ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ আপডেট : ৩ মিনিট আগে

সার নিয়ে সিন্ডিকেট, বিপাকে আলুচাষিরা

  সাগর কুমার, জয়পুরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২১, ১৫:৫৫

সার নিয়ে সিন্ডিকেট, বিপাকে আলুচাষিরা
ছবি: প্রতিনিধি
সাগর কুমার, জয়পুরহাট প্রতিনিধি

জয়পুরহাটে আলু চাষ করতে গিয়ে এবারও বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, অতিলোভী সার ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে দিনের পর দিন ঘুরেও টিএসপি সার পাচ্ছেন না অনেক কৃষক। আবার পেলেও গুণতে হচ্ছে সরকারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা। গত বছর এমনই সিন্ডিকেটের কারণে জেলার বেশ কয়েকটি ডিলার ও সাব-ডিলারকে জরিমানাও করেছিল প্রশাসন। তবে এবার প্রশাসনের তেমন নজরদারি চোখে পড়েনি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আলু চাষের বিখ্যাত জেলা জয়পুরহাটে গত বছর আলুর চাষ করে ব্যাপক লাভবান হয়েছিলেন কৃষকরা। তবে মাস দেড়েক আগে আলুর দাম কিছুটা কমে যায়। পরে আমন কেটে আলুর চাষ শুরু হলে আবারও আলুর বাজার বেড়ে যায়। ফলে এবারও লাভের আশায় ব্যাপক আলু চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা।

এ আলু চাষে সবচেয়ে বেশি চাহিদা টিএসপি সারের। কৃষকরা বলছেন, ডিলারদের কাছে দিনের পর দিন ধর্না দিয়েও মিলছে না সেই সার। আবার সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দিলেই মিলছে কাঙ্খিত টিএসপি সার।

এসব কৃষকদের দেয়া হচ্ছে না কোনো মেমো। আবার কাউকে মেমো দেয়া হলেও ২-৩শ' টাকা বস্তাপ্রতি বেশি নিয়ে লেখা হচ্ছে সরকার নির্ধারিত রেট। ১১শ' টাকার টিএসপি সার তারা কৃষকদের কাছ থেকে নিচ্ছে ১৩ থেকে ১৫শ' টাকা পর্যন্ত। তাই বিঘাপ্রতি ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা বেশি খরচ হচ্ছে বলে জানান কৃষকেরা।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, কিছু ব্যবসায়ী সার গোডাউনে না রেখে অন্য কারও বাড়িতে বা গুপ্ত কোনো স্থানে লুকিয়ে রাখছে। কেউবা গোডাউনে রেখেই কৃত্তিম সঙ্কট দেখিয়ে বলছে, সার নেই। নিরুপায় হয়ে যারা বেশি টাকা দিচ্ছে, তাদেরই মিলছে এসব সার।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় এবার ৪০ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হচ্ছে। গত বছর জেলায় ৪০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছিল।

সদর উপজেলার চৌমূহনী বাজারের হামিদুল ইসলাম নামে এক কৃষক ডিলারের নাম না জানা শর্তে বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিলে তারা আমাকে সারই (টিএসপি) দেবে না। ১১শ' টাকার বস্তার সার ১৫শ' টাকা দিলে পাওয়া যাচ্ছে।

কেন্দুলী এলাকার বেলাল হোসেন বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ৪ বিঘা জমিতে এবার আলুর চাষ করছি। শ্রমিকদের খরচও এবার অনেক বেশি। বিঘাপ্রতি ২৫ হাজার টাকার মত খরচ হচ্ছে এবার। সব থেকে বড় সমস্যা সার (টিএসপি) পাচ্ছি না।

একই গ্রামের রেজুয়ান নামে এক কৃষক বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, আমার টিএসপি লাগবে ১০ বস্তা, কিন্তু আমি পেয়েছি ৬ বস্তা। ডিলাররা বলছে সার নেই। এখন বাকি সার আমি এখন কোথায় পাবো। বিঘাপ্রতি খরচও ৩-৪ হাজার টাকা বেশি পড়ছে। এতো টাকা খরচ করে শেষে যদি আমরা আলুর ন্যায্য দাম নাই পাই, তাহলে তো পথে বসতে হবে।

এদিকে ডিলাররা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, প্রথমে যা বরাদ্দ ছিল তা কৃষকদের চাহিদা বেশি থাকায় শেষ হয়ে গিয়েছে। তাই কিছুটা সঙ্কট দেখা দিয়েছে। নতুন বরাদ্দ পেলে আর সঙ্কট থাকবে না। দাম বেশি নেয়া হচ্ছে না বলেও দাবি তাদের।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সাব-ডিলার বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, প্রথমে যা বরাদ্দ ছিল চাহিদা বেশি থাকায় তা শেষ হয়েছে। প্রথম বরাদ্দের সেসব সার আমরা সরকার নির্ধারিত মূল্যেই বিক্রি করেছি। কিন্তু এখন কৃষকদের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে টিএসপি সার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আবারও বরাদ্দ আসলে কৃষকরা পর্যাপ্ত সার পাবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক বাবুল কুমার সূত্রধর বাংলাদেশ জার্নালকে জানান, ইতিমধ্যে জেলার প্রায় ৫০ ভাগ জমিতে আলু চাষ শেষ হয়েছে। জেলায় চলতি মাসে ইউরিয়া ৫ হাজার ৪২২, টিএসপি ২ হাজার ৭১, এমওপি ৪ হাজার ৬২০ এবং ডিএপি সার ৪ হাজার ৬০৩ মেট্রিক টন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া গত মাসেরও বরাদ্দ রয়েছে। বিসিআইসির ৫৮ জন, বিএডিসির ১১১ জন ও কার্ডধারী ৩২৩ জন সার ব্যবসায়ীর মাধ্যমে কৃষকরা সরকার নির্ধারিত মূল্যে এসব সার কিনতে পারছেন। কৃষি উপকরণ কৃষকরা যাতে নায্যমূল্যে কিনতে পারেন সেজন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মনিটরিং করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ৫শ' মেট্রিক টন টিএসপি বরাদ্দ এসেছে। নতুন করে আবারও সার বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অতিরিক্ত বরাদ্দ আসলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. শরীফুল ইসলাম বাংলাদেশ জার্নালকে জানান, নতুন করে আরও ৫শ' মেট্রিক টন টিএসপি সার সরবরাহ করা হয়েছে। অতিরিক্ত আরও বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। আশা করি দ্রুত বরাদ্দ আসবে। এতে করে কৃষকদের আর কোনো সারের সঙ্কট থাকবে না।

টিএসপি সারের দাম বেশি নেয়া হচ্ছে কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি জানান, আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত চলমান রয়েছে। কেউ যদি বেশি দামে সার বিক্রি করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত