ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬ অাপডেট : ১৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৯, ২১:৪০

প্রিন্ট

বাংলাদেশিরা বুদ্ধিমান থেকে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী জাতিতে পরিণত হবে

বাংলাদেশিরা বুদ্ধিমান থেকে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী  জাতিতে পরিণত হবে
ডা. সাঈদ এনাম

ইউরোপিয়ান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন এর সেমিনারে গিয়েছিলাম ইউরোপ। আমার প্রেজেন্টেশন ছিলো। পাঁচদিন ব্যাপি সায়েন্টিফিক সেমিনারে ইউরোপসহ সারা বিশ্বের কয়েক হাজার সাইকিয়াট্রিস্ট ছিলেন। গল্পগুজব, আড্ডা কথাবার্তার এক পর্যায়ে তারা অনেকেই বললেন, যতদুর দেখেছি, যে কয় জনের সাথে মিশেছি, আমাদের কাছে মনে হয়েছে বাংলাদেশিরা জেনেটিক্যালি মেধাবী, বন্ধুবৎসল। বিষয়টি ভেবেছিলাম নেহায়েত আমাকে খুশি করার জন্যেই বলছে।

এক মাস পর ফের গেলাম ক্যালিফোর্নিয়াতে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন এর সেমিনারে। সেখানে বিশাল আয়োজন, ইউরোপিয়ান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন এর চেয়ে তিনগুন বেশি সাইকিয়াট্রিস্ট এর মিলন। সেখানেও আমি আমার সাবজেক্ট এর স্পিকার প্রেজেন্টার।

অবসরে গল্প আড্ডার এক পর্যায়ে তারাও একই কথা বললেন। বাংলাদেশি যে কয়েকজনের সাথে তাদের মেশার সুযোগ হয়েছে, যাদেরকে খুব কাছ থেকে তারা দেখেছেন মিশেছেন, তাদেরকে তুলনামূলক মেধাবী, বুদ্ধিমান মনে হয়েছে, এবং সেটাও তাদের মতে জেনেটিক্যালি।

বিষয়টি এবার একটু আমলে নিলাম । এ নিয়ে একটু গভীর আলাপের দিকে গেলাম তাদের সাথে। ‘হোয়াই এন্ড হাউ’।

কনক্লুশনটা টা দাঁড়ালো বাংলাদেশিদের ফুড হেভিট। রান্নার স্টাইল। আমাকে কাছে পেয়ে উৎসুক হয়ে তারা বাংলাদেশিদের খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যাপারটা আরো কিছু জেনে নিলো। আমি বললাম, ‘আমরা সাধারণত মা বা স্ত্রীর হাতের রান্না খাই আজীবন। তারা অত্যন্ত যত্ন সহকারে খাবার তৈরি করেন এবং টেবিলে পাড়েন। ধোয়া মুছা থেকে শুরু করে ডায়নিং টেবিল পর্যন্ত থাকে তাদের ভালোবাসা আর মমতার ছোঁয়া। রেস্ট্রুরেন্ট আমরা তেমন একটা খাইনা। অফিসে গেলে বাসা থেকেই টিফিন নিয়ে যাই’।

আমাদের বেশির ভাগ অফিসারদের মা, স্ত্রী, কিংবা বোন হাউজ ওয়াইফ। তাদের সময় কাটে পরিবারের সুস্বাস্থ্যের কথা ভেবে ভেবে। অনেক মায়েরা বা স্ত্রীরা আছেন যারা নিজে বাজারে গিয়ে পরিবারের জন্যে ভালো কিছু একটা কিনে আনেন। এমন মমত্ববোধ বিরল।

আমার কথা তাদের অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকলো। এসব শুনে অনেকের চোখের কোনে জলে চিক চিক করলো। আমাদের মতো পরিবার প্রথা ইউরোপ আমেরিকান কালচারে নেই। একেবারে নেই বললে ভুল হবে কিছু সম্ভ্রান্ত পরিবারে এখনো আছে।

অফিসিওদের বেশির ভাগ হোটেল রেস্তোরাঁয় খান আর রাতে বাসায় গিয়ে নিজে ইলেক্ট্রনিক মেশিনে ঝটপট পাকিয়ে নেন। কোনমতে খাবার টা সেরে নেন। আমাদের মতো সবাইকে নিয়ে ডায়নিং টেবিলে বসে আয়েশ করে খাওয়া তাদের স্বভাবে নেই। এমন কি স্বামী, স্ত্রী, এডাল্ট বাচ্চা কাচ্চা রেস্তোরাঁর গেলেও সবাই নিজ নিজ মতো অর্ডার দেয়, নিজ নিজ বিল দেন।

এক আমারিকান কলিগ একটা গল্প পাড়লো। রেস্টুরেন্টে বাবা, মা আর ছেলে গেছেন পিজা খেতে। একই টেবিলে বসা তিনজন। পিজা অর্ডার হলো দুটো। মা বাবা দুজনে আয়েশ করে খেয়ে উঠলেন। ছেলে খেলো না, এদিক ওদিক তাকিয়ে রইলো। মা একবার জিগ্যেস করছিলো, 'ইউ...?' ছেলে বললো, 'নো মাম..ইটস ওকে'।

আমি গল্পটা বুঝলাম না। বললাম বিষয়টা কি? আমেরিকান সহকর্মী বললেন, সাঈদ, এখানে রেস্ট্রুরেন্টে যে যার সাধ্যমতো ওর্ডার দেয়, খায় যে যার বিল দেয়। হোস্টিং বা শেয়ারিং সিস্টেম নাই, ছোট বেলা থেকেই নাই। ছেলে এডাল্ট, সুতরাং তার সাধ্যমতো ওর্ডার সে করবে, তার বিল সে দেবে। সেদিন ছেলের কাছে পয়সা ছিলো তাই সে ওর্ডার করেনি। হোক না সাথে মা বাবা। সো হোয়াট।

আমি বললাম, মা,বাবা বিষয়টা বুঝেছে..? ছেলের পয়সা নেই তাই খাচ্ছে না?’ তিনি বললেন, ‘হ্যা। কিন্তু কিছুই করার নেই। সিস্টেমটাই ওরকম। উল্টোটাও হয়। ছেলের পয়সা আছে খাবে, মা বাবার কাছে নেই, খাবেনা। বসে থাকবে। ইটস নরমাল হিয়ার...’

যাহোক যে কথায় ছিলাম বাংলাদেশিরা বুদ্ধিমান কেনো এ নিয়ে, এবং এটা এ অঞ্চলের ফুড হেবিটের জন্যে এসব আলোচনায়। বাংলাদেশিরা মাছ খায় বেশি। নোনা ও মিঠা সব পানির মাছ পাওয়াও যায় বেশি। তাজা মাছ। মাছের তেলের পুষ্টিগুন ব্রেইনের গঠনের জন্যে খুবই ভালো।

তবে আমাদের ভবিষ্যত খুব একটা ভালো না৷ ইদানিং যেভাবে ব্যবসায়ীরা মাছ, মাংস, ফলমুল, তৈল, সবজিতে ভেজাল ও বিষাক্ত ক্যামিকেল দিচ্ছে তাতে আগামী পঞ্চাশ বা একশো বছরে এদেশের ঘরে ঘরে দুইটা বা তিনটা বাচ্চা প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেবে। বুদ্ধিমান জাতি থেকে পরিণত হব সুবিশাল বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এক জাতিতে।

ভেজাল ব্যবসায়ী সমাজের এসব কুলাংগারদের লাগাম এখনই টেনে ধরা উচিত। এদেরকে কঠিন শাস্তির আওতায় (ফায়ারিং স্কোয়াড) আনা উচিত, তা সে যত টপ লেভেলের ব্যবসায়ী হোক। এসব কুলাংগাররা একটা জাতিকে সুকৌশলে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

লেখক:

সাইকিয়াট্রিস্ট

মেম্বার, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন

মেম্বার, ইউরোপিয়ান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন

লাইফ মেম্বার, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন ওব সাইকিয়াট্রিস্ট।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close