কোর্তোয়ার গ্লাভসে চড়ে ১৪তম মহাকাব্যের গল্প লিখলো রিয়াল

প্রকাশ : ২৯ মে ২০২২, ০৩:৩৯ | অনলাইন সংস্করণ

  স্পোর্টস ডেস্ক

অতিমানব হয়ে উঠলেন কোর্তোয়া। লিভারপুলের সব আক্রমণ যেন এই কোর্তোয়া নামক দেয়ালে গিয়েই আটকে গেলো বারবার। তাই তো পুরো ম্যাচজুড়ে আক্রমণের পসরা সাজিয়ে বসেও চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালের মহারণ শেষে ১-০ গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ ইয়ুর্গেন ক্লপের শিষ্যদের।

আর ইউরোপ সেরার মঞ্চে কোর্তোয়ার দেয়াল হয়ে ওঠার সাথে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের গোলে নিজেদের ১৪তম চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের মহাকাব্যটাও লিখে ফেললো রিয়াল মাদ্রিদ। সেমিফাইনাল থেকেই যেই রিয়ালের বিদায় দেখে ফেলেছিলো অনেকে, সেই দলই ফাইনালে তো উঠলোই উঠে শিরোপাটাও নিজেদের করে নিলো।

রিয়ালের এই শিরোপা জয়ের রেকর্ড পাতায় হয়তো সবার আগে লেখা থাকবে একমাত্র গোলদাতা ভিনিসিয়াসের নাম। তবে আজ রিয়ালের ১৪তম চ্যাম্পিয়নস লিগে শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার অবশ্যই থিবো কোর্তোয়া। কোর্তোয়ার গ্লাভস যেন আজ হয়ে উঠেছিলো সালাহ-মানেদের সব আক্রমণের হন্তারক। শুধু গ্লাভসই নয়, হাত-পা-বুক-মাথা বা শরীরের এমন কোন অংশ নেই হয়তো যেখান দিয়ে গোল ঠেকাননি থিবো কোর্তোয়া। 

ম্যাচের আগে প্রতিশোধের রব তোলা সালাহ যেন আসলেও মাঠে নেমেছিলেন সেটিকে সার্থক করতেই। তবে তার সামনেও বাধা ওই কোর্তোয়া। সালাহর বিধ্বংসী সব আক্রমণ, সাদিও মানের বুলেট গতির শট, অলরেডদের  একের পর এক প্রচেষ্টা এসে ব্যর্থ হলো রিয়াল মাদ্রিদের গোলপোস্টের সামনে।

ম্যাচের আগে কোর্তোয়া বলেছিলেন, ‘রিয়াল মাদ্রিদ যখন ফাইনালে খেলে, রিয়াল মাদ্রিদই জেতে।’ তখন তার কথাটাকে দম্ভই মনে হলেও এমন অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পর মনে হয়, কোর্তোয়াকে এমন দম্ভ করতেও বেশ মানায়।

ম্যাচের শুরু থেকেই একের পর এক আক্রমণের ডালি সাজিয়ে বসেছিলো লিভারপুল। তবে অতিমানব হয়ে ওঠা কোর্তোয়ার কল্যাণে সেই আক্রমণে ভেসে না গিয়ে নিজেদের ম্যাচে টিকিয়ে রাখলো মাদ্রিদ। লিভারপুলের আক্রমণের বিপরীতেই প্রথমার্ধ্বের একেবারে শেষে এসে করিম বেনজেমা অবশ্য একটি গোল করে বসে। তবে অফসাইডের ফাঁদে পড়ে বাতিল হয় সেই গোল।

দ্বিতীয়ার্ধ্বেও চিত্রটা বদলায়নি। লিভারপুল আক্রমণ করেই যাচ্ছে, কোর্তোয়া সেগুলো ঠেকিয়েই যাচ্ছে। এই ধারার বিপরীতেই আচমকা এক প্রতি-আক্রমণ থেকে শিরোপা জয়ের ব্যবধানটা গড়ে দেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র।

প্যারিসের স্তাদে দ্য ফ্রান্সে নির্ধারিত সময় থেকে দুই দফা পিছিয়ে বাংলাদেশ সময় শনিবার দিবাগত রাত ১ টা ৩৬ মিনিটে শুরু হওয়া খেলার প্রথমার্ধ্ব শেষে দুই দলই বিরতিতে গেছে ০-০ গোলের সমতা নিয়ে। তবে ম্যাচের শুরু থেকেই কেউ যেন কাউরে ছেড়ে কথা বলার পাত্র নয়। একেবারে শুরু থেকেই রিয়াল মাদ্রিদের রক্ষণভাগে ত্রাস ছড়াতে শুরু করে লিভারপুল। রিয়াল কি কম যাবে নাকি? সময়য় গড়ানোর সাথে সাথে লিভারপুলের সাথে সমানে সমানে টক্কর দিতে শুর করে তারাও।

ম্যাচের প্রথম বড় সুযোগটি আসে ২০১৮’র ফাইনালের প্রতিশোধের সুর তোলা মোহাম্মদ সালাহর পা থেকে। ম্যাচের আমত্র ১৬ মিনিটে ছয় গজ বক্সে জটলার মধ্যে থেকে শট নেন মিশরীয় রাজা। পুরোপুরি পারফেক্ট না হলেও লক্ষ্যেই ছিল সালাহর শট। শেষ মুহুর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই শট আটকে দেন মাদ্রিদ গোলরক্ষক থিবো কর্তোয়া। এরপর পরপর দু মিনিটে দুটি সুযোগ পান থিয়াগো আর সালাহ। তবে দুজনই শট নেন কোর্তোয়ার বরাবরই।

২১ মিনিটে এসে প্রথমার্ধ্বের সবচেয়ে বড় সুযোগ পায় লিভারপুল। তবে ভাগ্যের বিড়ম্বনায় এ যাত্রা বেঁচে যায় রিয়াল মাদ্রিদ। সাদিও মানের জোরাল নিচু শটে ঝাঁপিয়ে পড়ে কোনোমতে হাত ছোঁয়ান কোর্তোয়া। তবে সেই বলও চলে যেত জালে, যদি না গোলপোস্টে বাধা পেতো।

আস্তে আস্তে আক্রমণ শুরু করে রিয়াল মাদ্রিদও। তবে তাদের সবচেয়ে বড় সু্যোগটি আসে প্রথমার্ধ্বের একেবারে শেষে এসে। জটলা থেকে বল পেয়ে করিম বেনজেমা বল জালেও জড়ান। তবে এবার ভাগ্যদেবী লিভারপুলের পক্ষে। অফসাইডের ফাঁদে পড়ে বাতিল হয় সেই গোল। গোলশূন্য সমতা নিয়েই প্রথমার্ধ্বের বিরতিতে যায় দুই দল।

 বিরতি থেকে ফিরে লিভারপুলের আক্রমণের ধারা অব্যাহতই থাকলো। অলরেডদের আক্রমণের পালের হাওয়া থামাতে কোর্তোয়ার সাথে যোগ দেয় রিয়ালের রক্ষণভাগও। তবে প্রথমার্ধ্বের শেষমুহুর্তে অফসাইডে বাতিল হওয়া বেনজেমার গোলটি হয়তো লিভারপুলকে রক্ষণভাগকে সতর্ক করার হজন্য যথেষ্ট ছিলো না। 

ম্যাচের ৫৯ মিনিটে প্রতি আক্রমণ থেকে ভিনিসিয়াসের গোলের সময় লিভারপুলের রক্ষণকে যেন খুঁজেই পাওয়া যায়নি। ডান পাশ দিয়ে বল নিয়ে আক্রমণে উঠে এসে ফেদে ভালভার্দে রক্ষণ আর গোলরক্ষকের মাঝে দিয়ে পাস বাড়ান দূরের পোস্টে ফাঁকা থাকা ভিনিসিয়াসকে। তাকে আটকানোর জন্য লিভারপুলের কেউই ছিলো না সেখানে। নিজের পায়ে পাওয়া এই সুবর্ণ সুযোগ আর নষ্ট করেননি ভিনিসিয়াস। শেষমেশ তার করা ওই গোলেই রেকর্ড ১৪ তম চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জিতলো রিয়াল মাদ্রিদ। 

গোলের পর লিভারপুল যেন আরও তেড়েফুঁড়ে উঠলো। তবে সালাহ-মানেদের সব আক্রমণের সমাপ্তি ওই কোর্তোয়া নামক দেয়ালে এসেই। পুরো ম্যাচজুড়ে সালাহ একাই শট নিয়েছেন ৫টি, যার সবকটির সামন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন কোর্তোয়া।  

এক পর্যায়ে নিজেদের লিড ধরে রাখতে রক্ষণভাগে বেশি মনোযোগ দেয় রিয়াল। এমনকি রিয়ালের আক্রমণভাগের শেষ নাম বেনজেমাও শেষের দিকে এসে নিচে নেমে  রক্ষণ সামলানোর কাজ করেছেন। তাদের চেষ্টা আর বৃথা যায়নি। প্যারিস থেকে অর্ধলক্ষাধিক লিভারপুল ভক্তকে কাঁদিয়ে শিরোপা নিয়েই মাদ্রিদে ফিরতে পারছে রিয়াল। 

মাদ্রিদের দলটির হয়ে  ২০১৪ সালের পর আনচেলত্তির এটি দ্বিতীয় চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়। এদিকে রিয়াল তাদের বর্তমান অধিনায়ক মার্সেলোকে বিদায়টাও জানালো রাজসিক ভঙ্গিতেই। 

বাংলাদেশ জার্নাল/এসএস