ঢাকা, রোববার, ০৭ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ আপডেট : ৯ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২০, ১৬:৩০

প্রিন্ট

এই ছুটি সেই ছুটি না

এই ছুটি সেই ছুটি না

Evaly

জহুরুল ইসলাম

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে দিন গুনে, পারভেজ আর ১০ দিন বাকি আছে ক্যাম্পাস বন্ধ হতে। শেষ দিন ক্লাস করে বিকালেই বাড়ি যাবি নাকি পরের দিন? আমি হয়তো ক্লাস শেষ হলে বিকালেই চলে যাবো।

প্রতিবার বাসায় যাওয়ার আগে এমন প্রতীক্ষা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ক্যাম্পাস বন্ধের দিকে তাকিয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য এমন প্রতীক্ষায় থাকতাম সবাই। বাসায় গিয়ে স্কুলের বন্ধুদের সাথে ঘোরাঘুরি, আড্ডা দেওয়া, পাড়ার ছেলেদের সাথে যখন যে খেলাধুলা ক্রিকেট ফুটবল, এসব নিয়েই মেতে থাকতাম। সাধারণত সব ক্যাম্পাসেই বড় ছুটিগুলো প্রায় একসাথেই হয়। বাসায় আসলে একজন আরেকজনের বাসায় যাওয়া, অনেকদিন পরে সাক্ষাৎ হওয়ায় আড্ডাগুলোই একটু ভিন্ন মাত্রা পেত।

কিন্তু এবারের ছুটিটা কেমন যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো করে পেয়েছি। করোনার কথা বলে, ফেব্রুয়ারির ১৬ তারিখ চার ব্যাচ মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ক্লাস করবো না। ডিপার্টমেন্টেও গিয়েছিলাম সবাই মিলে। ছুটি পাবো এই ভাবনায় সবার মনে যেন ঈদের আনন্দ। কেননা এই ছুটিটা ছিলো অনাকাঙ্ক্ষিত এবং সেমিস্টারের শেষের দিকে, যখন ক্লাস পরীক্ষা আর এসাইনমেন্টের চাপ তখন। সেমিস্টারের শেষের দিকে ক্লাস পরীক্ষা এসাইনমেন্ট না হয়ে উল্টো যদি ছুটি হয়, তাহলে ক্যাম্পাসিয়ানদের এর চেয়ে খুশির সংবাদ আর কি বা হতে পারে!

ছুটিও হলো। ক্যাম্পাসের সাথে হলও বন্ধ। ১৮ তারিখ দুপুর ১২টার মধ্যে হল ছাড়তে হলো। প্রতিবার ক্যাম্পাস বন্ধ হলেও কেউ না কেউ হলেই থাকে। কিন্তু এবার হল প্রশাসন কেমন জোর করেই যেন সবাইকেই হল ছাড়া করছিলেন। শুরু থেকে ছুটিটাই আমাদের কেমন যেন ছুটি দিচ্ছিলো।

হল থেকে প্রয়োজনীয় কাজে খুলনা, খুলনা থেকে গ্রামের বাড়ি। প্রথম দুই একদিন বাড়িতে খারাপ কাটেনি। গ্রামের মানুষগুলো স্বাভাবিক দিনযাপন করছিলো। দেশ বিদেশে যে কিছু একটা ঘটছে, এই জিনিসটাই তাদের বুঝাতে পারছিলাম না। গ্রামের মানুষদের বুঝাতে যেয়ে এমন অবস্থা যেন আমিই ভুলতে বসছিলাম করোনার থাবা। নিজেরা ফান্ড গঠন করে এলাকায় পাবলিকিয়ানরা মিলে মাইকিং করে সাবান ও পোস্টার বিতরণ করে প্রচারণা চালিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে চেষ্টা করলাম।

তার দুএকদিন পর থেকে নিজেকে যেন গৃহবন্দী হিসাবে আবিষ্কার করলাম। সেই প্রথম দুই একদিনের পর থেকে স্বাভাবিক জীবনটা অস্বাভাবিক হতে লাগলো। সারাদিন ঘরবন্দী, যেন বেড়াহীন এক জেলখানা। বাড়িতে এখন খাওয়া দাওয়া, ঘুম আর মোবাইল ফোন! বেশিক্ষণ ফোন হাতে রাখলেও আব্বু আম্মুর বিধিনিষেধ। ঘর থেকে বেরিয়ে চাচাতো ভাইদের ঘরে তারপর আবার আমাদের ঘরে। এটাকেই ভাবতে হচ্ছে কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে আবার রুমে ফিরেছি। চারপাশে কি অদ্ভুত রকমের এক পরিবর্তন। বাড়ির পাশেই খেলার মাঠটি শুন্য পড়ে আছে যেন খেলার কেউ নেই। অথচ কদিন আগেই ছিলো কত কোলাহলময়।

রাস্তাগুলো ও জনমানবশূন্য হয়ে পড়ে আছে। যে কয়টি নিত্য প্রয়োজনীয় দোকান খোলা আছে সেখানেও রশি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে দূরত্ব, দেখে মনে হচ্ছে যেন দোকানে যেতেই মানা। না মানা না, এটা মানুষের বেঁচে থাকতে চাওয়ার জন্য মানুষের বদলে ফেলা পৃথিবীর এক নতুন সংস্করণ। এই ছুটি চিনিয়েছে অনেক কিছুই। এই ছুটি সেই ছুটি না; এই ছুটি নিজেকে, সমাজকে, দেশকে, পৃথিবীকে নতুনভাবে সাজিয়ে নেওয়ার জন্য পৃথিবীর দেওয়া অনির্দিষ্টকালের এক ছুটি।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত