ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৪ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭ আপডেট : ২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২১, ১৫:২৯

প্রিন্ট

ধামরাইয়ে অবৈধভাবে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির হিড়িক

ধামরাইয়ে অবৈধভাবে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির হিড়িক
ছবি- প্রতিনিধি

রুহুল আমিন, ধামরাই প্রতিনিধি

ঢাকার ধামরাই উপজেলার বাস্তা এলাকায় অবৈধ চুল্লি তৈরি করে অবাধে কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে কয়লা। বিভিন্ন গ্রাম ও ধামরাইয়ের বাইরে থেকে গাছ কেটে এনে এই চুল্লিতে কাঠ সরবরাহ করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বাস্তা গ্রামে নদীর পাড় ঘেঁষে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে ১২টি কয়লা তৈরির বিশেষ চুলা। দিন-রাত এই চুলায় আগুন দেয়া থাকে।

চুলাগুলো রাস্তার পাশে হওয়ায় পথচারীদের চলাচলে অনেক কষ্ট হয়। কারণ একদিকে বনজ সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে, অপরদিকে সৃষ্ট ধোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে শ্বাসকষ্ট জনিত নানা ব্যাধি। পরিবেশ ও জীববৈচিত্রেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

জানা যায়, উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বাস্তা গ্রামের মোশাররফ, শাহিন ও নাহিদ মিয়া মোট ১২টি কয়লা তৈরির চুলা নিয়ন্ত্রণ করেন। মোশাররফ ও শাহিন একত্রে ৫টি চুলা এবং নাহিদ একাই ৬টি কয়লা তৈরির চুলা নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা সকলেই স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি।

স্থানীয়রা জানায়, কারো কোনো কথার তোয়াক্কা তারা করেন না তারা। রাস্তার পাশে কয়লা তৈরির কারখানা স্থাপন করে সারাদিন খোলা জায়গায় কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করছে। তারা প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে।

ধামরাইয়ে গাছ কাঠ পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে কয়লা

অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব কয়লা কারখানায় দেদারছে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদন। অনুমোদন ছাড়াই এসব কয়লা তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। শত বিধিনিষেধ থাকার পরও জনবসতি এলাকায় ও ফসলি জমি নষ্ট করে এসব কারখানা স্থাপন করা হয়েছে।

পথচারীরা জানান, মাটি, ইট ও কাঠের গুঁড়া মিশিয়ে তৈরি করা চুল্লিতে প্রতিদিন শত শত মণ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে ধোঁয়া। রাস্তার পাশ দিয়ে চলাচল করার সময় চোখ জ্বলতে জ্বলতে পানি চলে আসে।

কয়লা শ্রমিকরা অনেক চালাক। ভোর বেলাতেই চুল্লিতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে তারা দূরে কোথাও বা পাশে লেবু বাগানের ভেতর লুকিয়ে থাকে। এতে চোখ জ্বালাপোড়ার কোন সুযোগ নেই।

দেখা যায়, চুল্লির মধ্যে সারিবদ্ধভাবে কাঠ সাজিয়ে একটি মুখ খোলা রেখে অন্য মুখগুলো মাটি এবং ইট দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়। খোলা মুখ দিয়ে আগুন দেয়া হয় চুল্লিতে। আগুন দেয়া শেষ হলে সেটিও বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রায ৭ থেকে ১০ দিন পোড়ানোর পর চুলা থেকে কয়লা বের করা হয়। প্রতিটি চুল্লিতে প্রতিবার ২৫০ বা ৩০০ মণ কাঠ পোড়ানো হয়। পরে এই কয়লা শীতল করে ব্যবসার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

কয়লা ব্যবসায়ী মোশাররফ ও শাহিনের সঙ্গে অনেক চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে নাহিদ মিয়া বলেন, কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি অবৈধ হলেও কিছু করার নেই। তারা নিজেদের জমির ওপর ব্যবসা করে যাচ্ছে।

এই ব্যবসা অবৈধ কী না- জিজ্ঞেস করলে নাহিদ মিয়া বলেন, ব্যবসা তো ব্যবসা। আবার অবৈধ কিসের। আমাদের জায়গায় ব্যবসা করি।

পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বাড়ছে নানা রোগ

তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একটি চুল্লিতে এক সপ্তাহে কমপক্ষে প্রায় ৪ শত মণ কাঠ পোড়ানো হয়। প্রতি বস্তা কয়লার দাম প্রায় ৪শ' টাকা। হাজার হাজার টন কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। তারা না ভাবছে পরিবেশের কথা, না জনস্বাস্থ্যের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগীরা জানান, কয়লা তৈরির চুল্লির কালো ধোঁয়ায় শিশুসহ এলাকার মানুষের মধ্যে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিচ্ছে। দূষিত হচ্ছে এলাকার পরিবেশ। নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি। সেইসঙ্গে জীববৈচিত্রও হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত।

বিভিন্ন গাছপালায় মড়ক দেখা দিয়েছে। গাছের ফল-মুকুল নষ্ট হয়ে যায়। নিয়মিত এভাবে চলতে থাকলে নানা প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগবালাই বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন সচেতন এলাকাবাসী।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এ বিষয়ে প্রসাশন অবগত। তারা কোনো ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার নূর রিফফাত আরা বলেন, কয়লা তৈরিতে কাঁচা কাঠ পোড়ানোয় কার্বন ও সিসা নির্গত হয়। যে এলাকায় এসব চুলায় কাঠ পুড়িয়ে ধোঁয়ার সৃষ্টি করা হচ্ছে, সেখানে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। ফলে শিশুসহ বয়স্করাও ফুসফুসের সমস্যা, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ ও এলার্জির সমস্যার সম্মুখীন হবে।

কলেজ পড়ুয়া রায়হান বলেন, চুল্লির ধোঁয়ায় চোখ জ্বালাপোড়া করে, খুশখুশে কাশি হয়। সারাদিন প্রচণ্ড গন্ধে রাস্তা দিয়ে চলাচল করা যায় না।

আলতাফ হোসেন নামে এক স্কুলশিক্ষক বলেন, এসব কয়লা কারখানার জন্য রাস্তা দিয়ে চলাচল করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। সারাদিন ধোঁয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। কেউ বলতে সাহস পায় না।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সামিউল হক বলেন, কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য আমার কাছে ছিল না। তবে সরকারি অনুমোদন ছাড়া কয়লার কারখানা স্থাপন করা যাবে না। তদন্ত সাপেক্ষে অবৈধ কয়লার কারখানা বন্ধসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রসঙ্গত, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সামিউল হক বেশ কিছুদিন আগে বাইশাকান্দা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ফারুক হোসেনের কয়লা কারখানা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন এবং জরিমানা করা হয়।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত