ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬ আপডেট : ৪৭ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০১৯, ২১:৫৫

প্রিন্ট

বন্ধু, বন্ধুহীন করো না আমায়

বন্ধু, বন্ধুহীন করো না আমায়
জব্বার আল নাঈম

বাঙালি জাতির প্রাণের কবি ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘বন্ধুত্ব বলিতে তিনটি পদার্থ বুঝায়। দুইজন ব্যক্তি ও একটি জগত। অর্থাৎ দুই জনে সহযোগী হইয়া জগতের কাজ সম্পন্ন করা। আর, প্রেম, বলিলে দুই জন ব্যক্তি মাত্র বুঝায়, আর জগত নাই। দুই জনেই দুই জনের জগত।’

বন্ধুকে অনেকে প্রেমের সঙ্গে অথবা ভালোবাসার সঙ্গে এক করে ফেলেন। বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ইহা ছাড়া আর একটা কথা আছে প্রেম মন্দির ও বন্ধুত্ব বাসস্থান। মন্দির হইতে যখন দেবতা চলিয়া যায় তখন সে আর বাসস্থানের কাজে লাগিতে পারে না, কিন্তু বাসস্থানে দেবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।’

বাস্তবিক অর্থে, একেক বন্ধু আমাদের মধ্যে একেকটা দুনিয়ার প্রতিফলন ঘটায়। বন্ধু এমন একজন যার কাছে মনের কথা খুলে বলা যায় অবলীলায়, বিনা সংকোচে। এ কারণে বাবা-মা তাঁর সন্তানের কাছে ভালো বন্ধু হয়ে উঠতে পারে। এটি খুবই জরুরি। অভিভাবক যখন বন্ধু হয়ে ওঠে তখন মানসিক বিপর্যয় ঘটলে অভিভাবক সবার আগে এগিয়ে আসতে পারেন।

কলকাতার প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার, অভিনেতা ও শিল্পী অঞ্জন দত্ত কিছুদিন পূর্বে ঢাকার বেইলি রোডে মহিলা সমিতির মিলনায়তনে ‘সেলসম্যানের সংসার’ বইটির মোড়ক উন্মোচন ও ‘অঞ্জন যাত্রা’র মঞ্চনাটকের প্রশ্নপর্বের একপর্যায়ে বাবা ও ছেলের বন্ধুত্বের কথার প্রেক্ষাপটে বলেছেন, আমার ছেলের সঙ্গে আমার খুবই ভালো বন্ধুত্ব। একটি ঘটনা বললে আরো পরিষ্কার হবেন। একই মেয়ের সঙ্গে আমি ও আমার ছেলে কথা বলতে পারি। আমাদের কোনো সমস্যা হয় না।এর মানে এই নয় যে ছেলে কথা বলবে আমি জানব না। কিংবা আমি কথা বলব ছেলে জানবে না। দু জনেই বিষয়টি ভালোভাবে জানি। এই গল্প দ্বারা ছেলের সঙ্গে পিতার এবং পিতার সঙ্গে ছেলের সুসম্পর্কের কথা বুঝাতে চেয়েছেন অঞ্জন দত্ত। আধুনিক সমাজ মাঠে বাবা-মায়ের সঙ্গে ছেলেমেয়ের গভীর সম্পর্কের কথা তুলনামূলক কমা শোনা যায়। ফলে যে কোনো সমস্যার সমাধান করা সম্ভবও হয়ে উঠে না।

শাহরুখ খান বলেছেন, আমার মেয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুর মতো সম্পর্ক। আমির খানও তাই বলেছেন। অমিতাভ বচ্চন পুত্রবধূ জয়াবচ্চনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। এতে করে বোঝাপড়ার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ঝামেলা কিছুটা হলেও কমে। এছাড়াও অনেক বিখ্যাত বন্ধুদের কথাও জানি, শচীন টেন্ডুলকার ও বিনোদ কাম্বলী এইখানে উদাহরণ। বন্ধুত্ব কোনো সীমানা মানে না। বর্ডার টপকে অনেক দূরে গিয়ে উড়ে। বন্ধু শব্দের ব্যঞ্জনা দৃশ্য-অদৃশ্য অনুভব‚তিকে আশ্চর্যজনকভাবে স্পর্শ করে।বন্ধু শব্দের পরিভাষা হৃদয়ের গহীনে হাত বাড়ায়। বন্ধুর ছোঁয়ায় পাল্টে যায় বন্ধুর জীবনের চলার পথ, সুর ও ছন্দ। বন্ধু ছাড়া জীবন অচল ও অসাড়। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ‘বন্ধুত্ব’ নামক বন্ধন মাথায় উপর ছায়ার মতো আশ্রয় ও আশ্রম। এই বন্ধু কারা? কারা মানব জীবনকে ধন্য করে বন্ধু হয়ে আসে। যে কেউ যে কারো জীবনের পরম বন্ধু হতে পারে। এর জন্য পরীক্ষা দিয়ে আলাদা কোনো যোগ্যতা কিংবা ডিগ্রী অর্জন করতে হয় না। সন্তানের প্রাথমিক জীবনে মা-বাবা হল পরমতম বন্ধু। এ বন্ধন শৈশব, কৈশোর কিংবা যৌবনে যে থাকে না এমনটা নয়। বরং আরো বেশি প্রগাঢ় হয়। বিশ্বাসের জায়গাটা সচেতন অবচেতন কিংবা অসচেতনভাবেই বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বড়ো হতে হতে মানুষের পরিধিও বাড়ে। বাড়তে থাকে সম্পর্কেও ডালপালা।

পৃথিবীতে পারিবারিক বন্ধনের পরই বন্ধুত্বের সু-মহান মর্যাদার স্থান। বন্ধুত্বের কোনো ক্লাস বা শ্রেণী নেই। রোগী অসুস্থ হওয়ার পর সবচেয়ে কাছের ভাবে একজন ডাক্তারকে। বলতেও দেখাতে থাকে মনের এবং শরীরের সকল গোপনীয়তা। সন্তান যে কথা বাবা- মায়ের সঙ্গে শেয়ার করতে সংকোচে ভোগেÑ নির্ধিদ্বায় তা বন্ধুর কাছে জমা রাখে।বন্ধুত্বের লেভেলও কখনো কখনো পাল্টে যায় পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে। আবার দেখা যায় গরীব কৃষকের সঙ্গে আমলার। কিশোরের সঙ্গে নব্বই বছরের বৃদ্ধার। সম কিংবা অসম বয়সীর সঙ্গেও বন্ধুত্ব হয়। তবে, সম্পর্কটা বেশি গাঢ় হয় সমবয়সীর সঙ্গে।

বন্ধুত্বের অনেকগুলো স্টেজ অতিক্রম করার পর একজন প্রকৃত বন্ধুর খোঁজ মিলে। একজন প্রকৃত বন্ধু সর্বোচ্চ উপকারের পাশাপাশি সুনাম ও সম্মান বয়ে আনে। বিপদে-আপদে বুক আগলে সামনে দাঁড়ায়। এই যে বন্ধুকে পরম ভাবা তারও কিন্তু অনেক কারণ রয়েছে। একজন প্রকৃত বন্ধু জীবনে অনেক বড়সম্পদ। যে কোনো বিপদে-আপদে ছায়ার মতো আঁকড়ে থাকবে।

একজন সাধারণ মানুষকে চলার জন্য আরেকজন সাধারণ মানুষের বন্ধুত্বের প্রয়োজন। একজন ওয়ার্ড মেম্বার আরেকজন ওয়ার্ড মেম্বারের প্রয়োজনবোধ করেন। তেমনিভাবে একজন চেয়ারম্যান আরেকজন চেয়ারম্যানের। একজন সাংসদ আরেকজন সাংসদের। একজন মন্ত্রী আরেকজন মন্ত্রীর বন্ধুত্ব কামনা করেন। একজন প্রধানমন্ত্রীও আরেকজন প্রধানমন্ত্রীর বন্ধুত্ব কামনা করেন। হ্যাঁ একজন প্রধানমন্ত্রী আরেকজন প্রধানমন্ত্রীর বন্ধুত্ব কামনা করেন। বাংলাদেশ এই জায়গায় কিছুটা পিছিয়ে। বাংলাদেশের বন্ধু আছে না থাকার মতো। প্রকটাভাব দেখা গেছে মায়ানমার সেনাবাহিনী যখন রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেয় তখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন সত্যিকারের বন্ধুর অনুভব করেছে। সেখানে আমরা প্রায় বন্ধুহীন একটি দেশ। বিনা দ্বিধায় এ কথা বলা যায়, এভাবে একটি রাষ্ট্র চলতে গিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। এর জন্য প্রয়োজন বেসিক কিছু সম্পর্কের শর্তাবলী। যদিও বন্ধুত্বের মাঝে কোনো শর্তাবলীর দরকার নেই। আমাদের বিশ্বাস বাংলাদেশ বন্ধু রাষ্ট্র পাবে।বর্তমান অনেকের মধ্যে নির্মল বন্ধুতা লক্ষ করা যায়। আজও বন্ধুত্বের উচ্ছ্বল-উজ্জ্বল রূপ চারপাশের বাতাসকে নির্মল করে অনেকখানি।

আমেরিকা এবং রাশিয়া দুই পরাশক্তি। তারা পৃথিবীকে দুইভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। রাশিয়ার বন্ধুরাষ্ট্র কম নয়। সেই তালিকায় আছে চীন। যারা আজকের আরেক মহাশক্তিধর রাষ্ট্র। ২০৩০ সালের মধ্যে মহাপরাশত্তি হিসেবে তাদের আবির্ভাব অবিশ্বাস্য নয়। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার উপদেষ্টা পরামর্শকও রাশিয়া। ইরানের সবচেয়ে নিকটতম মিত্রশক্তি রাশিয়া ও চীন। বন্ধুত্বের বন্ধনে জড়িয়ে রেখেছে সিরিয়া ও ইয়েমেন। রাশিয়া তাদের মাথায় উপর সুশীতল ছায়া হিসেবে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিনা দ্বিধায়। আমি খুঁজে খুঁজে হয়রান সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি বন্ধু ও স্বজন রাষ্ট্র প্রয়োজন। বন্ধুত্বের হাত পাশে থাকলে বাংলাদেশ সদর্পে আরো সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। এই মুহূর্তে ইন্টারনাল উন্নতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে বন্ধুত্ব স্থাপনের ক্ষেত্রেও এগিয়ে আসতে হবে।

আগস্টের প্রথম রোববার বিশ্ব বন্ধু দিবস। এই দিন সবাই একে অন্যকে কার্ড, ম্যাসেজ ও সরাসরি বন্ধুত্বের ভাষা প্রকাশ করে আসছে অনেক আগে থেকেই। তবে এই বিশ্ব বন্ধুত্ব দিবস হলমার্ক কার্ডের প্রতিষ্ঠাতা জয়েস হল দ্বারা উন্নীত হয়েছিল ১৯১৯ সালে। কিন্তু, বন্ধু দিবসের ইতিহাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু। ১৯৩৫ সালে, মার্কিন কংগ্রেস ঘোষণা করেন, আগস্ট মাসের প্রতি প্রথম রোববার বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে পালিত হবে। সেই থেকে বন্ধুত্ব দিবস হয় জাতীয় উদযাপিত দিনগুলোর মধ্যে একটি।

বিশ্ব বন্ধুত্ব দিবস ধারণাটি ১৯৫৮ সালের ২০ জুলাই প্যারাগুয়ের ডঃ আর্তেমিও ব্রেঞ্চো দ্বারা প্রস্তাবিত হয়। যখন তিনি তার বন্ধুদের সাথে নদীর তীরে শহর পুয়ের্তো পিনাসকোতে ডিনার করছিলেন। প্রথম বিশ্ব বন্ধুত্ব দিবস ৩০ জুলাই করার জন্য প্রস্তাবিত হয়ে ছিল ১৯৫৮ সালে। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘ বিশ্বময় বন্ধুত্বের আলাদা অবস্থানে নিজেদের নিয়ে যায়। ২৭ এপ্রিল ২০১১ জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ঘোষিত হয় ৩০ জুলাই অফিসিয়ালি বিশ্ব বন্ধু দিবস। তবে ভারত, বাংলাদেশসহ কিছু দেশে আগস্টের প্রথম রোববার বন্ধুত্ব দিবস উদযাপন করে।উপমহাদেশে সর্বপ্রথম ভারতে এই দিবসের প্রচলন শুরু। পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকের দিকে বাংলাদেশেও বন্ধু দিবস পালন করা শুরু হয় ব্যাপকভাবে। কেউ কেউ বলেছেন, ১৯৩৫ সালে আমেরিকান সরকার আগস্টের প্রথম শনিবার এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। প্রতিবাদে ও শোকে পরের দিন ওই ব্যক্তির এক নিকট বন্ধু আত্মহত্যা করেন। এরপরই বন্ধুদের ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানানোর জন্য আমেরিকান কংগ্রেসে ১৯৩৫ সালে আগস্টের প্রথম রোববারকে বন্ধু দিবস ফ্রেন্ডশীপ ডে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

আজকের এই দিনে একটাই কামনা পৃথিবীর সব বন্ধুরা শুভ, সুন্দর ও অনেক আনন্দে থাকুক। প্রতিদিন হোক বন্ধুত্বের। কারো যেন কোনোদিন কষ্টের খবর আর না আসে। শুভ বন্ধু দিবস সবাইকে।

কবি ও কলামিস্ট

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
close
close