ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ৯ কার্তিক ১৪২৭ আপডেট : ৬ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪:০০

প্রিন্ট

অদম্য সালমার অনন্য পথচলা

অদম্য সালমার অনন্য পথচলা
ফিচার ডেস্ক

চৌদ্দ বছর আগে বাংলাদেশ রেলওয়েতে চালক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের মেয়ে সালমা খাতুন। ছোটবেলা থেকেই ব্যতিক্রমধর্মী কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল তার। যেটা সাধারণত কেউ করে না তেমনি একটু চ্যালেঞ্জিং ধরণের কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল সালমার। এ ইচ্ছা পূরণ করাটা তার জন্য এতো সহজ ছিল না, কেননা তিনি ছিলেন গ্রামের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। এদিকে তাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্যও তার বাবা-মায়ের ছিল না। গ্রামের স্কুল থেকে এসএসসি পাস করার পর অর্থনৈতিক টানাপোড়নের কারণে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু তিনি পড়াশুনা করতে জেদ করায়, তার বাবা-মা তাকে আবার এইচএসসিতে ভর্তি করায়।

এদিকে সালমা খাতুনের পরিবারে আর্থিক টানাপোড়েন লেগেই ছিলো। যে কারণে এইচএসসি পাস করার পর সালমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, তার পরিবার থেকে বলা হয় আর পড়াশোনা করানো সম্ভব নয়। তখন সালমার মনে হলো তার একটা কিছু করা দরকার যেন সে পরিবারকে কিছুটা অর্থনৈতিক সহযোগিতা করতে পারে। সালমা যখন একটা কিছু করার উপায় খুঁজছিলো, তখন তার বড় ভাই তাকে একদিন বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখিয়ে বলল যে, তুমি চাইলে এখানে আবেদন করতে পারো। চাকরির এ সুযোগটি সালমার ইচ্ছার সাথে মিলে যায়, আর তাই সে আবেদন করে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সালমা মৌখিক পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পায়। মৌখিক পরীক্ষায় উপস্থিত কর্তাব্যক্তিরা খুব আগ্রহ নিয়েই সালমার কাছে জানতে চান যে, এ চাকরিটি তিনি করতে পারবে কিনা? তিনি বলেছিলেন, ‘আমি পারবো, এ চাকরিটি আমি করতে চাই’৷ পরীক্ষকরাও তাকে উৎসাহিত করেছিলেন।

চাকরিতে যোগদান করে ট্রেনিং এর জন্য সালমাকে ঢাকায় চলে যেতে হয়। যে কারণে প্রথমে তার প্রতিবেশীরা জানতো না তিনি রেলওয়েতে চালক হিসেবে যোগদান করেছন। প্রায় এক বছর ট্রেনিং শেষে যখন তিনি ফিরে আসেন তখন তার আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা বিষয়টি জানতে পারে। বাংলাদেশের প্রথম নারী রেলচালক হয়ে সালমা আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের গর্বিত করেছে বলে তারা সবাই তাকে উৎসাহিত করেছে।

সালমা খাতুন গণমাধ্যমকে বলেন, রেলওয়েতে এখন একমাত্র সালমা খাতুনই পূর্ণাঙ্গ নারী রেলচালক। এ সংখ্যা এখন বাড়ছে বর্তমানে প্রায় ২০ জন নারী কর্মরত আছেন যারা কেউ সহকারি রেলচালক, কেউ চালক হিসেবে প্রশিক্ষণে আছেন। সালমা যখন চাকরিতে যোগদান করে তখন তার বিভাগে ৫০০ পুরুষ কর্মী ছিলেন। তার বিপরীতে তিনিই ছিলেন একমাত্র নারী কর্মী ছিলেন।

তিনি যখন ট্রেনিং এ যায় তখন তার পুরুষ সহকর্মীদের অনেকেই তাকে দেখতে আসতো এই ভেবে যে রেলওয়েতে একজন মেয়ে সহকর্মী এসেছে। তাদের অনেকেই বলতো যে এটি অনেক চ্যালেঞ্জিং একটি পেশা। তবে সালমা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে, তিনি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার চেষ্টা করবেন। এই মনোবল থাকার কারণেই সম্ভবত তিনি আজ ১৪ বছর ধরে সফলতার সাথে কাজ করে আসছে। অনেক সাহস নিয়ে এ কাজটি করতে হয়েছে সালমাকে। এ সময়ে অনেকেই আবার তাকে বলেছেন, আমরা যদি পারি তিনি কেন পারবে না। সালমার সহকর্মীরা সকলেই তাকে সহযোগিতা করেছিলেন।

পড়াশোনার ব্যাপারে জানতে চাইলে সালমা বলেন, এইচএসসি পাস করে সালমা চাকরিতে যোগদান করে। তবে পড়াশোনার প্রতি তার সবসময়ই আগ্রহ ছিলো। সে কারণে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আর চাকরি করার পাশাপাশি তিনি বিএড পাস করেন। পরে, কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে তিনি এমএ পাস করেন।

বাংলাদেশ রেলওয়েতে চাকরির অবিজ্ঞতা জানাতে তিনি বলেন, নারী পুরুষ সবাইকেই এ পেশাটিতে অত্যন্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়। যেমন রাস্তার উপর থেকে কেউ পাথর ছুড়ে মারে, সে জন্য সতর্ক থাকতে হয়। সবসময় সিগনালের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। বিপদ এড়ানোর জন্য প্রতিটি মুহূর্তে সচেতন থাকতে হয়। তবে একজন নারী চালক হিসেবে তিনি বলেন, মেয়েদের একটু বেশি চাপ নিতে হয়, কেননা মেয়েরা পরিবার ও সন্তানদের রেখে কাজে যায়। যদিও সালমার স্বামী তাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন।

গণমাধ্যমকে তিনি আরো জানান, সালমা দীর্ঘ ১৫ বছরের কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে দেখেছেন তা হলো, একজন পুরুষ সহকর্মীকে বাসায় পৌঁছে তাদের গৃহস্থালির কাজকর্ম বা সন্তানদের সামলানোর বিষয়ে মনোযোগ দিতে হয়না। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে একজন পুরুষ সহকর্মীর মতো একজন নারী কর্মীকেও সমান সময় অতিবাহিত করতে হয়। নারীকর্মীদের কর্মক্ষেত্রে সহনশীল মাত্রার কর্ম ঘণ্টা নির্ধারণ ও তার বাস্তব রূপ দেয়ার দাবি করেন সালমা।

যাত্রীদের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, যাত্রীরা তাকে দেখে খুব অবাক হয়। প্রথম দিকে আরো বেশি অবাক হতো। যাত্রীরা অনেকেই প্রশ্ন করতো, মেয়ে মানুষ ট্রেন চালাচ্ছে? আবার অনেক মেয়েই সালমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়। সূত্র: ডয়েচেভেলে

আরও পড়ুন

আমাদের হারকিউলিস নারীরা!

মরেও বেঁচে আছে ওরা

ড্রাগন চাষে স্বাবলম্বী গৃহিণী রাবেয়া

বিখ্যাত এক ‘গাছ বাড়ি’র গল্প

মাল্টা চাষে দিনাজপুরের রাসেলের সাফল্য

থেমে যাক বয়সের চাকা

শরীরে আগুন লাগলে সঙ্গে সঙ্গে যা করবেন

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত