ঢাকা, বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ আপডেট : ৩২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৩২

প্রিন্ট

বিএনপিতে চলছে ‘তারেক’ বন্দনা!

বিএনপিতে ‘তারেক’ বন্দনা!
ফাইল ছবি
কিরণ শেখ

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিকে পাশ কাটিয়ে তারেক রহমানের বন্দনা চলছে বিএনপিতে। সম্প্রতি বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলগুলোতে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। সভাগুলোতে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে কর্মীদেরকে উজ্জীবিত করছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর তার নেতৃত্বেই আশার আলো দেখতে পাচ্ছে বিএনপি। এই নেতৃত্বই বিএনপিকে মুক্তি দেবে।

যদিও এর আগে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পরে বিএনপিতে যৌথ নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে। সেই নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে দলটি জনগণের কাছে যাচ্ছে। আর জনগণকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে খালেদা জিয়াসহ অন্য নেতাদের মুক্ত করতে গণআন্দোলন সৃষ্টি করবে দলটি।

তবে গত কয়েক দিনে বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্যের চিত্র ভিন্ন দেখা গেছে। সেখানে দলটির নেতারা শুধু তারেক রহমানের গুনগান গাইছেন।

বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, দলের বর্তমান পরিস্থিতি ও পদত্যাগের বিষয়ে তারেক রহমানের নাম জড়িত হওয়া ও সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে দলটির সিনিয়র নেতাদের তাকে নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর এ কারণেই বিএনপি মহাসচিবসহ দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য তারেক রহমানকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছেন।

শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টে অনুষ্ঠিত স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যোগে এক আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আজকে আমাদের অনেকের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। আমাদের অনেকের মধ্যে ভয়-ভীতি ও ত্রাস আছে। কিন্তু যখন তিনি (তারেক রহমান) সুদূর থেকে লালমনিরহাটের গ্রামের একজন নেতাকে ফোন করে বলছেন- কেমন আছেন, ভালো আছেন তো? সাহস হারাবেন না, আমরা সবাই আছি। তবে উনারা (আওয়ামী লীগের নেতারা) অনেকে ভাবেন, তিনি শুধু স্কাইপিতে আমাদের নেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন। কিন্তু না। তিনি প্রায়ই দেশের বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেন। এভাবে তিনি উজ্জীবিত করছেন গোটা জাতিকে। সেই কারণে বললাম, আমাদের এতো অন্ধকার, হতাশা ও নিরাশার মধ্যে আশার আলো দেখতে পাই তারেক রহমান সাহেবের নেতৃত্বের মধ্যে। সেই নেতৃত্বই আমাদেরকে মুক্তি দেবে।

এর আগে বিএনপিতে তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অসন্তোষের গুঞ্জনের মধ্যে তার প্রশংসা করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

গত ২০ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমাদের নেতা তারেক রহমান অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিএনপিকে গোছানোর কাজ প্রায় শেষ করে নিয়ে এসেছেন, নতুন প্রাণ সৃষ্টি করেছেন বিএনপির মধ্যে। এই দুঃসময়ে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে তিনি দলকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে চলছেন।

গত ২১ নভেম্বর বিএনপির উদ্যোগে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, তারেক রহমান আগামী দিনের রাষ্ট্র নায়কের ভূমিকা পালন করে এদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এই আশা এবং প্রত্যাশা আমাদের সবার।

বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা অত্যন্ত উঁচুমানের। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। যদিও বিএনপিতে আগে থেকেই এটা ছিল। আর আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া, এটা তারেক রহমান করেছেন। এটাকে দলের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়াটা ইতিহাসে লেখা থাকবে। আর তিনি কোনো আপোস করেন না। প্রত্যেক অঙ্গ সংগঠনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তিনি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি প্রতিদিন তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলছেন। বিদেশে থেকে এ কাজ করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু তিনি সেটা করছেন।

সম্প্রতি বিএনপি ছেড়ে আসা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খান তারেকের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের আরও এক নেতা তারেককে নিয়ে অসন্তোষ বলে দলটির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

এছাড়া বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা এবং সিলেট জেলার বিএনপির পাঁচজন প্রভাবশালী নেতা পদত্যাগ করেছেন। যদিও দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানের পদত্যাগের বিষয়টি তারা জানেন না। আর সিলেটের মেয়র ও দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আরিফুল হকসহ পাঁচজনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়নি।

তবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও জামায়াতকে নিয়ে জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতি করার কারণেই এসব নেতা পদত্যাগ করেছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে।

এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সিনিয়র নেতারা পদত্যাগ করছেন, সেটা আমরা আপনাদের কাছে জানতে পারছি। আমি এখনো জানি না।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, পদত্যাগ মানে কি পার্টি ছেড়ে দেওয়া? সরকারের জুলুম-নির্যাতন থেকে নিজেকে সেভ রাখার জন্যও তো হতে পারে। আবার যখন মনে করবে তখন তারা দলে চলে আসবেন।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, এটার প্রশ্নই আসে না। কারণ বিএনপিতে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান অপরিহার্য। আর প্রত্যাশা পূরণ না হলে এবং অভিমান করে অনেকেই চলে যান। কিন্তু যখন নিজের ভুল ধরতে পারেন তখন তারা আবার চলে আসেন।

গত ১২ নভেম্বর বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছিল। ওই বৈঠকে তারেক রহমান স্কাইপে যুক্ত হবেন বলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বৈঠকে যেতে অস্বীকৃতি জানান।

তাদের ভাষ্য, তারেক জিয়া যেসব নির্দেশনা দেন, তা মেনে নেয়া অসম্ভব। আর এ কারণে গত কয়েকদিন ধরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, আমির খসরু মাহমুদ এবং সেলিমা রহমান ছাড়া দলটির অন্যান্য স্থায়ী কমিটির সদস্যরা তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলছেন না বলে দলটির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা এই প্রতিবেদককে বলেন, দলে নিজের একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ায় তারেক রহমানের ওপর বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা ক্ষুব্ধ। তবে এ বিষয়ে কেউ সরাসরি কথা না বললেও নীরব প্রতিবাদ হিসেবে দল থেকে পদত্যাগ করছেন। আর তারা দল থেকে পদত্যাগ করে মূলত বিএনপি হাই-কমান্ডের সিদ্ধান্তকে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, বিএনপি চেয়ারপারসনের খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান তিনটি মামলায় দণ্ড নিয়ে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন এক দশক ধরে। গত বছর খালেদা কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। জরুরি অবস্থার সময় গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান তারেক। দণ্ডিত তারেক রহমানের বাংলাদেশি পাসপোর্টের মেয়াদও আর বাড়ানো হয়নি। তাই এখন তার দেশে ফেরাও অনিশ্চিত।

বাংলাদেশ জার্নাল/এইচকে/কেএস

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত