ঢাকা, বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ৭ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২১, ১৬:৫১

প্রিন্ট

চিরসবুজ এক কমরেডের গল্প

চিরসবুজ এক কমরেডের গল্প
কমরেড আব্দুল মালিক

এম. এ. কাইয়ুম

বয়সটা নব্বই ছুঁই ছুঁই করলেও দেহ-মনে জৌলুশ আছে পুুরোদমে। জোর কদমে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারেন অনায়াসে। চশমা ছাড়া খবরের কাগজ কিংবা বই-পুস্তক পাঠ করতে পারেন নির্ধিদ্বায়। চুল সাদা হলেও পর্যাপ্ত এবং পরিমিত চুল আছে মাথায়। টাটকা সুপারি চূর্ণ করে খাবার শক্তিও আছে দাঁতে। এখনো মাইক্রোফোনে দাঁড়িয়ে অনর্গল বক্তৃতা করতে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি নেই শরীরে। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে এখনও তৎপর অনুজদের আগে আগে।

এখনো পিছনে হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে মনের সুখে একা একা গুনগুনিয়ে প্রেম এবং দ্রোহের গান ধরেন- জানি তোমার প্রেমের গল্প...যা চেয়েছি আমি তা পাইনি...মোর প্রিয়া হবে এসো রানী দেব খোঁপায় তারার ফুল...আমি বিদ্রোহী রণক্লান্ত...।

বলছিলাম কুলাউড়া তথা মৌলভীবাজার জেলার সবচেয়ে প্রবীণ এবং বর্ষীয়ান রাজনীতিক কমরেড আব্দুল মালিকের (মালই মিয়া) কথা। তিনি চিরসবুজ কমরেড অর্থাৎ আমার বাবা যেভাবে দেখেছেন, আমিও ঠিক একইভাবে একই অবয়বে দেখছি। শুধু আমি নয়, আমার প্রজন্মের অনেকেরই উপলব্ধি তাই।

আব্দুল মালিক ১৯৩৪ ইংরেজির ২৩ জুন কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী পৃথিমপাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম মো. ইলিম এবং মা মরহুমা ছবরুননেছা খাতুন। মা-বাবার একান্ত ইচ্ছে ছিল ছেলে ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করে মৌলভী হবে। এজন্য প্রায় ৩/৪ কিলোমিটার দূরের রাউৎগাঁও এম.ই মাদ্রাসায় তাকে ভর্তি করান। সেখানে তিনি পঞ্চম শ্রেণি শেষ করে আর মাদ্রাসায় পড়তে রাজি হননি।

১৯৪৯ সালে ভর্তি হন আলী আমজদ এম.ই স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে। সেক্যুলার চেতনার দূরন্ত ছেলে তৎকালীন স্কুলের জরাজীর্ণ ঘর, বসার বেঞ্চ, ডেস্ক এবং শিক্ষক সঙ্কট নিরসনের জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। সেই সময়ে দৃঢ়চেতা সাহসী এই তরুণের প্রতিবাদী চেতনা আকৃষ্ট করে দেওগাঁও বড়বাড়ির আবু তাহির মাস্টারকে। তিনি তাকে এবং সঙ্গীয় কয়েকজনকে নিয়ে একটি গ্রুপ তৈরি করেন। পরবর্তীতে তারই প্রেরণায় ওই গ্রুপটি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়।

কুলাউড়া দক্ষিণাঞ্চলের কমিউনিস্ট আন্দোলনের একজন সংগঠক হিসেবে পরিচিত লাভ করেন কমরেড আব্দুল মালিক। প্রথমে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের পুথিমপাশা সভাপতি এবং উপজেলা সদস্য হিসেবে এলাকার মেধাবী তরুণদের সংগঠিত এবং রাজনীতিতে সক্রিয় করেন।

কমরেড আব্দুল মালিক বায়ান্নর ভাষা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বাংলার প্রতিটি লড়াই সংগ্রামে ছাত্র, যুব ও জনতাকে নেতৃত্ব দেন। মিছিলে সংগ্রামে ছিলেন অগ্রসৈনিক। এজন্য তাকে ভাষা সৈনিকও বলা হয়।

কমরেড আব্দুল মালিক ৬২'র আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রদোহী মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় ৪ মাস কারাবরণ করেন। পরে মার্শাল কোর্টে বাবা এবং ভাইয়ের অঙ্গীকার মাধ্যমে খালাস পান। তারপরও ১৯৬৯'র গণআন্দোলনে নিজেকে সক্রিয় রাখেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে অস্ত্র হাতে না নিলেও আগরতলা আশ্রয়কেন্দ্র এবং বাংলার মুক্তিসেনাদের মধ্যে গুপ্তচরের ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন রসদ যোগান, খবরা-খবর আদান-প্রদান করেন।

কমরেড আব্দুল মালিক এ দেশের পুরোধা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ বহু গুণধর ব্যক্তি ও রাজনীতিকের সাহচর্চে ধন্য হয়েছেন। গরীব-দুঃখী-মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের বীর মাওলানা ভাসানীর ন্যাপের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি নবাব আলী সফদর খান রাজা সাহেবের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন।

কমরেড আব্দুল মালিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি হিসাবে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে ফরিদপুর জেলার অম্বিকা ময়দানে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় 'কৃষক সম্মেলনের' উদ্বোধক ছিলেন।

কমরেড আব্দুল মালিক শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রাখেননি, শিক্ষাঙ্গনেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। কর্মধা ইউনিয়নের কর্মধা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পাট্টাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। তিনি রাউৎগাঁও শম্ভুনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়, পৃথিমপাশার ভাটগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইটাহরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন, যা পরবর্তীতে সরকারিকরণ হয়।

তিনি কুলাউড়ার আলী আমজদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির একবার ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং একবার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কমরেড আব্দুল মালিক ১৯৫৭ সালে ঐতিহ্যবাহী রবিরবাজার এলাকার তরুণ-যুবকদের ক্রীড়া ও সাহিত্যচর্চার বিকাশের জন্য 'দি লংলা রিডিং ক্লাব' নামে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে আজও জড়িয়ে আছেন ক্লাবের সকল কর্মকাণ্ডে।

কমরেড আব্দুল মালিক একজন স্থূলকায় মানুষ হয়েও ইতিহাসে বিশালতা নিয়ে আজো রাজনীতি, সমাজনীতি, ক্রীড়া, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির পরতে পরতে বিচরণ করছেন স্ব-মহিমায়। বাল্যকাল থেকে যে নীতি আদর্শ ধারণ করেছেন, লালন করেছেন, আজও তার বিন্দুমাত্র বিচ্যুুতি ঘটেনি। কোনো লোভ লালসা তাকে গ্রাস করতে পারেনি। অর্থাৎ তিনি আজীবন কমরেড। বিপ্লবী লেখক শেখ রফিক ও লেখিকা জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণি “আব্দুল মালিক” নামে তাকে নিয়ে একটি বইও রচনা করেছেন।

সবার প্রিয় কমরেডের সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি এবং গভীরভাবে প্রার্থনা করি তিনি যেন তার সেই নজরকাঁড়া চিরসবুজ অবয়ব নিয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকেন অনাদিকাল লড়াই সংগ্রামের রাজ স্বাক্ষী হয়ে।

লেখক: এম. এ. কাইয়ুম, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি, বাংলাদেশ জার্নাল

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত