ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬ আপডেট : ১৭ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৯, ১০:৪৪

প্রিন্ট

‘আপনার মেয়ে খারাপ, জিন টেনে নিয়ে যাচ্ছে’

‘আপনার মেয়ে খারাপ, জিন টেনে নিয়ে যাচ্ছে’
সিদ্ধিরগঞ্জ প্রতিনিধি

সিদ্ধিরগঞ্জে জিন তাড়ানোর কথা বলে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতনে হত্যার অভিযোগ উঠেছে কবিরাজ দম্পতির বিরুদ্ধে। বুধবার (১৯ জুন) দিবাগত রাতে কবিরাজের নির্যাতনে গৃহবধূর মৃত্যু হয়।

নিহত শাহনাজ আক্তার শিখা (২৫) ঢাকার সাদ্দাম মার্কেট এলাকার শাহ আলমের মেয়ে। তার স্বামী বিদেশ থাকে। এ ঘটনার কবিরাজ ফারুক হোসেন ও তার স্ত্রী জেসমিনকে আটক করেছে পুলিশ। ফারুক মিজমিজি চৌধুরীপাড়া বিল্লাল সাহেবের বাড়ির ভাড়াটিয়া ও আব্দুল মতিনের ছেলে।

শিখার অস্বাভাবিক আচরণের চিকিৎসায় এক কবিরাজ দম্পতির শরণাপন্ন হন মা সুরাইয়া বেগম। চিকিৎসার নামে মায়ের সামনেই মেয়ের ওপর তারা শুরু করে শারীরিক নির্যাতন। শিখার প্রচণ্ড আর্তচিৎকারেও থামেনি তাদের নির্যাতন।

মেয়ের কষ্ট দেখে শিখার মা প্রতিবাদ করলে কবিরাজ দম্পতি বলে, আমরা তো আপনার মেয়েকে মারছি না। মারছি তার সাথে থাকা খারাপ জিনকে। আর চিৎকার তো সে করছে না, কাঁদছে ওর সাথে থাকা খারাপ জিন। আপনার সহ্য না হলে পাশের ঘরে গিয়ে বসে থাকেন।

এক পর্যায়ের কবিরাজ ফারুক ও তার স্ত্রী জেসমিন শিখার হাত-পা বেঁধে ফেলে। পরে বুকের ওপর উঠে আঘাত করতে থাকে। মুখে কাপড় ঢুকিয়ে গলা চেপে ধরে রাখে। এভাবে চলে দুদিন। বুধবার দুপুরে শিখার মা মেয়েকে কবিরাজের বাড়ি রেখে নিজ বাড়িতে যান ব্যক্তিগত কাজে।

পরে বিকাল সাড়ে ৫টায় কবিরাজ ফারুক তাকে ফোন করে বলে, ‘আপনার মেয়েকে খারাপ জিন টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি আসেন।’

শিখার মা কবিরাজের বাড়িতে এসে দেখেন, তার মেয়েকে মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে। পরে তাড়াতাড়ি তিনি চিকিৎসককে খবর দেন।

চিকিৎসক এসে শিখাকে দেখে বলেন, আপনার মেয়ে মারা গেছেন কয়েক ঘণ্টা আগেই। স্বামী প্রবাসী হওয়ায় মায়ের কাছেই বেশি থাকতেন শাহনাজ আক্তার শিখা (২৫)। তিন বছরের একটি ছেলেও আছে। গেল রোজার ঈদের পর থেকে কেমন যেন অস্বাভিক আচরণ করতে থাকেন শিখা। যখন ভালো থাকেন মা সুরাইয়া বেগমকে জানান কোনো কিছুই মনে রাখতে পারেন না। সবকিছু কেমন ওলট-পালট লাগে। যখন অস্বাভাবিক থাকেন, তখন নিজেই নিজের জামাকাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলেন। এমন অবস্থায় শিখাকে ডাক্তারের কাছে নেন তার মা সুরাইয়া বেগম। ডাক্তারের চিকিৎসার পাশাপাশি একজন হুজুরের দ্বারাও চিকিৎসা করান। যদি কোনো ‘খারাপ আছর’ থেকে থাকে এই ভেবে। কিন্তু কোনো কিছুতেই কোনো কাজ হচ্ছিল না।

পরে শিখাদের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে খোঁজ মিলে কবিরাজ ফারুক হোসেনের। মেয়েকে ভালো করার জন্য শরণাপন্ন হন ওই কবিরাজের কাছে। কবিরাজ ফারুক ও তার স্ত্রী জেসমিন দম্পতির সঙ্গে ১০ হাজার টাকায় চুক্তি হয় শিখাকে সারিয়ে তোলার জন্য। এক সপ্তাহ চিকিৎসা চলবে। প্রাথমিক চিকিৎসায় কবিরাজ শিখার মাকে জানায়, তার সঙ্গে একটি খারাপ জিন আছে। তাকে তাড়াতে হলে বেশকিছু নিয়ম পালন করতে হবে। এজন্য শিখার মায়ের কাছ থেকে কবিরাজ অগ্রিম ৭ হাজার টাকা নেয়। গত ১৭ জুন (সোমবার) বিকালে শিখাকে সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি চৌধুরীপাড়ায় কবিরাজের ভাড়া বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।

এ বিষয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পরিদর্শক (অপারেশন) এইচএম জসিম উদ্দিন বলেন, কবিরাজের ভুল চিকিৎসায় শিখার মৃত্যু হয়েছে। তার মা এ ঘটনায় রাতেই বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। এদিকে শিখার এমন মৃত্যুর বিষয়টি সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় অবহিত করেন তার মা ও চিকিৎসক। পরে পুলিশ গিয়ে শিখার লাশ উদ্ধার এবং কবিরাজ দম্পতিকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। বুধবার রাত ১২টায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দাঁড়িয়ে এই প্রতিবেদককে কান্নাজড়িত কণ্ঠে পুরো ঘটনা জানান শিখার মা সুরাইয়া বেগম।

তিনি তার ভুল স্বীকার করে বলেন, আমার মতো আর কোনো মা যেন এ রকম ভুল না করেন। সেই সঙ্গে আমি ওই ভণ্ড কবিরাজ দম্পতির দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।

বাংলাদেশ জার্নাল/ওয়াইএ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
close
close