ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ আপডেট : ১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২০, ১৫:২৮

প্রিন্ট

সড়ক যেনো ‘মরণফাঁদ’

সড়ক যেনো ‘মরণফাঁদ’
কুমিল্লা প্রতিনিধি

দুর্ভোগের অপর নাম ‘মরণফাঁদ’ খ্যাত ‘কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক। ১৯৪৭ সালে সড়কটি প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ৭৩ বছর ধরেই চলছে খোঁড়াখুঁড়ি সংস্কারের কাজ। বছরের পর বছর এ সড়কটির দেখভালে রয়েছেন সওজ’র পালাক্রমে একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী, কিন্তু এক দিনের জন্যও নিরাপদে-স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি যাত্রী ও মালামাল পরিবহনগুলো। গত অর্থবছরে ২৩ কোটি টাকা প্রাক্কলন ব্যয়ে সড়ক সংস্কার চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিলেও, এখনো চলছে সংস্কার কাজ।তবে সওজ’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরাতন সড়কের জন্য আর কোনো বরাদ্ধ থাকছে না।

আগামী একনেকের বৈঠকে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ফোর-লেনে সড়কটি উন্নতকরণে ৬ মাসের মধ্যে কার্যাদেশ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জানা যায়, গতবছরের জুন মাসে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ‘কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক’র কুমিল্লা ময়নামতি ক্যান্টনম্যান্ট থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া’র সরাইল উপজেলার কালামুড়া পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। উক্ত দরপত্রে ‘হাসান টেকনো বিল্ডার্স’ ও ‘মেসার্স সোহাগ এন্টার প্রাইজ’ ২৩ কোটি টাকার প্রাক্কলন ব্যয় হিসেবে কাজটি পান। দরপত্রে কাজটি সম্পন্ন করায় ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাস সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। গত মাসের ৮সেপ্টেম্বর কার্যাদেশের সময়সীমা শেষ হলেও এখনো সড়কের বুড়িচং উপজেলার কংশনগর বাজার ও দেবীদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ বাজার এলাকায় ঢালাইকৃত অংশের একপাশ চালু হয়নি।

উপরন্তু দেবীদ্বার থানা গেইট থেকে মহিলা কলেজ পর্যন্ত ঢালাই করা অংশের ৬টি প্যানেল ভেঙ্গে ইট, পাথর সুরকী, সিমেন্ট বালুতে পরিণত ও ছোট বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে রডগুলো ভেসে উঠেছে। চলমান ভারি যানবাহন যাতায়াতকালে গর্তে পড়ার ঝাঁকুনিতে পার্শ্ববর্তী বহুতল ভবনগুলোও কেঁপে উঠছে। প্রায়ই রাতের অন্ধকারে রডের গুঁতোয় ভারি যানবাহনের টায়ার ফুটা এবং এক্সেল ভাঙার শব্দে ঘুমন্ত মানুষ জেগে উঠছেন। কিছু কিছু যানবাহন ওই অংশ ভাঙা সড়কের গর্তের মুখোমুখি এসে থমকে যাচ্ছে। এতে যানজটও চরম আকার ধারণ করছে।

এ বিষয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগ কুমিল্লা’র নির্বাহী প্রকৌশলী ড.মোহাম্মদ আহাদউল্লাহ বলেন, অনেক আগেই সড়ক সংস্কার কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখনো জাফরগঞ্জ বাজার এলাকার ঢালাইকরা অংশের একাংশ চালু না হওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। এখন যে কাজ করা হচ্ছে তা ডিপার্টম্যান্টাল মেইন্টেনেন্টস করা হচ্ছে। দেবীদ্বার থানা গেইট এলাকায় সদ্য নির্মিত ঢালাই ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি প্রথমে অজানা থাকলেও পরবর্তীতে জানার পর ওই অংশের ৬টি প্যানেল পুনরায় সংস্কারের আশ্বাসও দেন তিনি।

বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ দেখা দিলে ‘সড়ক ও জনপদ বিভাগ’ কর্তৃক গত বুধবার দুপর থেকে সদ্য নির্মিত সড়কের উপর ঢালাইকৃত ভাঙ্গা অংশের ৬টি প্যানেল উঠিয়ে নতুন করে কাজ শুরু করেছে। ওই অংশের সংস্কারের কারণে আবারো যানজটের কবলে ‘কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক’। ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ জনগণ, যাত্রী ও মালামাল পরিবহন।

স্থানীয়রা জানান, ১৯৪৭ সালে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক সড়কটি চালু হয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর সড়কটি আঞ্চলিক মহাসড়ক নামে পরিচিতি পায়। সড়কটি চালু হওয়ার পর বিগত ৭৩ বছর ধরে সড়কের খানা খন্দ, ডেবে যাওয়া অংশ, ভেঙে যাওয়া ব্রিজ, কালভার্ট সংস্কার কাজ চলে আসছে। কখনো ৪ কোটি, কখনো ১০ কোটি, আবার কখনো ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার ও মেরামতের কাজ চললেও একদিনের জন্যও যাত্রী ও মালামাল বহনের পরিবহনগুলো স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। বছরের অধিকাংশ সময়ই সড়ক ও জনপদ বিভাগ’র কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারগণ সড়ক সংস্কারে ব্যস্ততম সময় কাটিয়ে আসছেন। এখনো তা অব্যাহত আছে। কবে তা থেকে নিষ্কৃতি পাবে তা কেউ জানেন না।

স্থানীয়রা যানজট ও দুর্ঘটনা এড়াতে এবং সড়কটি দ্রুত ফোর-লেনে উন্নতকরণে, সড়কের দু’পাশের বৈদ্যুতিক খুঁটি, অবৈধ স্থাপনা, দৈনিক বাজার, সিএনজি ও অটো রিকশা স্ট্যান্ড উচ্ছেদ, সড়কের দু’পাশের জমি অধিগ্রহণ, পয়নিষ্কাশনে সড়কের পাশে আরসিসি ড্রেন নির্মাণ ও ড্রেনের উপর দিয়ে ফুটপাত তৈরি, গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলোতে ফুট ওভার ব্রিজ নির্মাণেরও দাবী জানান।

তবে বিগত দুই যুগ ধরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও একনেকের সভায় উক্ত সড়কটি টু-লেন, ফোর-লেন, সিক্স-লেনে উন্নীত করার আশ্বাস দিলেও এরই মধ্যে কয়েকটি সরকার পরিবর্তন হওয়ার পরও তা বাস্তবায়নে আলোর মুখ দেখেনি। গত কয়েক বছরে একাধিক সার্ভেয়ার টিম, এলও অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী সড়ক ও জনপদ বিভাগ জরিপ, লেভেলিং মেশিন, দুরবিন দিয়ে সার্ভে করা, জমি অধিগ্রহণের সাইড নির্ধারণ ও পরিকল্পনা, মাপজোপ সম্পন্ন করতে দেখা গেলেও সবই এখন ফাইলবন্দী।

বর্তমানে আপদকালীন সময়ে কুমিল্লার ময়নামতি থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার কালামুড়া ব্রিজ পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার এলাকায় ২৪ ফুট প্রসস্থে সড়ক সংস্কারের কাজ চলছে।

স্থানীয়রা আরো জানান, এ সড়কটি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বিশেষ করে দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের মানুষদের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। চট্টগ্রাম বন্দরসহ বাখরাবাদ, গোপালনগর, শ্রীকাইল, বাঙরা, তিতাস, হবিগঞ্জ প্রভৃতি গ্যাস ফিল্ডের সঙ্গে এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তহাট, আখাউড়া স্থল বন্দরের সাথে যোগাযোগে সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ক্রমবর্ধমান ভারি যানবাহনের চাপে সড়কটির বিভিন্ন অংশে খানাখন্দের সৃষ্টি, ডেবে যাওয়ার যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী ও বিপদসঙ্কুল হয়ে ওঠেছে।

তবে সড়ক ও জনপদ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সড়কটি আগামী ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে ফোরলেনে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। খুব শিগগির সড়কটি বর্ধিতকরণের কাজ শুরু হবে। আগামী একনেকের বৈঠকে বাজেট পরিকল্পনা চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে যাচ্ছে, ইতিমধ্যে পুরোনো সড়কটি সংস্কারে আর কোনো কাজ করা হবে না।

নাম না প্রকাশের শর্তে একজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জানান, গত একনেকের বৈঠকে ৭ হাজার ৫ শত কোটি টাকা ব্যয়ে ফোর-লেন সড়ক নির্মাণের প্রস্তাবনা উত্থাপিত হয়। ওই প্রস্তাব ঋণ চুক্তির শর্তারোপে রাজনৈতিক সমঝোতার টানপোড়নে আটকে গেছে। সড়ক উন্নয়নে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ঋণ চুক্তির ৭৫% বাংলাদেশের এবং বিভিন্ন ইনষ্টলম্যান্ট আমদানীসহ নানামুখী শর্ত ছিল। আগামী একনেকের সভায় ঋণচুক্তির শর্ত সিথিল হলে ৬ মাসের মধ্যেই ফোরলেনে সড়ক উন্নয়নের কার্যক্রম শুরু হবে।

এ ব্যাপারে চলমান সংস্কার কাজে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধীকাদের সাথে সেল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাদের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত