ঢাকা, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬ আপডেট : ১২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০২০, ১৯:৫০

প্রিন্ট

করোনাভাইরাস: গুজবে কান দিয়ে নিজের ও পরিবারে ক্ষতি করবেন না

করোনাভাইরাস: গুজবে কান দিয়ে নিজের ও পরিবারে ক্ষতি করবেন না
ডা. কামরুল ইসলাম শিপু

COVID-19 করোনাভাইরাস! বাঁচতে হলে জানতে হবে। ‌‘ফেসবুকে যা দেখবেন সেটাই বিলিভ করবেন না। এটা খেলে করোনা হবে না, ওটা মাখলে করোনা ভয় পাবে, নাগামরিচের সাথে কাচাতেল মিশিয়ে ভর্তা খেলে ভাইরাস মারা যাবে এসব কুবুদ্ধি নিয়ে নিজের এবং পরিবারে ক্ষতি করবেন না।’

করোনা ভাইরাস আউটব্রেকের পর প্রায় সব দেশ এবং বিশেষজ্ঞরা একটা কথাই বারবার বলছেন- 'সোশ্যাল ডিসটেন্সিং'। সহজ বাংলায় বলা যায় বেশি মানুষ এক জায়গায় একসাথে না থাকা। প্রশ্ন আসে, এটা কিভাবে করোনা ভাইরাস থেকে আমাদের বাঁচাবে? উত্তর হলো, করোনা ভাইরাস প্রধানত দুইভাবে ছড়ায়।

১) আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি কাশি দিলে সে সময় নাক মুখ দিয়ে খুবই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা বের হয়। করোনা ভাইরাস এসব জলকণার মধ্যে দিয়ে আরেক জনের শরীরে ঢুকে পরে। যে হাঁচি দিয়েছে তার মোটামুটি ছয় ফুটের মধ্যে এই জলকণাগুলো ছড়াতে পারে। সেজন্য যাদের হাঁচি কাশি আছে তাদের মধ্যে অন্তত এই দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং তাদের উৎসাহিত করতে হবে যাতে তারা নিজের ঘরে একটা রুমে অন্তত ১৪ দিন অবস্থান করেন। অবস্থান করার ধরনটা হবে এমন যেন তারা পরিবারের অন্য সদস্যের সরাসরি সংস্পর্শে না আসেন।

২) করোনা ভাইরাস বিভিন্ন বস্তুতে লেগে থাকতে পারে বেশ কয়েক দিন। বিশেষ করে ধাতব বস্তুতে। যেমন দরজার হ্যান্ডেল, গাড়ীর হ্যান্ডেল, লিফটের বাটন এসবের মতো জায়গায়। এছাড়াও কাপড়েও লেগে থাকতে পারে। প্রশ্ন আসে এসব জায়গায় ভাইরাসটা আসলো কোথা থেকে? ভাইরাস আসবে সেই আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে। কিভাবে? আক্রান্ত ব্যক্তি যখন হাঁচি কাশি দিবেন, আমাদের দেশে সাধারণত আমরা দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাঁচি দেই অথবা সরাসরি অন্য মানুষের মুখের উপর হাঁচি দেই। দুইটাই খুবই খারাপ অভ্যাস। হাতে হাঁচি দিলে ভাইরাস চলে যায় হাতে। হাত দিয়ে আমরা দুনিয়ার সব কাজ করি। দরজা খোলা, গাড়িতে ধরে বসা, খাওয়া দাওয়া, হাত মেলানো। এখন আক্রান্ত ব্যক্তির হাত থেকে ভাইরাস লেগে যায় ঐসব জাগয়ায়৷ তারপর ঐসব জায়গা সুস্থ মানুষ টাচ করলে তাদের হাতে চলে যায় ভাইরাস। সেই হাত দিয়ে মানুষ নাক চুলকায়, নাকের ভিতর আঙুল ঢুকায়, চোখ চুলকায়। ভাইরাস নাক মুখ দিয়ে ঢুকে যায় সুস্থ মানুষের শরীরে। নাকের আশেপাশের জায়গা থেকে ভাইরাস ঢুকে পরে আপনার শ্বাস নালীতে তারপর ফুসফুস! এখন আপনি সুস্থ মানুষ থেকে করোনা আক্রান্ত মানুষে পরিণত হলেন। আপনি এরপর আগেরজনের মতো এসব কাজ করে আরো মানুষকে আক্রান্ত করবেন৷ আপনার পরিবারে মানুষই বেশি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি কারণ আপনি যেসব জায়গা টাচ করবেন তারাও করবে। আপনার টাচ-স্ক্রিন ফোনে আপনার বাচ্চা গেম খেলবে, সেও আক্রান্ত হবে। বাচ্চাকে আপনার স্ত্রী বা আপনার মা বাবা আদর করবে মুখে, তারাও আক্রান্ত হবে!

এটা থেকে বাঁচবেন কিভাবে?

১) হাত ধুবেন। বার বার। বার বার। সাবান দিয়ে ধুবেন। স্যানিটাইজার, স্যাভলন, ডেটল কিছু লাগবে না, সাবান দিয়ে ধুলেই হবে। বাইরে যখন সাবান ব্যবহার করার জায়গা পাবেন না তখন স্যানিটাইজার ব্যবহার করবেন। হাতে ভাইরাস পরিষ্কার করে ফেললে আক্রান্ত হবার ও অন্যকে আক্রান্ত করার সম্ভাবনা কমে যায় অনেকগুণ।

২) হাঁচি কাশি দেবার সময় টিস্যু দিয়ে মুখ ঢেকে দিন। মানুষের সামনে কোনভাবেই দেয়া যাবে না। টিস্যু সবসময় সাথে থাকে না। এমন অবস্থায় কনুই ভাজ করে সেখানে হাঁচি দিবেন। পরে সেটা সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলবেন। ভুলেও হাতে হাঁচি দিবেন না।

৩) খুব খুব খুব বেশি দরকার না হলে বেশি মানুষযুক্ত জায়গায় যাবেন না। রেস্টুরেন্টে যাবেন না।বেচে থাকলে হাজীর বিরানী, পাঁচ ভাই, পানসি, কাজী এস্পারাগাসে অনেক খেতে পারবেন। বাজারে প্রয়োজনে যাবেন। কাজ শেষ করে হাত ধুবেন। সিএনজি, বাস ট্রেন চড়লে অবশ্যই হাত ধুবেন।

৪) ঘরে অসুস্থ বাবা মা বা বয়স্ক কেউ থাকলে তাদের খেয়াল রাখবেন। তাদের বাইরে যাওয়া নিষেধ পুরোপুরি। তাদেরকেও হাত ধুয়ার প্র্যাকটিস করাবেন। আপনি বাইরে থেকে এসে পরিষ্কার হবার আগ পর্যন্ত তাদের কাছে যাবেন না। সম্ভব হলে উনাদের রুমে কোন অতিথি নিয়ে যাবেন না।

৫) স্কুল কলেজ বন্ধ দেয়া হয়েছে ঘরে থাকার জন্য। কক্সবাজার আর বিছানাকান্দি যাওয়ার জন্য না।

৬) অতিরিক্ত জিনিসপত্র কিনে সবকিছুর দাম বাড়াবেন না।

৭) ফেসবুকে যা দেখবেন সেটাই বিলিভ করবেন না। এটা খেলে করোনা হবে না, ওটা মাখলে করোনা ভয় পাবে, নাগামরিচের সাথে কাচাতেল মিশিয়ে ভর্তা খেলে ভাইরাস মারা যাবে এসব কুবুদ্ধি নিয়ে নিজের এবং পরিবারে ক্ষতি করবেন না। ইংলিশ পড়া জানলে WHO, NHS, CDC এই তিন ওয়েবসাইট থেকে আপডেট জানবেন। না পড়তে পারলে এটলিস্ট যারা চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়ালেখা করেছে, মানে ডাক্তারদের পোস্ট ফলো করবেন। কিন্তু যদি দেখেন কোন ডাক্তার ফেসবুকেই ওষুধের নাম দিয়ে প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিচ্ছে তাহলে বুঝবেন সে ভুয়া বা ভণ্ড বা পড়াশোনা করে ডাক্তার হয়নি। এদেরকে অবশ্যই এড়িয়ে চলবেন।

লেখক: লেকচারার, বায়োকেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সিলেট বাংলাদেশ

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত