ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ৫ পৌষ ১৪২৫ অাপডেট : ৯ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:০৫

প্রিন্ট

ইয়েমেন সংকট: কে কার সঙ্গে লড়াই করছে?

ইয়েমেন সংকট: কে কার সঙ্গে লড়াই করছে?
রায়হান আহমেদ তপাদার

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেনে চলছে যুদ্ধ। শুরুতে গৃহযুদ্ধ হিসাবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে এটি একটি নতুন রূপ লাভ করেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ১০টি রাষ্ট্রের একটি জোট ইয়েমেনের বৈধ সরকারের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছে। এই অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দরিদ্র কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক বিচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র চরম সংকটে পতিত হয়েছে। এই সংকটের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

১৯৬৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন নামক ২টি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইয়েমেনিদের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তারর সূত্রপাত ঘটে। উত্তর ইয়েমেন ও দক্ষিণ ইয়েমেনের ঐতিহাসিক বিভক্তি থেকেই রাষ্ট্রটি অস্থিথিশীল হিসাবে পরিগণিত। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব।

মুসলিম বিশ্বে শিয়া-সুন্নী বিরোধ কারও অজানা নয়। কিন্তু ইয়েমেনে এই বিরোধ ভয়ংকর রূপ ধারণ করে আছে। যে কারণে কোন সরকার সফলভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারছে না। গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে গৃহযুদ্ধের বিষয়টি ছাড়াও ইয়েমেন অর্থনৈতিকভাবে এই অঞ্চলে পশ্চাৎপদ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত। দেশটির প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো যখন ব্যাপক অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ইয়েমেন তখন ক্রমাগত দারিদ্রের কবলে নিমজ্জিত। অথচ সাড়ে পাঁচ লক্ষ বর্গকিলোমিটার আয়তনে আড়াই কোটি মানুষ দেশটিতে বসবাস করে। 'এডেন' এর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর রয়েছে। যে বন্দর দিয়ে প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার চলাচল করে। অভ্যন্তরীণ বাস্তবতারর আরেকটি দিক হচ্ছে দুর্বল শাসন ব্যবস্থা।

এই জোটকে লজিস্টিক আর ইন্টেলিজেন্স সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য আর ফ্রান্স। তিনবছরের এই লড়াই দুই পক্ষকেই পর্যুদস্ত করে তুলেছে। একটি যুদ্ধবিরতির জন্য জাতিসংঘের তিনটি সংস্থার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। চারমাসের লড়াইয়ের পর সরকারপন্থী বাহিনী এবং দক্ষিণাঞ্চলের সুন্নি উপজাতীয় গোত্রগুলো বিদ্রোহীদের এডেনে আসা ঠেকিয়ে দিয়েছে। ২০১৫ সালে অগাস্টে এডেনের অবতরণ করে এবং হুতিদের তাড়িয়ে দেয়। প্রেসিডেন্ট হাদি নির্বাসনে থাকলেও, তার সরকার অস্থায়ীভাবে এডেনে কার্যক্রম শুরু করে। তবে হুতিরা সানা এবং টিয়াজে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং সেখান থেকেই সৌদি আরবে মর্টার আর মিসাইল ছুড়ে মারছে। আর দুপক্ষের এই বিরোধে সুযোগ নিচ্ছে আল কায়েদা ইন দি আরব পেনিনসুলা আর ইসলামিক স্টেট গ্রুপ। তারা দক্ষিণে বেশ কিছু স্থান দখল করে নিয়েছে। ২০১৭ সালে নভেম্বরে রিয়াদে ইয়েমেনের মিসাইল পড়ার পর দেশটির চারদিকে অবরোধ জোরালো করে সৌদি আরব।

তবে জাতিসংঘ বলছে, এর ফলে দেশটিতে কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় দুর্ভিক্ষ দেখা দিচ্ছে। হুতি আর মি.সালেহ একটি জোট গঠন করলেও সেখানে এর মধ্যেই ফাটল দেখা দিয়েছে। হুতিরা পাল্টা জবাবে তার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের অভিযোগ আনে যে, তিনি এই জোটে কখনোই বিশ্বাস করতেন না।হুতিরা সানার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য অভিযান শুরু করে। ৪ ডিসেম্বর তারা ঘোষণা দেয় যে, মি. সালেহ রাজধানী থেকে পালানোর সময় নিহত হয়েছেন। এ বছর জানুয়ারিতে সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তোলার পর উত্তেজনা আরো বেড়েছে। তারা প্রধানমন্ত্রী আহমেদ বিন ডাগারের পদত্যাগও দাবি করেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এডেনের সরকারি দপ্তর আর সামরিক ঘাটিগুলোর নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে।

এই পরিস্থিতি সৌদি জোটের মধ্যেও জটিলতার তৈরি করেছে। কারণ সৌদি আরব মি. হাদিকে সমর্থন করছে, অন্যদিকে জোটের শরীক সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থন করছে বিচ্ছিন্নতা বাদীদের। দেশটির ৭৫ শতাংশ মানুষের জরুরী মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। অন্তত সোয়া কোটি মানুষের বেচে থাকার জন্য জরুরী খাদ্য সহায়তা দরকার। প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষের জানা নেই, তাদের পরবর্তী বেলার খাবার জুটবে কিনা। পাঁচ বছরের নীচের ৪ লাখ শিশু চরম অপুষ্টিতে ভুগছে, যা তাদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে। দেশটিতে স্বাস্থ্য সেবা ভেঙ্গে পড়েছে, কলেরা আর ডিপথেরিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। ইয়েমেনে যা কিছুই ঘটছে, তা যেন আঞ্চলিক দেশগুলোরই ব্যাপার। তবে দেশটি অস্থিরতার মধ্যে থাকলে তা পশ্চিমা দেশ গুলোর জন্য হামলার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে। ইয়েমেনের আল কায়েদাকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠন বলে বলছে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা গুলো। কারণ তাদের প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আছে। তবে ইয়েমেনের এই সংকটকে সৌদি আরব আর ইরানের মধ্যে আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াই হিসাবেও দেখা হচ্ছে। কৌশলগত ভাবে ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি বাব আল-মানডাবের ওপর বসে আছে, যা রেড সি আর গালফ অফ এডেনের সংযোগস্থল। এখান থেকেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের সরবরাহ হয়ে থাকে। জাতিসংঘ এবং ইয়েমেন সংকট নিরসনে যুক্ত প্রতিনিধিরা বহুবার বলেছেন, সামরিক নয় বরং সংলাপ ও রাজনৈতিক উপায়ে ইয়েমেন সংকটের অবসান ঘটবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও জোটের অনুরোধ উপেক্ষা করে ইউরোপের কয়েকটি দেশ তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ ধরে রাখার জন্য সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে মূলত ইয়েমেন সংকট নিরসনে সামরিক পন্থাকেই সমর্থন দিচ্ছে।

ব্রিটেন ছাড়াও ইউরোপের অন্যান্য অস্ত্র নির্মাণ কোম্পানিগুলোও অস্ত্র বিক্রি করে বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। কয়েকটি আরব দেশের কাছে এসব অস্ত্র বিক্রি শুধু যে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন তাই নয় একইসঙ্গে তা নীতি-নৈতিকতারও পরিপন্থী। কারণ সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর কাছে এসব অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধে সহায়তা করা হচ্ছে। ফ্রান্সের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রধান বেনেডিক্ট জেনিরো বলেছেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে এ পর্যন্ত হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে এবং ওই জোট যুদ্ধাপরাধ করেছে। তিনি বলেন, ইউরোপ যদি সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখে তাহলে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধে ইউরোপও শরীক হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পরিষদ জানিয়েছে, সামরিক উপায়ে ইয়েমেন সংকটের অবসান হবে না বরং আলোচনার মাধ্যমে টেকসই শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে। ইউরোপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইয়েমেন বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত মার্টিন গ্রিফিত্‌সও উপস্থিত ছিলেন। ইউরোপ ইয়েমেনে সংঘর্ষরত সব পক্ষের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ওই দেশটিতে মানবিক ত্রাণ পৌঁছে দেয়াসহ শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরো ভূমিকা রাখতে তারা প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র মন্ত্রীরা আরও বলেছেন, ইয়েমেনের সব পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমেই কেবল ওই দেশটিতে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাজনৈতিক উপায়ে ইয়েমেন সংকট সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করলেও ইউরোপের কোনো কোনো দেশ সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রেখেছে।

এ দেশগুলো সৌদি আরবের সঙ্গে কোটি কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র চুক্তি করায় ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক সমাজের ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। ব্রিটেন ও জার্মানি সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখায় ইয়েমেনে মানবিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। সৌদি আরব ও আমিরাতের কাছে ব্রিটেন কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি করছে আবার ইয়েমেন সংকট সমাধানে রাজনৈতিক প্রচেষ্টার প্রতিও সমর্থন দিচ্ছে যা দ্বিমুখী নীতির পরিচায়ক। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে যেসব বোমা ফেলেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পেয়েছে সেসব ব্রিটেনের তৈরি। ইয়েমেন যুদ্ধ অবসানের লক্ষে জাতিসংঘ একটি শান্তি পরিকল্পণা গ্রহণ করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে খবর এসেছে। দারিদ্রপীড়িত দেশটির বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর হামলা বন্ধের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ হয়েছে তখন জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার আওতায় ইয়েমেনের জনপ্রিয় হুথি আন্দোলনকে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সমর্পণ করতে হবে।বিনিময়ে ইয়েমেনের ওপর বোমা হামলা বন্ধ করবে সৌদি আরব এবং হুথিদেরকে অন্তবর্তীকালীন সরকারের অংশ করা হবে। ইয়েমেন বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত মার্টিন গ্রিফিথ এ খসড়া পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন বলে সংবাদ সংস্থাটি জানিয়েছে। খসড়া প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ ভারি এবং মাঝারি মানের অস্ত্র পর্যায়ক্রমে অ-রাষ্ট্রীয় কোনো সামরিক সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

এছাড়া, প্রস্তাবে এমন একটি অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে যেখানে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে। তবে প্রস্তাবিত সরকারে হুথিদের কত শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকবে সে ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলা হয় নি। হুথি আনসারুল্লাহ বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জাতিসংঘের পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ বিরতি কার্যকরের মাধ্যমেই কেবল ইয়েমেন সংকটের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে। কিন্তু ২০১১ সালে দেশটির দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহকে তার ডেপুটি আবদারাবুহ মানসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য করে। সংক্ষেপে, ইয়েমেনের পরিস্থিতি হলো, যেমনটা জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানব-সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়। গত তিনবছরে ৯ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় ৫৩ হাজার মানুষ আহত হয়েছে। এদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন বসতি আর আরব বিশ্বের সবচেয়ে গরীব দেশ ইয়েমেন। গৃহযুদ্ধে দেশটি পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কে কার সঙ্গে লড়াই করছে? লেখক ও কলামিস্ট [email protected]

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close
close