ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৫ কার্তিক ১৪২৭ আপডেট : ১০ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৬:১৭

প্রিন্ট

সিঙ্গাপুর প্রবাসীদের দুর্দশা তুলে ধরেছে করোনা!

সিঙ্গাপুর প্রবাসীদের দুর্দশা তুলে ধরেছে করোনা!
ফাইল ছবি
জার্নাল ডেস্ক

কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেছে জাকির হোসেন খোকন তার ঘরের বাইরে যেতে পারেন নি। এই ঘরটিতে ১১ জনের সঙ্গে থাকেন তিনি। ঘরটিতে লোহার তৈরি ছয়টি বাঙ্ক বেড ছাড়া তেমন কিছুই নেই। প্রত্যেকটি বেডের সামনে কাপড় আর বেমানান তোয়ালে ঝুলিয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার জন্য আড়াল তৈরি করা হয়েছে।

ঘরের ভেতরকার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, দিন রাত আমরা এই একটা ঘরের ভেতরেই থাকি। এটা আসলে আমাদের ওপর মানসিক নির্যাতন। এটা জেলখানার মতো। ঘরের ভেতরে জায়গা না থাকার কারণে আমরা সামাজিক দূরত্বও বজায় রাখতে পারি না।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। সেরে ওঠার পর কাজেও ফিরে গেছেন। জাকির ভেবেছিলেন তার খারাপ দিনগুলো চলে গেছে। তিনি যে ডরমিটরিতে থাকেন সেটাও জুন মাসে ভাইরাসমুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু অগাস্ট মাসে সেখানে নতুন করে সংক্রমণ দেখা দিলে হাজারো অভিবাসী শ্রমিকের মতো তাকেও আবার কোয়ারেন্টিনে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে গৃহীত ব্যবস্থার জন্য এক সময় সিঙ্গাপুরের প্রশংসা করা হয়েছিল। কিন্তু ভাইরাসটি যখন বিদেশি অভিবাসীদের ডরমিটরিতে গিয়ে পৌঁছায় তখন এবিষয়ে দেশটির সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।

অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, সিঙ্গাপুরে যে এধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে সেটা আগে থেকেই বোঝা উচিত ছিল। কয়েক মাস ধরে সিঙ্গাপুরের স্থানীয় কমিউনিটিতে প্রতিদিন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হওয়ার সংখ্যা একক সংখ্যার ঘরে। লোকজন কাজে ফিরে যাচ্ছে, সিনেমা খুলে দেওয়া হয়েছে, রেস্তোরাঁগুলো থেকে আবার মানুষের হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে।

কিন্তু সিঙ্গাপুরে যারা অল্প আয়ের মানুষ তাদেরকে ঘরের ভেতরেই থাকতে হচ্ছে। তারা এখন এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।

এই শহর গড়ে তুলেছেন যারা

সিঙ্গাপুরে প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত করা হয় জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে। ওই ব্যক্তি দেশের বাইরে থেকে এসেছিলেন। এর কয়েক সপ্তাহ পর আক্রান্তের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায়।

সেসময় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা লোকজনকে খুঁজে বের করতে ব্যাপক কন্টাক্ট ট্রেসিং কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। সারা দেশে চালু করা হয় করোনাভাইরাস-ট্রেসিং অ্যাপ। এবিষয়ে লোকজনকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। তাদের সঙ্গে যোগাযোগও বাড়ানো হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারি বিশেষজ্ঞরা সিঙ্গাপুরের গৃহীত এই পদ্ধতির প্রশংসা করেন। এই পদ্ধতিকে তারা "সর্বোচ্চ মানের নিখুঁত শনাক্তকরণ" বলে উল্লেখ করেন।

কিন্তু দেশটিতে ইতোমধ্যে একটি সঙ্কট তৈরি হচ্ছিল যা বেশিরভাগ মানুষই দেখতে পায় নি।

সিঙ্গাপুরে তিন লাখেরও বেশি অল্প আয়ের বিদেশি শ্রমিক কাজ করেন। তারা সেখানে গেছেন ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে। তাদের বেশিরভাগই কাজ করেন নির্মাণ ও উৎপাদন শিল্পে।

এসব শ্রমিকের সিঙ্গাপুরে থাকার বিষয়টি নির্ভর করে তাদের চাকরির ওপর। চাকরিদাতার পক্ষ থেকে অর্থের বিনিময়ে তাদের থাকার জন্য ব্যবস্থা করা হয়। ভিড়ে ঠাসা গাড়িতে করে তারা তাদের ডরমিটরি থেকে কাজের জায়গায় যাতায়াত করেন। অন্যান্য ডরমিটরি থেকে আসা শ্রমিকদের সঙ্গে তারা একত্রে বিশ্রাম নেন যা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য খুবই উপযোগী এক পরিস্থিতি।

একটি ডরমিটরিতে সর্বোচ্চ কতজন থাকতে পারবেন আইনে তার কোন সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। তবে কোভিড মহামারির আগে সাধারণত ২০ জনেরও বেশি শ্রমিক ডরমিটরির একটি কক্ষে একত্রে থাকতেন।

মার্চ মাসের শেষের দিকে অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একটি গ্রুপ ‘ট্রানসিয়েন্ট ওয়ার্কার্স কাউন্ট টু’ সতর্ক করে দিয়েছিল যে ‘এসব অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে যে নতুন করে ক্লাস্টার সংক্রমণের ঘটনা ঘটবে না সেটা অস্বীকার করা যায় না।’

সিঙ্গাপুরে আংশিকভাবে জাতীয় লকডাউন জারি করার কয়েক সপ্তাহ পর সাধারণ লোকজনের মধ্যে সংক্রমণ পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এর মধ্যে অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের আশঙ্কা সত্যি হয়। প্রতিদিন কয়েক শ' শ্রমিক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হতে থাকেন।

এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে সরকার প্রতিদিন আলাদা আলাদা করে দুই ধরনের পরিসংখ্যান তুলে ধরতে শুরু করে। এগুলো হচ্ছে স্থানীয় কমিউনিটিতে ও ডরমিটরিতে শনাক্ত হওয়া লোকের সংখ্যা।

এসব পরিসংখ্যানে দেখা যায় কমিউনিটিতে ও ডরমিটরিতে আক্রান্ত লোকের সংখ্যায় কতো তারতম্য- ডরমিটরিতে প্রচুর সংখ্যক লোক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও কমিউনিটিতে এই সংক্রমণের হার ছিল খুবই কম।

নিউজিল্যান্ডের ম্যাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বিষয়ের অধ্যাপক মোহন দত্ত বলেছেন, অন্য যেকোনো মহামারির মতো কোভিড-১৯ মহামারিও অসাম্যের। সিঙ্গাপুরে ভিন্ন ভিন্ন দুই ধরনের সংখ্যা তুলে ধরা হচ্ছে। এর ফলে এই বৈষম্য আরো প্রকট হয়ে উঠেছে।

তালাবদ্ধ ডরমিটরি

এই পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ বিদেশি শ্রমিকদের ডরমিটরি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খাতে কাজ করেন এরকম ১০,০০০ স্বাস্থ্যবান কর্মীকে আলাদা করে ফেলা হয় যাতে দেশটির কাজ কর্ম স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে।

তবে গণহারে পরীক্ষা চালানোর সময় বেশিরভাগ শ্রমিক ডরমিটরিতে আটকা পড়েন। কাউকে কাউকে তাদের ঘর থেকেও বের হতে দেওয়া হয়নি। আক্রান্ত কর্মীদের ধীরে ধীরে সরিয়ে নেওয়া হয়, সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।

লকডাউনের সময় সারা দেশের অভিজ্ঞতা থেকে এসব ডরমিটরির চিত্র একেবারেই ভিন্ন। সারা দেশে দোকানপাট খোলা ছিল, প্রাত্যহিক শরীর চর্চাকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং সব ধরনের আউটলেট থেকে পণ্য ও সেবা সরবরাহ অব্যাহত ছিল। কিন্তু এই বিদেশি শ্রমিকদের রাখা হয়েছিল লকডাউনে। তাদেরকে প্রয়োজনীয় খাবারটুকুও দেওয়া হয়নি।

যখন লকডাউন জারি করা হলো, আমাদেরকে ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হলো না। আমরা পাশের ঘরেও যেতে পারতাম না, বলেন ভাইথ্যানাথান রাজা, দক্ষিণ ভারত থেকে যাওয়া একজন শ্রমিক।

এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই এসব ডরমিটরির ওপর দৃষ্টি পড়ে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য নতুন কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এগুলোর জন্য দানের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং যারা এসব ডরমিটরি পরিচালনা করেন তারা এগুলোর অবস্থা উন্নত করার উদ্যোগ নেন। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

বাংলাদেশ জার্নাল/এইচকে

আরো পড়ুন:

> মোজাম্বিকে নিখোঁজ প্রবাসীর লাশ উদ্ধার

> প্রবাসী আবু তালাত আর নেই

> কুয়েতে আটক এমপি পাপুলের বিচার শুরু

> তুরস্কে এরদোগান মোমেন বৈঠক

> দ. কোরিয়ায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বাংলাদেশির মৃত্যু

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত