ঢাকা, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ২০ জুন ২০২০, ১০:২৭

প্রিন্ট

উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাবান নারী

উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাবান নারী
অনলাইন ডেস্ক

উত্তর কোরিয়ার দুর্বোধ্য ক্ষমতা কাঠামোতে কিম ইয়ো-জং একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের ছোট বোন। নিজের ভাই-বোনদের মধ্যে কিম তাকেই একমাত্র বন্ধু বলে মনে করেন বলে জানা যায়।

কিম ইয়ো-জং প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গণে আলোচনায় আসেন ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়া সফরে গিয়ে। সে বছর তিনি উত্তর কোরিয়ার শীতকালীন অলিম্পিক প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। উত্তর এবং দক্ষিণ কোরিয়া সেবার শীতকালীন অলিম্পক গেমসে একটি একক দল হিসেবে অংশ নিচ্ছিল। কিম ইয়ো-জং হচ্ছেন উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন কিম পরিবারের প্রথম সদস্য, যিনি দক্ষিণ কোরিয়া সফর করেন।

২০১৮ সালে উত্তর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্কে বরফ গলতে শুরু করে। এরপর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাকে তার ভাইয়ের পাশে থেকে বেশ সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখা যায়। সেবছর কিম জং-উন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ বৈঠকের সময় তখন ভাইয়ের পাশে দেখা গিয়েছিল কিম ইয়ো জংকে।

ভাইয়ের সঙ্গে তার এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোতে তার এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তাকে ২০২০ সালের এপ্রিলে আবারো আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তখন কিম জং উনকে হঠাৎ করেই কিছুদিন জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছিল না। তখন তার স্বাস্থ্য নিয়ে তখন নানা গুজব শোনা যাচ্ছিল। এমনকি কোনও কোনও সংবাদ মাধ্যমে তার মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।

তখন উত্তর কোরিয়ার আগামী নেতা হিসেবে তখন কিম ইয়ো জংয়ের নামটি আলোচিত হয়।

এর আগে ২০১৪ সালেও কিছুদিন কিম জং উনকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তখনও তার উত্তরসূরি হিসেব কিম ইয়ো-জং এর নাম শোনা গিয়েছিল। সেবারও কিছুদিন পরেই প্রকাশ্যে এসেছিলেন কিম। তখন তাকে লাঠিতে ভর করে হাঁটতে দেখা গেছে।

কিম ইয়ো জং ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতি পেয়ে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য হন। এর আগে তিনি ছিলেন উত্তর কোরিয়ার প্রচারণা ও আন্দোলন দপ্তরের ভাইস ডিরেক্টর। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ।

কিম ইয়ো জং এখনো এই দায়িত্বে আছেন এবং সেখানে তার কাজ মূলত উত্তর কোরিয়ায় তার ভাইয়ের ভাবমূর্তিকে তুলে ধরা।

তবে উত্তর কোরিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যাদেরকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে সেই তালিকায় কিম ইয়ো জংয়ের এর নামও রয়েছে।

কিম ইয়ো জং কতটা ক্ষমতাবান?

উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতা কাঠামো ঠিক কিভাবে কাজ করে সেটা বোঝা মুসকিল। কাজেই সেখানে কিম ইয়ো-জং নিজে কি ধরনের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পেরেছেন সেটা অনুমান করা আরও কঠিন।

উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন পার্টির সাধারণ সম্পাদক চু রায়ং-হের ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে বলে গুজব আছে। এ খবর সত্যি হয়ে থাকে তাহলে ধরে নিতে হবে উত্তর কোরিয়ায় তার একটা আলাদা শক্তিশালী অবস্থান আছে।

তবে বর্তমানে তিনি যেসব ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন তার সবই ভাই কিমের দ্বারা প্রাপ্ত। এতে তার নিজস্ব কোনও কারিশমা নেই। তাছাড়া এত অল্প বয়সে এমন যোগ্যতা নিজ গুণে অর্জন করাও অসম্ভব। আর বিশ্বের বেশিরভাগ রাজ পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেই এ কথা খাটে। তারা যোগ্যতায় নন, ক্ষমতায় আসেন উত্তরাধিকার সূত্রে। তবে কখনও ক্ষমতায় এলে কিম ইয়ো-ও যে তার ভাইয়ের মতো প্রতাপশালী হয়ে উঠবেন তা অনেকটাই নিশ্চিত। কিছু কিছু নমুনা ইতিমধ্যে তিনি প্রকাশ করেছেন।

সম্প্রতিক সময়ে কিম ইয়ো-জং এর উপরেই দায়িত্ব পড়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে খুবই কঠোর ভাষায় একটি বার্তা দেয়ার জন্য। দুই কোরিয়ার মধ্যকার সমস্ত বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো তাকেই দেয়া হয়েছে।

জুন মাসে কিম ইয়ো দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তের অসামরিক অঞ্চলে সৈন্য পাঠানোর হুমকি দেন। তখন তিনি আরো হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, সীমান্ত শহর কেসং এর কাছে দুই কোরিয়ার যে লিয়াজোঁ অফিসটি আছে, সেটি ধসে যাবে। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে এই অফিস থেকে উত্তর কোরিয়া নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।

এর কয়েকদিন পরেই গত ১৬ জুন সেখানে একটি বিরাট বিস্ফোরণ শোনা যায় এবং আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে দেখা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী থেকে সরকারের লোকজন নিশ্চিত করেন যে এই অফিসটি আসলে ধসিয়ে দেয়া হয়েছে। এটি নির্মাণের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় ৮০ লক্ষ ডলার খরচ দিয়েছিল।

উত্তর কোরিয়ায় কিম ডায়নেস্টি

কিম জং উনের কোন উত্তরসূরি যদি খুঁজে বের করতে হয়, তাহলে এই পরিবারের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক থাকতেই হবে, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধারণা করা হয়, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম-উনের সন্তান আছে, কিন্তু তাদের বয়স খুবই কম।

কিম ইয়ো জং যেহেতু এই পরিবারের সদস্য কাজেই তাকে শীর্ষ নেতার পদে বসানো হলে রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমে সেটা যুক্তিসংগত করা খুব সহজ হবে। কিন্তু যদি ক্ষমতা অন্য কারও হাতে যায়, সেটা কিম ইয়ো-জং এর জন্য বেশ বড় হুমকি তৈরি করতে পারে। কারণ যিনিই ক্ষমতায় আসুন, তিনি কিম ইয়ো জংকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বলে ভাববেন।

সওলের কুকমিন ইউনিভার্সিটির ফিওডর টারটিস্কি বলেন, ‘কিম পরিবারেরই অন্য কেউ যদি ক্ষমতায় না আসে, তাহলে কিম ইয়ো-জং এর জন্য ব্যাপারটা একেবারেই সহজ। হয় তাকেই সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নিতে হবে নতুবা তাকে সমস্ত ক্ষমতা এমনকি তার জীবন হারাতে হবে।’

উত্তর কোরিয়ার শাসক পরিবারে কিম ইয়ো জংয়ের অবস্থান

কিম ইয়ো জং উত্তর কোরিয়ার প্রয়াত নেতা কিম জং ইলের সবচাইতে ছোট মেয়ে। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন, আরেক ভাই কিম জং চাওল এবং কিম ইয়ো জং- এরা তিনজনই একই মায়ের গর্ভজাত সন্তান। এদের মধ্যে ক্ষমতা কাঠামোতে কিম জং চাওলের অবস্থান খুব বেশি উপরের দিকে নয়।

কিম ইয়ো জংয়ের জন্ম ১৯৮৭ সালে। বয়সে তিনি কিম জং উনের চেয়ে চার বছরের ছোট। তারা দুজনেই সুইজারল্যান্ডে এক সঙ্গে বড় হয়েছেন, সেখানেই পড়াশোনা করেছেন।

কিম ইয়ো জং কী করেন?

২০১৪ সাল থেকে কিম ইয়ো জংয়ের প্রধান কাজ তার ভাইয়ের ভাবমূর্তি রক্ষা করা। উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন পার্টির প্রোপাগান্ডা ডিপার্টমেন্টে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন তিনি। ২০১৭ সালে তাকে পলিটব্যুরোর একজন বিকল্প সদস্য পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। এ থেকে ক্ষমতা বলয়ে তার প্রভাব সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে তিনি প্রোপাগান্ডা ডিপার্টমেন্টের আগের দায়িত্বেও বহাল আছেন।

রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি তার অন্যান্য দায়িত্বও ভালোভাবে সম্পাদন করেছেন বলে মনে করা হয়।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যে হ্যানয় শীর্ষ সম্মেলন যখন ব্যর্থ হলো, তখন কিম ইয়ো জং কে পলিটব্যুরো থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। ২০২০ সালের শুরুতে তাকে আবার সেই পদে পুনর্বহাল করা হয়।

২০১৪ সালের আগে তাকে স্পটলাইটে দেখা যেত খুবই কম। একবার দেখা গিয়েছিল ২০১১ সালে, যখন তার বাবার রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যানুষ্ঠান হয়। এরপর বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে বিভিন্ন ছবিতে তাকে ভাইয়ের পাশে পাশে দেখা যায়।

এমন একটা ধারণা প্রচলিত আছে, ২০০৮ সালে যখন তাদের বাবা কিম জং ইলের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে, তখন তার উত্তরসূরী কে হবেন সেই পরিকল্পনায় ছোট মেয়ের জন্যও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ঠিক করা হয়েছিল।

তাছাড়া উত্তর কোরিয়ার নেতা কিমের ক্ষমতায় থাকা নিয়ে যতবারই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, ততবারই তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে কিম ইয়ো জংয়ের নাম সামনে এসেছে। তাই কিমের অবর্তমানে এই নারীই যে উত্তর কোরিয়ার ‘সিংহাসনে’ অধিষ্ঠিত হচ্ছেন, তা অনেকটই নিশ্চিত।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
best