ঢাকা, রোববার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ১৩:০৯

প্রিন্ট

মশলা রানি: ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়

মশলা রানি: ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়
অনলাইন ডেস্ক

উপমহাদেশের ইতিহাসে ঝাঁসির রানি, গায়েত্রী দেবী, রাজিয়া সুলতানার মতো সাহসী নারীদের নাম শোনা যায়। যাদের সৌর্য বীর্য আর দেশ শাসনের ক্ষমতা কোনো পুরুষ শাসকের চেয়ে কম নয়। ভারতে আরো একজন নারী শাসক রয়েছেন যার সময়ে ব্যবসা বাণিজ্য বিশেস করে মশলা বাণিজ্যের খুব উন্নতি হয়েছিল। যে কারণে তিনি ‘মশলা রানি’ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।

১৫৫২ সালে ভারতের দক্ষিণে মাথা তুলে দাঁড়ায় সালুভা সাম্রাজ্য। অনেকেই জানেন না, প্রায় ৫৪ বছর ধরে এই সাম্রাজ্যের রাশ শক্ত হাতে ধরে রেখেছিলেন এক রানি। ভারতের ইতিহাসে এত বছর ধরে সাম্রাজ্য শাসন করা তিনিই একমাত্র মহিলা। রানি চেন্নাভইরাদেবী। গোয়া থেকে, উত্তর কন্নড়, দক্ষিণ কন্নড়, মালাবার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তার সাম্রাজ্য। সালুভা সাম্রাজ্য। যার রাজধানী ছিল গেরুসোপ্পা।

সালুভা সাম্রাজ্যের উত্থানের কয়েক বছর আগে (১৪৯৮ সালে) ভারতের দক্ষিণের মালাবার উপকূলের কালিকটে পৌঁছেছিলেন পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দ্য গামা। তিনিই প্রথম ইউরোপ থেকে জলপথে ভারতে আসার রাস্তা আবিষ্কার করেছিলেন। তারও কয়েক বছর পরে ১৫০৩ সালে ভারতের কোচিতে প্রথম দুর্গ স্থাপন করেন পর্তুগিজরা। শুরু হয় ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য। ইউরোপ এবং ভারতের মধ্যে ব্যবসার খাতিরে যাতায়াত শুরু হয় পর্তুগিজদের। তখন গোয়া প্রায় দলখ করে নিয়েছিল পর্তুগিজ বণিকরা। তখন তাদের আগ্রাসন থেকে যিনি গোয়াকে রক্ষা করেছিলেন তিনি আর কেউ নন, এই মশলা রানি।

তার আসল নাম রানি চেন্নাভইরাদেবী। গোয়া থেকে, উত্তর কন্নড়, দক্ষিণ কন্নড়, মালাবার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাঁর সাম্রাজ্য। সালুভা সাম্রাজ্য। যার রাজধানী ছিল গেরুসোপ্পা। তার রাজত্বকাল ছিল প্রজাদের কাছে সুখের সময়। তার উদারতার ছোঁয়া সকল প্রজাদের কাছেই পৌঁছাত সমানভাবে। পাশাপাশি তার রাজত্বকালে সালুভায় ব্যবসার প্রসারও ঘটেছিল অনেক।

সে সময় পর্তুগিজদের অনেকেই ওই অঞ্চলের ব্যবসা করতে এবং বন্দরগুলোর দখল করতে চেয়েছিল। পর্তুগিজদের সেই আগ্রাসনকে তিনি প্রতিহত করেছিলেন একাই। বহুদিন ধরে প্রতিহত করে রেখেছিলেন পার্শ্ববর্তী কেলাড়ি এবং বিলগি রাজাদের আগ্রাসনকেও। তার নামাঙ্কিত তামার মুদ্রার প্রচলন ছিল সে সময়। তার সুশাসনের কারণে ফুলে ফেঁপে উঠেছিল সালুভা সাম্রাজ্য। দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ব্যবসা এবং পর্যটনের সূত্রে এখানে আসতেন। তার সাম্রাজ্যের হন্নাবর, ভাতকালা অঞ্চলগুলো দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বাজারে পরিণত হয়েছিল। ইউরোপ থেকে ব্যবসার উদ্দেশে এই অঞ্চলগুলোতে বাণিজ্য শুরু হয়।

রানি চেন্নাভইরাদেবীর রাজত্বকালে এই অঞ্চলগুলোতে কালো মরিচ, সুপারি, জায়ফল এই মশলাগুলোর ব্যবসা প্রসার লাভ করে। সে কারণেই পর্তুগিজরা তার নাম দিয়েছিলেন পেপার কুইন বা ‘মশলা রানি’।

তিনি জৈন ধর্মাবলম্বী ছিলেন। ১৫৬২ সালে তিনি কারকালায় শিখ মন্দির চতুর্মুখ বসারি নির্মাণ করেন। এ ছাড়াও তিনি বহু মন্দিরও নির্মাণ করেছিলেন।

কর্নাটকের উত্তর কন্নড় জেলায় তিনি মিরজান দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। সেই দুর্গ আজও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র। এই দুর্গে তিনি জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েও ছিলেন।

তার পার্শ্ববর্তী কেলাড়ি এবং বিলগি রাজারা বহুদিন থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন এই গেরুসোপ্পার দখল নেওয়ার। অবশেষে দুই রাজা মিলিত ভাবে ১৬০৬ সালে রানি চেন্নাভইরাদেবীকে পরাজিত করেন। এরপর গেরুসোপ্পা কেলাড়ি রাজত্বের অংশ হয়ে ওঠে। রানিকে বন্দি করে রাখা হয়। বন্দি অবস্থাতেই তিনি মারা যান।

তবে তাকে পরাজিত করলেও মশলা রানির সুশাসনের খ্যাতিকে ম্লান করতে পারেননি ওই রাজারা। রাজত্বকালে বহু উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়েছিলেন নিজের এলাকায়। আজও ওই এলাকায় রানি চেন্নাভইরাদেবী উদারতার প্রতীক হিসাবে পরিচিত।

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত