ঢাকা, শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ৯ মাঘ ১৪২৭ আপডেট : ৪৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১৯:০৮

প্রিন্ট

বিদেশে টাকা পাচারে কারা জড়িত?

বিদেশে টাকা পাচারে কারা জড়িত?
ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচারের আলোচনা আবারো সামনে এসেছে। এই অর্থের বেশিরভাগ পাচার করছেন সরকারি আমলা, কর্মচারী ও প্রকৌশলীরা। এমনকি টাকা পাচারকারীদের তালিকায় নাম রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের এক নেতারও।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অর্থ পাচারের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। মন্ত্রী জানান, দেশ থেকে কানাডায় টাকা পাচারের যে গুঞ্জন রয়েছে- তার কিছুটা সত্যতা পেয়েছেন তিনি। বলেছেন, পাচারকারীদের মধ্যে সরকারি কর্মচারীই বেশি।

গেল ২২ নভেম্বর দেশের অর্থ যারা বিদেশে পাচার করেন তাদের নাম, ঠিকানা, অর্থের পরিমাণ ও পাচারের অর্থে বাড়ি তৈরির তথ্য জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে অর্থ পাচার ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তাও জানতে চেয়েছেন উচ্চ আদালত।

এদিকে, গেল কয়েক বছর ধরেই কানাডায় সহজ ও আকর্ষণীয় অভিবাসন নীতিমালার কারণে বহুসংখ্যক বাংলাদেশি কানাডায় অভিবাসী হয়েছেন। বর্তমানে স্থায়ী বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা এক লাখের বেশি। অভিবাসী সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডার ও প্রকৌশলীরাই বেশি বাড়ি করেছেন এবং টাকা পাচার করেছেন। এসবের সূত্র ধরে কানাডায় ২৮ জনের অভিজাত বাড়ি থাকার কথা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপরই জোর আলোচনা শুরু হয়। জনমনে প্রশ্ন দেখা দেয় কারা বাড়ি করছেন কানাডায়।

আরো পড়ুন: অর্থ পাচারকারীদের তালিকা চেয়েছেন হাইকোর্ট

গেল মার্চে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর গড়ে ৬৫১ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে। ২০১০ সালে পাচার হয়েছিল ৫৪০ কোটি ডলার। এর তিন বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৬৬ কোটি ডলারে। যদিও ২০১৪ সালে কিছুটা কমে ৯১১ কোটি ডলারে নেমে এলেও তা ছিল উদ্বেগজনক।

গেল দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৬ হাজার ৩০০ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ। তবে জিএফআই এবার অর্থ পাচারের হিসাবে কিছুটা পরিবর্তন আনায় অর্থ পাচারের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। পণ্য বা সেবা আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং এবং রপ্তানিতে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে এ অর্থ পাচার হচ্ছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

এবিষয়ে দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রতি বছর দেশ থেকে যে টাকা পাচার হয়- এটা তার আংশিক চিত্র, পুরো চিত্র আরো ভয়াবহ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক তদন্তে শিল্পের যন্ত্রপাতি ভর্তি কনটেইনারে ছাই, ইট, বালি, পাথর ও সিমেন্টের ব্লক থাকার তথ্য পাওয়া যায়। যেখান শিল্পের কোনো যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়নি। এছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্তে খালি কনটেইনার আমদানির ঘটনাও ধরা পড়েছে। সম্প্রতি ভুয়া রপ্তানি এলসি (ঋণপত্র) এবং ক্রয়চুক্তির মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে এ ধরণের বেশ কিছু ঘটনা ধরা পড়েছে।

গেল তিন বছরে মালয়েশিয়া সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, বিদেশির জন্য মালয়েশিয়ান সরকারের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ। এর আগে মালয়েশিয়া সরকারের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, সেখানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ বাংলাদেশ। যদিও দেশ থেকে বিদেশে কোনো টাকা নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগে। গেল দশ বছরে মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাউকে কোনো অনুমোদন দেয়নি। এরপরও বাংলাদেশ কীভাবে মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ হলো তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আরো পড়ুন: সরকারি চাকুরেদের একহাত নিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

এবিষয়ে অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল হোসেন বলেন, ওইসব টাকা পাচার করা হয়েছে। যেহেতু মালয়েশিয়ায় টাকা নেয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো অনুমোদন নেই। তারপরও টাকা গেছে। তাই বুঝতে অসুবিধা নেই যে, টাকা পাচার হয়েছে।

এদিকে গেল এক বছরে কানাডার সরকারি সংস্থা দ্য ফিন্যান্সিয়াল ট্রানজেকশন অ্যান্ড রিপোর্ট অ্যানালাইসিস সেন্টার ফর কানাডা (ফিনট্র্যাক) এক হাজার ৫৮২টি মুদ্রা পাচারের ঘটনা চিহ্নিত করেছে। এই প্রতিবেদনে কয়েকজন বাংলাদেশির নামও থাকতে পারে বলে কানাঘুষা চলছে কানাডায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে। প্রবাসীদের একটি অংশ অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আন্দোলন শুরু করেছেন। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে ২৮ জনের কথা বলেছেন তাদের নাম ফিনট্র্যাকের প্রতিবেদনে আছে কিনা সে সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

সম্প্রতি সরকারি একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৩২ জন সরকারি প্রকৌশলী বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন। এই প্রকৌশলীদের বেশিরভাগই অবসর নেয়ার পর এক থেকে দেড় বছর দেশে অবস্থান করে সপরিবারে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন।

এবিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টিআইবির একজন কর্মকর্তা বলেন, গেল একযুগ ধরে বাংলাদেশে চলা বড় বড় প্রকল্প (রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল) থেকে সরকারি বিভিন্ন খাতে নিয়োজিত প্রকৌশলীরা বিদেশে অর্থ পাচার করছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বলেন, রাজনীতিবিদরা নয়, বিদেশে বেশি অর্থপাচার করেন সরকারি কর্মচারীরা। আমার ধারণা ছিল রাজনীতিবিদদের সংখ্যা বেশি হবে। কিন্তু আমার কাছে যে তথ্য এসেছে, যদিও এটি সামগ্রিক তথ্য নয়। সেটা দেখে আমি অবাক হয়েছি। সংখ্যার দিক থেকে অনেক সরকারি কর্মচারীর বাড়িঘর সেখানে বেশি আছে এবং তাদের ছেলেমেয়েরা সেখানে থাকে। আমার কাছে ২৮টি কেস এসেছে এবং এর মধ্যে রাজনীতিবিদ হলেন চারজন। এছাড়া কিছু আছেন আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যবসায়ী। আমরা আরো তথ্য সংগ্রহ করছি।

অন্যদিকে, ৮২তম ব্যাচের তারকা আমলা আবু আলম শহীদ খান যতোটা না আমলা এর চেয়ে রাজনীতির পরিচয়েই পরিচিত বেশি। তিনি ২০০৯ সালে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে সচিব হয়ে যান। পরে কানাডায় চলে যান। আবু আলম শহীদ খানের স্ত্রী, কন্যা এবং পালিত পুত্র স্থায়ীভাবে কানাডায় থাকেন। এই মুহূর্তে তিনি কানাডায়। প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তা জাসদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বিএনপি মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশারফ হোসেনের এক দুর্নীতি মামলায় আবু আলম শহীদ খানের নাম আসে। ফলে সামায়িকভাবে বরখাস্ত হন তিনি। তবে বরখাস্ত হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় ছেদ পড়তে দেননি। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সচিব হন। স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হিসেবে অবসরে যান।

এদিকে গেল মাসে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বলেছে, সুইস ব্যাংকসহ অনেক দেশেই অর্থ পাচার হচ্ছে। এই অর্থ উদ্ধারে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে আর্থিক ও কর–সংক্রান্ত গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে মত দেয় অর্থ বিভাগ।

আরো পড়ুন: অবসরের পর অন্য পেশায় যেতে লাগবে না অনুমতি

বৈঠকে বলা হয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশ এ ব্যাপারে যেসব কৌশল অনুসরণ করে, বাংলাদেশও তা অনুসরণ করতে পারে। এ ব্যাপারে দুদক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), জননিরাপত্তা বিভাগ, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয়কে (আরজেএসসি) বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে মতামত দিতে বলা হয়েছে।

এবিষয়ে বিএফআইইউ প্রধান আবু হেনা মো. রাজী হাসান বলেন, আমাদের টাকা পাচার ঠেকাতে এবং টাকা উদ্ধারে একটা কৌশলপত্র করতে বলা হয়েছিল। সেটা আমরা করে দিয়েছি।

কেএস/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত