ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২১, ১২ মাঘ ১৪২৭ আপডেট : ১০ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২১, ২৩:৫২

প্রিন্ট

জামাই-শ্বশুরের বড় মাছ কেনার মেলা

জামাই-শ্বশুরের বড় মাছ কেনার মেলা
ছবি: প্রতিনিধি

গাজীপুর প্রতিনিধি

গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বিনিরাইল গ্রামে অগ্রহায়ণের ধান কাটা শেষে পৌষ-সংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসবে আয়োজন করা হয়। বসে মাছের মেলাও। প্রায় আড়াই শ বছরের পুরনো এই মেলা প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়। মূলত এটা মাছের মেলা হলেও সবাই এটাকে জামাই মেলাই বলে। কারণ স্থানীয় জামাই এবং শ্বশুরদের মধ্যে চলে বড় মাছ কেনার প্রতিযোগীতা।

প্রতিবছর সারাদেশ থেকে বিক্রেতারা এখানে মাছ নিয়ে আসেন। তাই দুর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারাও ছুটে আসেন মাছ কিনতে। বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী এমনই চিত্র চোখে পড়ে।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার জাঙ্গালীয়া, মোক্তারপুর ও জামালপুর ইউনিয়নের ত্রি-মোহনার বিনিরাইল গ্রামের বিরাট এলাকাজুড়ে মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন মাছ বিক্রেতারা।

সহস্রাধিক স্টলে দেশের বিভিন্ন জায়গার মাছ বিক্রেতারা এখানে মাছ বিক্রির জন্য ছুটে আসেন। তারা নানা অঙ্গভঙ্গি করে সুর ধরে ডেকে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। কেউ কেউ বড় আকৃতির মাছ উপরে তুলে ধরে ক্রেতাদের ডাকছেন।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়, কে কতো বেশি ওজনের বা বড় মাছ মেলায় আনতে পারেন। অন্যদিকে স্থানীয় জামাই-শ্বশুরদের মধ্যেও হয় সেই বড় মাছ কেনার প্রতিযোগীতা। এই মেলায় মাছের সাথে বস্ত্র, হস্ত ও কুটির শিল্পের নানা পণ্যেরও আমদানি হয়। মেলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি কাজ করছে স্থানীয়রাও।

মেলায় আসা ক্রেতা স্থানীয় জাঙ্গালিয়া এলাকার আবু বকর বাংলাদেশ জার্নালকে জানান, মেলায় প্রচুর দেশি রুই, কাতল, বোয়াল, আইড়, বাঘাইর, চিতল, কালবাউশ ও রিটা মাছের সমাগম হয়েছে।

এছাড়া কার্প জাতীয় নানা মাছের আমদানি হয়েছে। এক কেজি থেকে শুরু করে বিশ কেজি পর্যন্ত এসব মাছের দাম হাঁকা হচ্ছে ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে পনের হাজার টাকা পর্যন্ত। বিক্রিও হচ্ছে প্রচুর। সামর্থ অনুযায়ী ক্রেতারা এসব মাছ কিনছেন। তবে বড় মাছ কেনার জন্য বিনিরাইলের মাছের মেলাই সবচেয়ে উত্তম জায়গা।

মেলার মাছ বিক্রেতা নারায়ন চন্দ্র জানান, ইতিহাস ঐতিহ্যের কারণে বিনিরাইলের মাছের মেলায় কেনার চেয়ে দেখতে আসা মানুষের ভীড় বেশী। তবে বিক্রিও একেবারে খারাপ না। স্থানীয় মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক স্থাপন হওয়াতে প্রতি বছর এ মেলায় যোগদেন তারা। এখানে বেচা-কেনাকে মূখ্য মনে করেন না বলেও জানান বিক্রেতারা।

আয়োজক কমিটি জানান, শুরুতে মেলাটি অনুষ্ঠিত হতো খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে। এটি অগ্রহায়ণের ধান কাটা শেষে পৌষ-সংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসবে আয়োজন করা হতো।

প্রায় আড়াই শ বছর যাবৎ মেলাটি আয়োজন হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ মেলাটি একটি সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। তাই বেড়েছে মেলার পরিধিও।

এখানে শুধু মাছ নয়, এ মেলাকে কেন্দ্র করে বস্ত্র, হস্ত, চারু-কারু, প্রসাধনী, ফার্নিচার, খেলনা, তৈজষপত্র, মিষ্টি ও কুটির শিল্পের নানা পণ্যের সহস্রাধিক স্টল বসে। মেলাকে ঘিরে বিনিরাইলের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। মেলা উপলক্ষে মেয়ে-জামাইকে দাওয়াত করে আনা এই এলাকার মানুষের রীতিতে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় জামালপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুর রহমান ফারুক মাস্টার বাংলাদেশ জার্নালকে জানান, বৃটিশ শাসনামল থেকে শুরু হওয়া বিনিরাইলের মাছের মেলা এখন ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। এ মেলা গাজীপুর জেলার সবচেয়ে বড় মাছের মেলা হিসেবে স্বীকৃত।

কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ একেএম মিজানুল হক বলেন, মেলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছে। পুলিশের পাশাপাশি কাজ করছে স্থানীয়রাও।

তিনি আরো বলেন, মাছের মেলাটি এ অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। তাই মেলায় বেচা-কেনা যতই হউক, এ মেলা ঐতিহ্য আর কৃষ্টি-কালচারকে বহন করছে এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা। তাই কোন প্রকার দাঙ্গা-হাঙ্গামা নেই।

বাংলাদেশ জার্নাল/এইচকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত