ঢাকা, সোমবার, ০৮ মার্চ ২০২১, ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭ আপডেট : ২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ১৯:২৪

প্রিন্ট

দেশে হতে পারে ভারত-চীনের টিকার ট্রায়াল

দেশে হতে পারে ভারত-চীনের টিকার ট্রায়াল
ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে আগামী বুধবার থেকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন দেয়ার কার্যক্রম শুরু হবে। ওই দিন রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে একজন নার্সকে টিকা দেয়ার মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি শুরু হবে। পাশাপাশি ভারত বায়োটেকের কো-ভ্যাকসিন এবং চীনের আনুই জেফাই টিকার ট্রায়ালও বাংলাদেশে হতে পারে। এই দুটি প্রস্তাবই বিবেচনা করা হচ্ছে। আর ট্রায়াল সফল হলে দুটি টিকাই স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশে উৎপাদন করা হতে পারে।

গত বৃহস্পতিবার ভারত থেকে শুভেচ্ছা হিসাবে পাঠানো হয় ২০ লাখ ডোজ টিকা। আর আগামী ২৫ জানুয়ারি ভারত থেকে কেনা ৫০ লাখ ডোজ টিকা দেশে আসবে।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে যারা সামনের সারিতে কাজ করেন, তারা আগে টিকা পাবেন। পরবর্তী কয়েকদিনে ঢাকার চারটি হাসপাতালে পরীক্ষামূলক হিসাবে ৪০০-৫০০ স্বাস্থ্যকর্মীকে টিকা প্রয়োগ করা হবে। এই হাসপাতালগুলো হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল।

তবে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সারাদেশে করোনাভাইরাসের টিকা দেয়ার কার্যক্রম শুরু করা হবে। আর আগামী ২৬ জানুয়ারি থেকে টিকার জন্য নিবন্ধন শুরু হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

ভ্যাকসিন দেয়ার কার্যক্রম শুরু হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুল মান্নান জানান, আগামী বুধবার থেকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন দেয়ার কার্যক্রম শুরু হবে। ওই দিন টিকা দেয়ার এই কার্যক্রম ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

টিকার প্রসঙ্গে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ভারতে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করোনাভাইরাসের যে টিকা বাংলাদেশে এসেছে, তা নিয়ে ‘ভয়ের কারণ নেই’ এবং প্রথম দিকে নাম এলে তিনি নিজেও টিকা নিতে রাজি।

তিনি বলেন, ভ্যাকসিনের বিষয়টি সোজা-সরলভাবে জাতির কাছে তুলে ধরতে চাই। ভ্যাকসিন নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নাই। সব ওষুধেরই কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। কিন্তু আমাকে যদি বলে… যদি আমার নাম আগে আসে, আমি (টিকা) নিয়ে নেব। তবে আমি চাই যে আমার প্রধানমন্ত্রী আগে নেবেন।

এবিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ইমোশনাল হয়ে কোনো কাজ হয় না। ইমোশনাল হলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সরকার কী করছে? সরকার চেষ্টা করছে। আমরা যদি ভাবি সরকার চুরি করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে এটা ঠিক না।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নজরুল বলেন, এখন যে ভ্যাকসিন জনগণকে দেয়া হচ্ছে সেগুলোকে বলা হয় ‘ফার্স্ট জেনারেশন’ ভ্যাকসিন। বৈজ্ঞানিকদের ভাষায় একে ভ্যাকসিনের ফোর্থ ট্রায়ালও বলা হয়। হাজার হাজার মানুষকে এই ভ্যাকসিন দেয়ার পর আবার বিশ্লেষণ করা হবে। তারপর সেকেন্ড জেনারেশন ভ্যাকসিন দেয়া শুরু হবে। আর ফার্স্ট জেনারেশন ভ্যাকসিন আগে বড় আকারে ব্যবহার করা হত না। আগে হয়নি, কারণ সময় ছিল। এখন যেহেতু সময় নেই, তাড়াতাড়ি আমাদেরকে নিতে হবে। এজন্যই ফার্স্ট জেনারেশন ভ্যাকসিনই আমরা নিচ্ছি, সারা পৃথিবীর লোকই নিচ্ছে। তবে ভয় পাওয়ার সঙ্গে ভ্যাকসিন না নেয়ার সম্পর্ক একেবারেই ক্ষীণ বলেও জানান তিনি।

এদিকে দেশে ভারত বায়োটেকের কো-ভ্যাকসিন এবং চীনের আনুই জেফাই টিকার ট্রায়াল হতে পারে। দুটি প্রস্তাবই বিবেচনা করা হচ্ছে। ট্রায়াল সফল হলে দুটি টিকাই স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী দেশে উৎপাদন করা হতে পারে।

এবিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের পরিচালক মাহমুদ উজ জাহান জানান, ভারত বায়োটেকের কোভ্যাক্স টিকার বাংলাদেশে ট্রায়ালের একটা আবেদন তারা পেয়েছেন। এখন এথিকস কমিটি আবেদনটি পরীক্ষা করে দেখছে। আমরা এথিক্যাল অনুমোদনের কাজটি করি। সেজন্য তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ যা যা প্রয়োজন তার পরীক্ষা করা হচ্ছে। এই কাজে ঠিক কতদিন লাগবে তা এখন বলা যাচ্ছে না।

জানা গেছে, বাংলাদেশে ভারত বায়োটেকের পক্ষে আইসিডিডিআরবি আবেদন করেছে। গত বছর তারা চীনের সিনোভ্যাক্স ট্রায়ালের জন্যও আবেদন করেছিলো। চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তা স্থগিত করে দেয়। তিন মাস পরে অবশ্য অনুমতি দিলেও চীন টাকা চাওয়ায় আর ট্রায়াল হয়নি।

এবিষয়ে আইসিডিডিআরবি’র একজন কর্মকর্তা জানান, তারা প্রটোকলটি জমা দিয়েছেন ভারত বায়োটেকের পক্ষে। তবে বাকি বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত নয়। অনুমোদন পেলে স্থানীয় চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশে উৎপাদন করা যেতে পারে। কিন্তু রপ্তানি করা যাবে না। কারণ বাংলাদেশে উৎপাদিত কোনো ধরণের টিকা ডাব্লিউএইচও এখনো অনুমোদন দেয়নি। তৃতীয় ধাপের হিউম্যান ট্রায়াল ছাড়াই ভারতের কো-ভ্যাকসিন সেখানে সীমিত আকারে ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে। আর বাংলাদেশে এখন তারা তৃতীয় ধাপের হিউম্যান ট্রায়াল করতে চায়।

অন্যদিকে চীনের আনুই জিফেই লংকম বায়োফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড তাদের উৎপাদিত করোনা টিকার তৃতীয় ধাপের হিউম্যান ট্রায়াল করতে চায় বাংলাদেশ। সরকারের নীতিগত অনুমোদন পাওয়ার পর তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)-এর সাথে কাজ করছে। চীনা প্রতিষ্ঠানটির প্রধান আলোচনা চূড়ান্ত করতে দু-একদিনের মধ্যে ঢাকা আসতে পারেন।

এবিষয়ে বিএসএমএমইউ’র উপাচার্য ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, আমরা তাদের ভ্যাকসিন এখানে ট্রায়ালে সম্মত হয়েছি। এখন ওদের কাছ থেকে আমরা বিভিন্ন তথ্য নিয়ে প্রটোকল তৈরির চেষ্টা করছি। চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে কত দিন লাগবে তা বলা যাচ্ছে না। সপ্তাহখানেক পর আমরা হয়তো কিছু বলতে পারবো। কিছু ভ্যাকসিন উপহার হিসেবে দেয়ার পাশাপাশি আরো কিছু প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এখানে ভ্যাকসিন তৈরির একটি প্ল্যান্টও করতে চেয়েছে। তবে সব কিছুর পর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর চূড়ান্ত অনুমোদন দিলেই কেবল টিকার হিউম্যান ট্রায়াল শুরু করা যাবে।

দেশে ভারত ও চীনের নতুন কোম্পানির টিকার ট্রায়াল প্রসঙ্গে করোনা সংক্রান্ত জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ভারত ও চীনের নতুন কোম্পানির টিকার ট্রায়াল এখানে হলে তাতে বাংলাদেশের মানুষের সুবিধাই হবে। যদি ট্রায়াল সফল হয় তাহলে আমরা ব্যবহার করতে পারবো। তবে সিনোভ্যাক্সের ট্রায়াল যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে আটকে দেয়া না হতো তাহলে বাংলাদেশের মানুষ অনেক কম দামে এরইমধ্যে টিকা পেতো। আর এখন দেশে টিকার প্রস্তুতি ভালোই বলা যায়। তবে কিছু মানুষ এই টিকা নিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা করছে। মানুষের মধ্যে ভয় ছড়াচ্ছে, এটা ঠিক না। যেকোনো টিকা নিতে গেলে কিছু জটিলতা হয়। সাধারণ মানুষকে সেটা বুঝাতে হবে।

প্রসঙ্গত, অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করোনাভাইরাসের কোভিশিল্ড নামের টিকাটি ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট তৈরি করছে। বাংলাদেশ সেই প্রতিষ্ঠান থেকে তিন কোটি ডোজ টিকা কেনার জন্য চুক্তি করেছে।

আরো পড়ুন: ভ্যাকসিনের যত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

কেএস/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত