনায়ক এরিক গেরেটস। অমন গতির সঙ্গে হুট করে ম্যারাডোনা দিক পাল্টানোয় পেরে ওঠেননি তিনিও। বাঁ দিকে এগিয়ে গিয়ে বাম পায়ের শটে জাল খুঁজে নেন ম্যারাডোনা। তার আরেকটি চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্সে ফাইনালে পৌঁছে যায় আর্জেন্টিনা।

ভেরোনার বিপক্ষে দূরপাল্লার শটে গোল

ম্যারাডোনার শটের গতি আর নিখুঁত লক্ষ্যের আরেকটি প্রামাণ্য এই গোল। জালের দেখা পেতে সব সময় জমাট রক্ষণ ভাঙতে হয়নি তাকে। পেরিয়ে যেতে হয়নি ডিফেন্ডারদের। ডি-বক্সের বাইরে থেকেও খুঁজে নিয়েছেন ঠিকানা।

১৯৮৫ সালে ভেরোনার বিপক্ষে নাপোলির এই প্লে মেকারের প্রথম স্পর্শটা ছিল দুর্দান্ত। উঁচু করে নিজেদের অর্ধ থেকে বাড়ানো বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ঘুরে দারুণ ভলিতে পাঠান জালে। খুব একটা এগিয়ে ছিলেন না গোলরক্ষক; কিন্তু কাছের বার ঘেঁষে যাওয়া বল ঠেকানোর চেষ্টাও করতে পারেননি তিনি।

বাংলাদেশ জার্নাল/এইচকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত