ঢাকা, রোববার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭ আপডেট : ৩৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২১, ০৯:৪৮

প্রিন্ট

প্রথম টিকা নিয়ে যা বললেন রুনু

প্রথম টিকা নিয়ে যা বললেন রুনু
সংগৃহীত ছবি

জার্নাল ডেস্ক

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তাকে করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার মাধ্যমে দেশে বহু প্রতীক্ষার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে গতকাল বুধবার। এর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হলেন তিনি। টিকা নিয়ে রুনু বলেন, ‘জয় বাংলা’। এ সময় প্রধানমন্ত্রীও তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলান।

পরে টিকা নেওয়ার অনুভূতি জানিয়ে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘টিকা নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন। আমার কাছে মনে হয়, এটা কোনো সমস্যা না। একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে আমার টিকা নেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে—মানুষ যেন টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ হয়। কোনো ভয়ভীতি যেন না থাকে। আমি খুব খুশি। কোনো অসুবিধা হয়নি। আমি ভালো আছি। সব ঠিক আছে।’

এদিকে গতকাল সকালে রুনুর মা বিনীতা কস্তা বলেন, ‘আমার মেয়ে রুনু খুবই সাহসী। করোনাযোদ্ধাও। দেশে করোনা চিকিৎসার শুরুতে ছিল প্রথম সারিতে। আর প্রথম করোনার টিকা নিলে দেশে ইতিহাস হয়ে থাকবে, বাড়ি ও পরিবারের গর্ব হবে—এ চিন্তা করেই আমরা ওকে রাজি হতে বলি। আজ আমাদের পুরো পরিবার খুব খুশি, আনন্দিত।’

রুনুর পুরো নাম রুনু ভেরোনিকা কস্তা (৩৭)। বাবার বাড়ি গাজীপুর মহানগরীর পুবাইলের পদ হারবাইদ এলাকায়। বাবা বার্নাড কস্তা পেশায় কৃষক। এক ভাই, এক বোনের মধ্যে রুনু বড়।

গতকাল সকাল ১১টায় রুনুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িতে সাজ সাজ অবস্থা। প্রার্থনা সেরে মা বিনীতা কস্তা নতুন পোশাক পরে ঢাকায় মেয়ের বাসায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি, ভাশুরের ছেলে প্লাবন এলিয়াস কস্তা এবং ভাশুরের মেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নার্স পিংকি টিকাদান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকবেন।

হাসিমুখে বিনীতা কস্তা বলেন, ‘সকালেও মেয়ে ফোন করে প্রার্থনা করতে বলেছে। বাড়ির অন্যদেরও প্রার্থনা করতে বলেছে, যাতে কোনো বিপদ না হয়। ওর সাহস আছে, ভয় পাবে না। তার পরও একদম টেনশন না করতে বলেছি। বাড়ির ছোট-বড় সবাই ওর জন্য প্রার্থনা করেছি। মেয়েকে ঈশ্বরের কাছে সঁপে দিয়ে যা ভালো হয়, তাই করতে বলেছি।’

বাবা কৃষক বার্নাড কস্তা বলেন, ‘মেয়ের ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হওয়ার। পড়ালেখার বাইরে কিছুই বুঝত না। খেতে বসলেও এক হাতে বই থাকত। কোনো পরীক্ষায় প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি। কিন্তু আমার ছিল অভাবের সংসার। খরচ চালাতে না পারায় অবশেষে মেয়েকে নার্সিংয়ে দিই।’

মেয়ের প্রথম টিকা নেওয়ার সুযোগ পাওয়া প্রসঙ্গে বার্নাড কস্তা কালের কণ্ঠকে জানান, গত শুক্রবার সকালে স্বামী-সন্তানদের নিয়ে তাঁর বাড়িতে বেড়াতে আসেন রুনু। শনিবার বিকেলে রুনু তাঁর মেয়েকে গান শেখানোর জন্য তাঁর বড় ভাইয়ের ছেলে বাবুল ক্রুসের বাড়িতে যান। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কুর্মিটোলা হাসপাতালের ম্যাট্রন ফোন করেন রুনুকে। তিনি বলেন, ‘কয়েকজনকে প্রথম টিকা নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কেউ রাজি হয়নি। তুমি তো সাহসী, তুমি প্রথম টিকাটি নাও।’

বাবা বলেন, ‘রুনু প্রথমে ইতস্তত করলেও অনুষ্ঠানে জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থাকবেন জেনে তাকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দেয় ভাইপো বাবুল। বিষয়টি জানার পর আমি, তার মা, এমনকি চাচি স্কুল শিক্ষক রিয়েলি কস্তা, বউদি শিপ্রা ক্রুস, চাচাতো বোন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নার্স পিংকিসহ বাড়ির সবাই তাকে উৎসাহ দিই। সবার উৎসাহে রাজি হয়ে যায় রুনু।’

গর্বিত বাবা বার্নাড মেয়ের সাহসের বর্ণনায় বলেন, “দেশে করোনার সংক্রমণের শুরুর দিকে প্রথম চিকিৎসাসেবা শুরু হয় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। প্রথম চিকিৎসা টিমে সুপারভাইজর ছিল রুনু। জীবনের ভয়ে আমরা তাকে টিমে থাকতে নিষেধ করেছিলাম। উল্টো সে আমাদের বুঝিয়ে বলেছিল, ‘সেবার শপথ নিয়ে এ পেশায় যোগ দিয়েছি, ভয় পেলে চলবে কী করে?’”

রুনু প্রাইমারি শেষ করেন বাড়ির পাশের ভাদুন মিশনারি থেকে। পরে মামার বাড়ি থেকে ১৯৯৮ সালে ঢাকার সাভারের সেন্ট যোসেফ হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর মানুষের সেবার ব্রত নিয়ে যোগ দেন কুমুদিনী নার্সিং স্কুল ও হাসপাতালে। চার বছরের নার্সিং ডিপ্লোমা শেষে ২০০২ সালে বেরিয়ে আসেন প্রশিক্ষিত নার্স হিসেবে। ওই বছরই ঢাকার বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে চাকরিজীবন শুরু করেন তিনি। সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০১৩ সালে যোগ দেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে।

রুনু ২০০৫ সালে বিয়ে করেন পাবনার চাটমোহর উপজেলার মথুরাপুর ধর্মপল্লীর খরবাড়িয়া গ্রামের সলোমন গোমেজের ছেলে পবন গোমেজকে। তিনি দুই সন্তানের জননী। তাঁর ১৩ বছর বয়সী মেয়ে প্রথা গোমেজ নবম শ্রেণির ছাত্রী। আর ছেলে প্রয়াস গোমেজের বয়স ৯ বছর। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিরত স্বামী ও সন্তান নিয়ে রুনুর সুখী সংসার।

চাচি রিয়েলি কস্তা বলেন, ‘বাড়ি থেকে একটু দূরেই ছিল প্রাইমারি স্কুল। আমি হাত ধরে ওকে স্কুলে নিয়ে গেছি। কোনো দিন স্কুল কামাই করেনি রুনু। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর রোগীর সেবাই হয়ে ওঠে তার ধ্যান-জ্ঞান। প্রথমে কুর্মিটোলা হাসপাতালের করোনা চিকিৎসায় ফ্রন্ট লাইনে এবং পরে বসুন্ধরা গ্রুপ করোনা রোগীদের জন্য হাসপাতাল বানালে সেখানেও সুপারভাইজরের দায়িত্ব পালন করে রুনু। তার জন্য আমরা সবাই গর্বিত।’

চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রী শিপ্রা ক্রুস বলেন, ‘মানুষকে আপন করে নেওয়ার এক চমৎকার ক্ষমতা রয়েছে রুনুর। সে টিকা নেওয়ায় আমাদের ভয় কেটে গেছে। আমরাও নিশ্চিন্তে টিকা নেব।’ সূত্র: কালের কন্ঠ

বাংলাদেশ জার্নাল/কেআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত