ঢাকা, বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২১, ১৫:৪৭

প্রিন্ট

‘বীরশ্রেষ্ঠদের’ মুছে সুবর্ণজয়ন্তী নয়

‘বীরশ্রেষ্ঠদের’ মুছে সুবর্ণজয়ন্তী নয়
সংগৃহীত ছবি

মোস্তফা কামাল পাশা

আমিনুল করিম জাহাঙ্গীর। এক বীরশ্রেষ্ঠ এর নাম। না, মুক্তিযুদ্ধের নয়, দেশি হানাদারদের পুঁতে রাখা বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক সুবাস ছিনিয়ে আনার দুর্দমনীয় সাহসী বীরশ্রেষ্ঠ আমিন। অসম যুদ্ধে স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক উগ্র জঙ্গি ডালকুত্তাদের হামলার মুখে দুর্দান্ত লড়াই দিয়ে শহীদ হয় বীরশ্রেষ্ঠ আমিন। ৩৩ বছর আগে আজকের এই দিনে।

এদিকে অদৃশ্য করোনা মহামারীর ভয়াল আতঙ্কে দেশ কাঁপছে। কাঁপছে পুরো পৃথিবী! মড়কের মিছিল মাঝখানে বিরতি দিয়ে আবারও রেকর্ড ভেঙে ছুটছেই! আবারও ঘরবন্দি সব মানুষ। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সব ধরনের সহায়তা নিয়ে। অন্যদিকে কট্টর ধর্মান্ধ, উগ্রবাদী এবং তাদের দেশি-বিদেশি প্রণোদনা যোগালিরা জন আতঙ্ককে পুঁজি করে ঘোলাজলে রুই-বোয়াল শিকারে নেমেছে। কোরআন-হাদিস নয়, কামিনি-কাঞ্চন বুকে ইসলাম হেফাজতের নামে এক অশ্লীল খেলা চলছে দেশে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর লগ্নে দেশের আপদকালে তোমার কথা বড় বেশি মনে পড়ছে আমিন!

আজ তোমাদের মত জানবাজ বঙ্গবন্ধু সেনাদের বড় বেশি প্রয়োজন, ভাই। তোমাদের রক্ত, ত্যাগ, নিষ্ঠা, ভয়াল বর্বর শক্তির বিরুদ্ধে টানা অসম যুদ্ধের নীট ফলাফল, বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আজ ক্ষমতায়। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে কতো সমৃদ্ধ আর সুন্দর আজ প্রিয় দেশ! দুঃখ, তুমি মুজিব, বাবর, শ্যামল,হেলাল, জমির, জসীম, বেলাল, মানিক, হারুন বশর, দিদারসহ অসংখ্য বঙ্গবন্ধু ও নেত্রীর জানবাজ যোদ্ধা আজ প্রিয় দেশের মাটিতে টানা ঘুমে!

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেও ঠিক তাই! বড় অসময়ে তোমাদের ঘুমের দেশে চালান করে দেয়, দেশবিরোধী, ধর্ম ব্যবসায়ীদের পোষা ঘাতকচক্র। কে ভাঙাবে তোমাদের ঘুম! এই ঘুম থেকে কেউতো জাগে না প্রিয় ভাই! তোমাদের যারা আধুনিক মারণাস্ত্র ও দানব শক্তির জোরে জবরদস্তি ঘুম পাড়িয়েছে, তাদের কেউ কেউ এখন ক্ষমতাবলয়েও! বিশ্বাস হয়? জানি করবে না। কিন্তু এটাই নিষ্ঠুর বাস্তব ভাই।

আমিনুল করিম জাহাঙ্গীর তোমরাও খাঁটি বীরশ্রেষ্ঠ ভাই! তরতাজা মেধাবী তরুণ তুমি! এখনো তোমার কিশোরসূলভ মায়াবী-মিষ্টি মুখটি বুকের অ্যালবামে জ্বলজ্বল করে আলো ছড়ায়। হায়, আজই তোমার শাহাদাত বার্ষিকী! রক্তলাল ৬ এপ্রিল! আশি দশকের শুরু থেকে এরশাদশাহীর প্রশ্রয়ে কুখ্যাত নাসিরের নেতৃত্বে শিবিরের ক্যাডারবাহিনী পুরো উত্তর চট্টগ্রামকে খুন, লুঠ অপহরণ, হামলা, চাঁদাবাজির চারণভূমি বানিয়ে রাখে। তাদের মূল টার্গেট ছাত্রলীগ তথা আওয়ামী লীগ ঘরানার প্রতিটি পরিবার। তখনকার শিবির বর্বরতার ভয়াল চিত্র আজকের মুক্ত দিনে আঁকা অসম্ভব। কী সব দুঃসহ দিন-রাত আমাদের পার করতে হয়েছে, পেছন ফিরলেই শিরদাঁড়ায় আতঙ্কের হিমপ্রবাহ এখনও স্থির করে দেয়! প্রতিদিনই পড়ছে লাশ, হামলা, অপহরণ, লুঠ, গুম চাঁদাবাজি! এত বর্বরতার মাঝেও আমিন, শাহনেওয়াজ, শাহজাহান, শওকত, সেলিম, সেকান্দর, খোরশেদ মানিক, শরীফ বাবু, জসীম, রব্বান মিলনের মত অসম সাহসী ছাত্রলীগ নেতারা নাজির হাট ডিগ্রি কলেজসহ এলাকার ছাত্র রাজনীতিতে গণমানুষের সহযোগিতায় প্রতিরোধের বারুদ ছড়িয়ে দেয়।

আমরা সহায়ক শক্তি। নাজির হাট কলেজ ছাত্র সংসদে আমিনুল করিম জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের প্যানেল বিপুল ভোটে জয় পায়। আমিন ভি পি নির্বাচিত হয়। জাপা ও জাসদ ছাত্রলীগের সহযোগিতাপুষ্ঠ শিবির প্যানেলের বিপুল ভরাডুবি হয়।

পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে ৬ এপ্রিল ‘৮৮ সালে স্টেনগান, কাটা রাইফেল, বন্দুকসহ বিপুল বোমা, কিরিচ, চাপাতি নিয়ে শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডারেরা পুরো কলেজ ক্যাম্পাস ঘিরে ক্লাস চলাকালীন ছাত্র লীগের উপর আকস্মিকভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হামলার জবাবে আমিন, শাহনেওয়াজ, শাহজাহান, শওকত, সেলিম, জসীম, রব্বানেরা সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু আধুনিক মারণাস্ত্রের সামনে অসম প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। এক পর্যায়ে আমিন শিবির ক্যাডারদের ঘেরাওয়ে পড়ে যায়। তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে খুন করে ঘাতকেরা। আহত শাহনেওয়াজ, শওকত, সেলিমরা কিছু ছাত্রলীগ কর্মীসহ তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে আরো গুরুতর জখম হয়। অসংখ্য ছাত্রলীগ নেতাকর্মী এদিন গুলি, বোমা, কিরিচের কোপে গুরুতর জখম হয়। আমিন ঘটনাস্থলেই শহীদ হয়।

সে ভয়াল দিন আজ। নিরপরাধ, মেধাবী, তুখোড় সংগঠক সবার প্রিয়মুখ কলেজ ছাত্র সংসদ ভিপি আমিন চলে যায় না ফেরার দেশে! মা-বাবার বুক খালি করে, হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে চোখের জলে ভিজিয়ে-নোনার স্রোতে ভাসিয়ে! ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে তার অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা ছিল বিস্ময় জাগানিয়া! আমিনের অপরাধ, সে বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসেছে! অপরাধ, সে ছাত্রলীগ করতো! অপরাধ, সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে প্রাণে দিয়ে ভালবাসতো!! ওসব দিনের ভয়াল বিভীষিকা এখনো ভুলার নয়। হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজানে শিবির, এনডিপির যৌথ সশস্ত্র ঘাতকের হাতে উত্তর জেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ফখরুদ্দিন বাবর, রাউজান কলেজ ছাত্র সংসদ ভিপি মুজিব, জমিরসহ কত ছাত্র, যুবলীগ নেতা-কর্মী খুন হয়েছে! কতজন পঙ্গু হয়েছে। কতবার এসব জনপদ রক্তাক্ত হয়েছে। এ বর্বরতার কাহিনী অনেক দীর্ঘ।

এলাকার সন্তান এবং জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হিসাবে বার বার ছোট ভাইদের লাশ কাঁধে নিতে হয়েছে। তাদের বিপদে আপদে কাছে থাকতে হয়েছে। জানি না, এই তিন উপজেলার শহীদ ছাত্র-যুবলীগ নেতাদের কতটুকু মূল্যায়ন করেছে, দল বা সরকার?

কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, এদের রক্তের জোয়ারে নাও ভাসিয়েই দল আজ ক্ষমতায়। আমিন, বাবর, মুজিবদের রক্ত যদি ইতিহাসের ফসিলে মিশে যায়, শহীদের অবদান ও রক্তক্ষণ আমাদের কখনো ক্ষমা করবে না। হায় শহীদ হবার দুদিন আগেই আমিন, শাহনেওয়াজ, জসীম আমার বাড়িতে আসে। সাংগঠনিক আলোচনাসহ অনেকক্ষণ আড্ডা চলে আমাদের। মনে পড়ে, ওইদিন অনেক মজা ও হাসিঠাট্টা করেছি আমিনের সঙ্গে।

নাজির হাট কলেজে হামলার বছরের মাথায় ৫ এপ্রিল (১৯৮৯ সাল) অতর্কিত হামলা হয়, রাউজানের হলদিয়ায় মোহাম্মদ আমির হাটে বাবরদের ওপর। হামলায় তাৎক্ষণিক শহীদ হয় মুজিব। বাবর গুরুতর জখম নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে অসম যুদ্ধ চালিয়ে ১১ এপ্রিল চমেক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। এদের অবদান, ত্যাগ, আত্মদান মুজিববর্ষের কোন সঙ্কলন বা স্যূভেনিয়রে স্থান পেয়েছে কিনা জানি না! যদি না পায়, তাহলে বলতে বাধ্য, আমরা খুবই নিষ্ঠুর এবং বিস্মৃতির চোরকাদায় পথ হারানো বড়ই দুর্ভাগা জাতি।

প্রিয় ভাইটি, পরপারে ভালো থাকো তুমি এবং তোমার সাথী শহীদ সকল বীরশ্রেষ্ঠ ভাইরা! অনেক, অনেক ভাল! অনেক জানবাজ নেতাকর্মীর নাম বাদ গেছে। মনে নেই সবার নাম। সহযোগিতা চাই, সবার।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত