ঢাকা, রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২ আশ্বিন ১৪২৭ আপডেট : ১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২০, ১৫:০৯

প্রিন্ট

বঙ্গবন্ধু তাকে খেতাব দিয়েছিলেন ‘ওস্তাদ’

বঙ্গবন্ধু তাকে খেতাব দিয়েছিলেন ‘ওস্তাদ’
নজরুল ইসলাম লিখন

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। এ বক্তব্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হলেও এখন বক্তব্য দেন মুজিব পাগল আউয়াল আলী। গত ৪৫ বছর ধরেই তিনি বক্তব্য দিয়ে আসছেন। বয়স তার ৭৫। তার কণ্ঠের তেজ এতটুকুও কমেনি। বঙ্গবন্ধুর জন্য তিনি এতই পাগল যে, সংসার পর্যন্ত ভুলে যান! নিজের নাওয়া-খাওয়ার খেয়ালও হারিয়ে ফেলেন।

চায়ের দোকান, বাজারে-বন্দরে, ক্ষেতে-খামারে, স্টেশনে তিনি যেখানেই যান সেখানেই শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য দেন। শোনান মুজিবুর রহমানের ইতিহাস। শুধু তাই নয়, কেউ যদি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করেন, তখন তিনি চটে যান। এসবই তিনি করছেন নিঃশ্বার্থভাবে। বঙ্গবন্ধুর জন্য তিনি মরতেও রাজি।

১৯৭৩ সালে ঢাকার বাসাবোতে শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তব্য শুনে তাকে ওস্তাদ খেতাব দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই লোকে তাকে ওস্তাদ মুজিব বলে ডাকে। ওই সময় শেখ মুজিবুর রহমান তাকে একটি মুজিব কোট দিয়েছিলেন। দিন আনা দিন খাওয়া আওয়াল আলীর স্বপ্ন ছিল বঙ্গবন্ধুর নামে একটি এতিমখানা করা। এখনো তিনি সে স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছেন।

আকুতি করে তিনি বলেন, 'মেজর ডালিমকে কাছে পেলে জিজ্ঞেস করতাম, আরে বেটা তুই আমার মুজিবকে ক্যান মারলি, এর পরিবর্তে আমার জীবনটা নিতি। ডালিমকে কাছে পাইলে ওর হাত দুইডা কাইটা ফালাইতাম। ও (ডামিল) আমার মুজিবের জীবন নিছে এ হাত দিয়া।'

বঙ্গবন্ধুর দেয়া মুজিব কোট এখনো তিনি স্মৃতি হিসাবে বুকে আগলে রেখেছেন। তার বেঁচে থাকার অবলম্বন এখন এই মুজিব কোটটি। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহেনা যেন দীর্ঘদিন বেচে থাকেন এবং দেশের দায়িত্ব পালন করতে পারেন তার জন্য মানুষের কাছে দোয়া চেয়ে বেড়ান।

গত ১০ আগস্ট কায়েতপাড়া ইউনিয়নের উত্তরপাড়া এলাকায় এক চায়ের দোকানে অনেক জটলা। কৌতুহল জাগলো দেখার। এগিয়ে গিয়ে দেখি এক বৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শোনাচ্ছেন সবাইকে। বক্তব্য শুনে আমিও থমকে গেলাম। তিনি বজ্রকণ্ঠে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য শোনাচ্ছেন সবাইকে। তার পরণে পাজামা-পাঞ্জাবি আর মুজিব কোট। তার নাম জিজ্ঞেস করতেই লোকজন একসুরে বলে উঠলো ওস্তাদ মুজিব।

স্থানীয়রা জানান, ওস্তাদের আর কোন কাজ নেই। তার কাজ মানুষদের শেখ মুজিবুরের বক্তব্য শোনানো। আর তার ইতিহাস বলা। কেউ যদি বঙ্গবন্ধুর নামে বদমান করে, তাহলে তার সঙ্গে আউয়াল আলীর ঝগড়া লেগে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী মোতালিব মিয়া বলেন, স্বাধীনতার সময় সে একটি টেনডেস্টার (রেডিও) কিনেছিল। যেদিন বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবর শোনে, সেদিন রেডিও আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলে।

আউয়াল আলীর বাড়ি উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের অজোপাড়াগায়ের খামারপাড়া গ্রামে। নুন আনতে পান্তা ফুরায় তার। বাবার এমন কীর্তিকলাপে ছেলেরা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। একমাত্র স্ত্রী আছেন পাগল স্বামীর মুখপানে তাকিয়ে। নাওয়া-খাওয়ার খবর থাকে না তার। সংসার আছে কি নেই, তার হিসাব নেই।

সরজমিনে খামারপাড়া ও আশপাশের এলাকা ঘুরে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক বক্তব্য শোনার পর থেকেই আউয়াল আলী বক্তব্য দেয়া শুরু করেন। এরপর আর থেমে নেই। ৭৫’ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর থেকে ওস্তাদ আওয়াল আলী পুরোপুরি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নেশা হিসাবে বেছে নেন। চায়ের দোকান, ক্ষেতে-খামারে, স্টেশনে, যেখানেই বসেন সেখানেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দেন। শোনান শেখ মুজিবুর রহমানের ইতিহাস।

বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য আর ইতিহাস তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে শুনিয়েছেন। চট্রগ্রামের লালদিঘী ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দিয়েছিলেন বলে আউয়াল আলী জানান। ধান কাটার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিক তার এলাকায় আসলেও তাদেরকে বক্তব্য ও ইতিহাস শোনান।

স্থানীয়রা জানান, সকাল হলেই তিনি গোসল সেরে জামা-কাপড় আর মুজিব কোট পরে বের হয়ে যান। সারাদিন ঘুরে-ফিরে রাতে বাড়িতে ফেরেন। মুজিব কোট ছাড়া যেন তার এক পা'ও চলে না। গত ৪৫ বছর ধরেই তিনি এ কাজ চালিয়ে আসছেন। তবুও আউয়াল আলীর মনে যেন তৃপ্তি নেই। শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার হলেই না-কি তিনি সুখী। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রচার কাজ চালিয়ে যাবেন। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের কাছে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস তুলে ধরবেন।

বাগবাড়ী এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা কামাল আহমেদ রঞ্জু বলেন, 'আমি ছোট থেকে দেখে আসছি তিনি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দিয়ে আসছেন। তাছাড়া ইতিহাসও শোনান মানুষকে।'

খিলগাও থানার বালুপাড় এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা শহিদুল্লা মিয়া জানান, ওস্তাদ আউয়াল আলী যখন-তখন শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ দেন। ভাষণ শুনতেও খারাপ না। সবাইতো দল করে লাভের আশায়। একমাত্র তাকেই দেখলাম বিনা স্বার্থে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও ইতিহাস মানুষের কাছে তুলে ধরতে।

ওস্তাদ আউয়াল আলীর স্ত্রী হাওয়া বেগম বলেন, 'কি কমু বাপ। গত ৪৫ বছর ধইরা হের পাগলামির কারণে সংসারটা শেষ অইয়া গেলোগা। খাওয়-পিন্দনের (পরার) খবর থাহে না। খালি ভাষণ আর ভাষণ লইয়া থাহে।'

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমি ছোট একটা দোহান চালাইয়া কোনমতে সংসার চালাই।'

ওস্তাদ আউয়াল আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে নিতেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, 'আমি মুজিব ছাড়া কিছুই বুঝি না। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আর হের ইতিহাস কওয়াই আমার কাম। যারা দুনিয়াত নতুন আইবো হেগো আমার মজিবরের গল্প হুনামু।'

তিনি বলেন, 'আমার টেহা অইলে মজিবরের নামে একটা এতিমখানা বানামু। এহানে গরীব মাইনষের পোলাপান লেহাপড়া কইরা আমার মজিবরের লাইগ্যা দোয়া করবো।'

তিনি কেঁদে কেঁদে বলেন, 'আমারে মুজিবুর স্যারে যে মজিব কোটটা দিয়া গেছে হেইডা নিয়া আমি বাইচা আছি। ডালিমরে পাইলে আমি জিগাইতাম, বেটা তুই এমন সোনার মানুষটারে মারলি ক্যান? হেরে না মাইরা আমারে মাইরা ফালাইতি।'

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত