ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি ২০২১, ৭ মাঘ ১৪২৭ আপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২১, ২১:২৪

প্রিন্ট

বরাহের শীৎকার বিবেকের চিৎকার

বরাহের শীৎকার বিবেকের চিৎকার
ছবি: সংগৃহীত

রাজীব কুমার দাশ

যাত্রাপালা আমায় বেশ টানে। প্রাইমারি-হাইস্কুল বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করে যাত্রা মৌসুমে আমাদের খামারবাড়ি চলে যেতাম। যা এখন খাগড়াছড়ি জেলা, মানিকছড়ি থানার তিনটহরী গ্রাম। পুরো শীত মৌসুমে শখের বশে ধান, রবিশস্য, আখমাড়ানো, গুড় তৈরি, পাশের পাহাড়ের খালে মাছধরা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মারমা সম্প্রদায়ের বাড়িতে পিকনিক নিমন্ত্রণ খেয়ে বেশ আমুদে অফুরন্ত শৈশব ভোগ করে মাসখানেক মারমা রাজবাড়ীতে যাত্রাপালা দেখেছি।

প্রতিদিনই দেখতে চেয়েছি, কিন্তু কাউকে বলার সাহস হারিয়ে আমার অক্ষম অদম্য ইচ্ছেগুলো যাত্রার পা-পা-পো-পো করুণ সানাই সুরের বিলাপ, বিবেক পালার করুণ আর্তনাদে হারিয়ে গেছে। যাত্রা শিল্পীদের রংবেরঙ সঙ, ওরা কী করে! কী খায়! কোথায় থাকে! ওদের দেশ! ইস্ ওদের দেশে যদি যেতে পারতাম! কী মজা হতো। শিশু মনের গোপন কৌতূহল খেদ নিয়ে রাতে স্বপ্নের যাত্রাদেশে পাড়ি জমিয়ে সকালে ঘুমের ঘোরে রাজা উজির জল্লাদ প্রজা বিবেকের কান্না, বনবাস, রাজদ্রোহীর প্রাণদণ্ড দেখে চিৎকার করে রূপবানের গলায় বলেছি ‘শোন শোন শোন,,,শোন গো, ও জল্লাদ মারিও না চাঁদ সুন্দরীর সোয়ামি’রে,,,!

জল্লাদ ভাই আমার গান শুনে মনে দয়া নিয়ে রাজার কাছে নালিশ নিয়ে বলেন জাঁহাপনা! এ জীবনে আপনার রাজদণ্ডে হাজার হাজার রাজবন্দী কতল করেছি হাত কাঁপেনি! কিন্তু অবুঝ বালকের কান্না শুনে আপনার রাজ্যের রাজখাজনা প্রতিবাদী কৃষক জীবনকে কতল করতে পারিনি। যার পরমা সুন্দরী বউ চাঁদ সুন্দরীকে আপনি রাজবেশ্যা বানিয়েছেন। রাজা দেরি না করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করেন। জল্লাদ যে মাত্র আমাকে কতল করবেন! আমার ভয়ার্ত চিৎকারে আমার মা এসে দেখেন আমার গলা শুকিয়ে গেছে।

পুলিশ জীবনে যাত্রাদলের মালিক ম্যানেজার, নায়ক-নায়িকা নৃত্যশিল্পী খলনায়ক সব দেখে নিজে প্রতিমুহূর্তে গ্রন্থিক হয়ে নাম দিয়েছি ‘তবুও আমি সতী জীবনপতি যাত্রাদল’। সৎ সতী হয়ে সবারই প্রতিদিনের জীবনযাত্রা শুরু। সারাজীবন হট বেলি ড্যান্স ক্লাব মালিক, ড্যান্সার যখন প্রতিদিন বাসায় ফিরে সোসাইটি বাসর করেন; তাদের মুখে যাত্রার উদ্দাম নর্তকীদের মতো চটচটে গাঢ় লাল লিপস্টিক মেখে বলতে শোনা যায়, ‘আমার জীবনের প্রথম রাত’ তবুও আমি সৎ-সতী। সোসাইটি গার্ল-জিগালো পুরুষ কখনোই তাদের ভার্জিনিটি নষ্ট করেন না। তারা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সমুদ্রমন্থনের অমৃতসুধা পানের আশায় সঙ্গমমন্থন চালিয়ে যান। আগে সঙ্গমমন্থন নির্দিষ্ট এলাকা সংস্কৃতি থাকলে ও কালের বৈতরণী পাড়ি দিয়ে এখন দিকে দিকে সবদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সঙ্গমমন্থনের ভীষণ সুখে এখন সবাই শিহরিত পুলকিত।

জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউজিন ম্যাকার্থি তাঁর প্রবন্ধে দাবি করেন, মানুষ আসলে শুয়োর ও বাঁদরের সংকর। অন্যদল ইউজিনের এ দাবিকে সভ্যতার সঙ্কট হিসেবে দেখছেন। মানবজাতির রহস্যঘেরা দুর্বোধ্য প্রাচীর বলে কিছু নেই। সব প্রাচীরই হলো ধান্ধা প্রাচীর! বার বার ওদিকে এদিকে এলোমেলো করে লুটেপুটে- চেটে খেয়ে নেয়ার ধান্ধা তদ্বির। আদিম যুগ হতে একবিংশ শতাব্দীর আনলিমিটেড সামন্তপ্রভু!

সবাই বিবেকের তাড়না-ভাবনা নিয়ে হা পিত্যেশ করেন! কখনো দান-প্রতিদান দেন, যাত্রাদলের রাজা হয়ে সর্বোচ্চ কেড়ে নিয়ে সুন্দরী স্ত্রী-কন্যা রাজবেশ্যা করে ভাগিয়ে নেন। অবাধ্য হলে জল্লাদের হাতে তুলে দিয়ে আমাদের মতো হতচ্ছাড়া দর্শকের ভীষণ সৃষ্টিসুখ-দৃষ্টি সুখ দিয়ে থাকেন। একেবারে নিখুঁত মঞ্চায়ন দেখে আমরা বিবেকের হাসি বিমানে চড়ে বিনোদিত পুলকিত শিহরিত হয়ে হারিয়ে যাই।

প্রতিদিন কেউ-কেউ বিবেকের কষ্টে প্রায় দিগম্বর হয়ে কাঁদছে, কাঁপছে! বানরের মতো নেচে গেয়ে দিনদুপুর সবার সামনে ‘বিবেক হ্যাজাক বাতি’ জ্বালিয়ে পরিবার সমাজ স্বদেশ যাত্রামঞ্চে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। কিন্তু সে রাজবাড়ির যাত্রাপালার মতো বিবেকের করুণ আর্তনাদ সুরে-স্বরে কারোর সহানুভূতি কান্না দূরে থাক! বিবেক চরিত্র কখন তাড়াতাড়ি শেষ করে মাংসল নিতম্ব পীনোন্নত বক্ষে উদ্দাম নর্তকী প্রিন্সেস জরিনা সর্বাঙ্গ দিগম্বর ড্যান্স কামোদ্দীপক শিহরণে পুংদণ্ডের বারোটা বাজিয়ে দিবেন, সে ভরসা নিয়ে সমাজের সব বয়সের দর্শক শিস অপমানে দুর-দুর করে বিবেক তাড়িয়ে ড্যান্স শেষে বিবেক মরেছে-না বেঁচে আছে! কৃতঘ্ন দর্শকের জানার প্রয়োজনে পথ মাড়ানো হয়নি।

আজ রাজবাড়ীর যাত্রার শেষ দিন। বৃহত্তর ফরিদপুর, যশোর, বরিশাল হতে এসে যাত্রাবহর পরম আতিথেয়তা নিয়ে মাসখানেক বেশ আমুদে সময় পার করেছে। আমি বেশ বায়না ধরে নির্ঘুম রাত পার করছি। পরনে লুঙ্গি, গায়ে শীতের চাদর। খড়ের বিছানায় শিশু- কিশোর অপরাধীর মতো সুযোগ পেয়ে বিভিন্ন বয়সী নারীর পাশে পায়ের স্যান্ডেলের উপর পদ্মাসনে বসে আমার হৃদয়গ্রাহী সানাইয়ের পো-পো সুরের অপেক্ষা করছি।

কিশোর বয়স পার করছি,,, এ বয়সটা একজন কিশোরের পক্ষে বেশ বিব্রতকর। না শিশু না যুবক! রাজবাড়ীর খোলা নাচখানা যাত্রামঞ্চের চারিদিকে প্রায় হাজার তিনেক দর্শক। মারমা চাকমা ত্রিপুরা শিশু নারীরা যাত্রামঞ্চের চারিদিকে সামনে। কিছু সেটেলার শরণার্থী, বৃহত্তর চট্টগ্রামের বাসিন্দা সুবোধ দর্শক সেজে বসে আছে। ওরা যাত্রা পেন্ডেলে বেশ ভদ্র। সাংখ্যধিক দর্শক পাহাড়ি, বাঙালি দর্শক ঝোপ বুঝেই কোপ মারতে সিদ্ধহস্ত! এরা সুযোগের অপেক্ষা করছে। হ্যাজাক বাতির আলো, সানাইয়ের করুণ সুরে বন্দনা সঙ্গীত শুরু হয়েছে। আজকের যাত্রাপালা ‘সাগরভাসা’।

দর্শকের মাঝে আমি নারী-শিশু, অশীতিপর বৃদ্ধ ছাড়া প্রায় সবাই চোলাই পাহাড়ি বিশুদ্ধ স্বচ্ছ মদে বুঁদ হয়ে আছে। রাজবাড়ীর পোষা প্রচুর বরাহের ঘোৎ ঘোৎ চিৎকার শোনা যাচ্ছে। সিগ্রেট ধোঁয়া, অপান বায়ুর দুর্গন্ধ নাক চেপে সহ্য করে সাগরভাসা যাত্রাপালা দেখছি। মাঝে মাঝে ড্যান্সার জরিনা, রূপালীর অশ্লীল নাচে দর্শকের পকেটে যা কিছু আছে,মঞ্চে সবই ছুঁড়ে ধন্য হচ্ছেন। রাত তিনটে হবে। রাজার নাতি (নাম জানি না) প্রচুর পান করে মঞ্চে এলেন, কথা বলতে পারছেন না, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। বললেন- সব ড্যান্সার আনতে হবে; উনি নাচ দেখে যাত্রাদলের পুরস্কার নির্ণয় করবেন।

যাত্রাদলের মালিক করজোড়ে কাছুমাছু করে যাত্রাপালা শেষ করার কিছুটা সময় চাইলেন। রাজার নাতি যাত্রার সরাসরি ভিলেনের মারপিটে 'সাগরভাসা' পরিচালক মঞ্চে টিকতে না পেরে দৌড়ে আমার পাশে এসে পড়েছে। কিন্তু নাছোড়বান্দা নাদুস-নুদুস ভিলেন পিছু নিয়েছে দেখে নিরাপদ বর্ম ভেবে যাত্রামঞ্চ অভিনয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। চারিদিকে দর্শক (বিশেষ করে সেটেলার) সমস্বর চিৎকার, মার! মার!! দর্শকের আক্রোশ-তাড়াতাড়ি কেনো উনি উদ্দাম নৃত্য পরিবেশন করেন না।

আমি ছেলেবেলা হতে কারোর দয়া নিয়ে নিরাপদ জীবন পেতে রাজি ছিলাম না। মারামারি করতে কেউ আগ্রহী হলে সন্ধি করিনি। আমি সে অভিজ্ঞতা ও সাহস কাজে লাগিয়ে চিন্তা করেছি এ বয়স্ক দাদুকে কী প্রকারে প্রাণে বাঁচানো যায়! এর মাঝে মঞ্চে ড্যান্সার দিগম্বরী ড্যান্স শুরু করেছেন, সুর ঝংকার, উন্মাদনা নিয়ে সবাই লাফাচ্ছে। যাত্রার দাদু আমার হাত ধরে বসে আছেন।

সকাল হতে এখনো কিছুটা সময় বাকি। সাগরভাসা মঞ্চায়ন শেষের দিকে, এখনো দর্শককে প্রিন্সেস জরিনার বেলি ড্যান্স লোভের ফাঁদে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখা হয়েছে। অরুণিমা ভোর শুরু, যাত্রা বিবেক কেঁদে কেঁদে গান ধরেছে' ওরে মন,,, মন রে,,, আমার! ও তুই খালি হাতে এসেছিলে,,,যাবি খালি হাতে,,,,কীসের গরব,,,,,কীসের অভিমান,,,! রাজবাড়ীর পোষা বরাহ দলে- দলে রাতের অন্ধকারে দর্শকের ত্যাগ করা সব সুখ ঘোৎ ঘোৎ করে ব্রেকফাস্ট করে নিচ্ছে। ব্রেকফাস্ট সেরে বরাহদল সঙ্গম সুখে শীৎকার শুরু করেছে! সব দর্শক যাত্রা বিবেকের চিৎকার না শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে মুচকি হেসে বরাহের শীৎকার সুখ ভাগাভাগি করছে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কবি ও পুলিশ পরিদর্শক। বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত