ঢাকা, বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ১ মিনিট আগে

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২১, ১২:২৩

প্রিন্ট

১০ মিনিটের গরম বাতাসে সর্বনাশ, সব ধানে চিটা

১০ মিনিটের গরম বাতাসে সর্বনাশ, সব ধানে চিটা
গোপালগঞ্জে কয়েক মিনিটের গরম বাতাসে স্বপ্ন ভাঙলো কৃষকদের।

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের শেফালী বিশ্বাস (৫৮)। ঘরে অসুস্থ পঙ্গু স্বামী আর চার মেয়ে। এবার ৩ বিঘা জমিতে ধান বুনে স্বপ্ন দেখেছিলেন ঘরে তোলার। যাতে সারা বছরের খাবার যোগান হয়। কিন্তু কালবৈশাখী ঝড়ের পরেই মাত্র কয়েক মিনিটের গরম বাতাসে তার সেই স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। এখন চিন্তায় রয়েছেন কীভাবে যোগান হবে সারা বছরের খাবার। কীভাবেই বা চলবে সংসার।

শুধু শেফালী বিশ্বাসই নয় তার মত একই অবস্থা ওই গ্রামের অপর্ণা রানী খান, দয়ানন্দ ঘরামী, জুড়ান বিশ্বাস, সুরেশ সেন, চিত্তরঞ্জন ঘরামী, দেবাশিষ মণ্ডলসহ জেলার চার উপজেলার শত শত কৃষকের।

এক রাতের মধ্যে শত শত হেক্টর জমির ধানের শীষ সবুজ থেকে সাদা হয়ে নষ্ট হয়েছে। কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন লু হাওয়ার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। জেলার অন্তত ১০টি ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। ইতিমধ্যে কৃষি বিভাগ খবর পেয়ে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে মাঠে নেমেছে।

ছবি ১: গোপালগঞ্জে কয়েক মিনিটের গরম বাতাসে স্বপ্ন ভাঙলো কৃষকদের।

সরেজমিনে গিয়ে ও গোপালগঞ্জ কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জে এ বছর ৭৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এসব জমিতে এখন ধানের ফ্লাওয়ারিং স্টেজ চলছে। কিন্তু হঠাৎ করে গত রোববার রাতে জেলার টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া, তাড়াইল, পাকুরতিয়া, লেবুতলা, বর্ণি, কুশলী, পাটগাতী, বরইহাটি ও গোপালপুর, কোটালীপাড়া উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের মাচারতারা, আমতলী, তালপুকুরিয়া, কান্দি, হিরণ ও আমতলী, কাশিয়ানী উপজেলার রাতইল ও সদর উপজেলার চর মানিদাহ গ্রামের উপর দিয়ে কাল বৈশাখীর গরম হাওয়া প্রবাহিত হয়।

এরপর সোমবার সকালে কৃষকেরা তাদের জমিতে গিয়ে দেখেন সব ধান সাদা হয়ে গেছে। ক্ষেতের উঠতি বোরো ধানের শীষে যে গুলোতে কেবল মাত্র ‘দুধ’ এসেছে সেই ধানের শীষ সব চিটায় পরিণত হয়ে সাদা বর্ণ ধারণ করেছে। যেসব জমিতে ধানের ফ্লাওয়ারিং হচ্ছে সে সব জমির ধান গরম বাতাসে পুড়ে গিয়ে সাদা বর্ণ ধারণ করেছে। এতে উৎপাদনের প্রায় শতকরা বিশ ভাগ ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আর এতে জেলার শত শত কৃষক কয়েক কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। সারা বছর কী খেয়ে দিন কাটাবেন এখন সেই চিন্তায় পড়েছেন তারা। ধার দেনা, ব্যাংক লোন ও ঋণ নিয়ে এসব কৃষকরা তাদের জমিতে ধানের আবাদ করেছিলেন। কিন্তু ধান নষ্ট হওয়ায় কীভাবে ধার দেনা ও ঋণ শোধ করবেন সেই চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

ছবি ২: গোপালগঞ্জে কয়েক মিনিটের গরম বাতাসে স্বপ্ন ভাঙলো কৃষকদের।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের দয়ানন্দ ঘরামী ও জুড়ান বিশ্বাস বলেন, রাতে গ্রামের উপর দিয়ে কাল বৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। মাত্র বিশ মিনিটের গরম বাতাসে আমার জমির ধানের শীষ শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারবো না। সারা বছর পরিবার পরিজন নিয়ে কী খাবো চিন্তায় শেষ এখন।

একই গ্রামের অপর্না রানী খান বলেন, আমার স্বামী অসুস্থ। ছোট ছোট দুটো বাচ্চা রয়েছে। আমি নিজ হাতে তিন বিঘা জমিতে ধান লাগাইছি দেনা করে। কিন্তু আমার জমির সব ধান এখন নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আমার আর কোনো পথ নেই কোনো আয় রোজগার নেই। এখন আমার মরন ছাড়া আর কোনো গতি নেই।

একই গ্রামের দেবাশিস মণ্ডল, নকুল ঘরামী, চিত্তরঞ্জন ঘরামী বলেন, এ বছর ধার দেনা, ব্যাংক লোন ও ঋণ নিয়ে ধান চাষ করেছি। কিন্তু জমির ধান সব শেষ হয়ে গেলো। দেশে এখন করোনার সাথে লকডাউন চলছে। সারা বছরের খাবার তো দুরের কথা এখন ধার দেনা কীভাবে শোধ করবো তা বুঝতেই পারছি না। আমাদের মরণ ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

ছবি ৩: গোপালগঞ্জে কয়েক মিনিটের গরম বাতাসে স্বপ্ন ভাঙলো কৃষকদের।

একই গ্রামের কৃষক রঞ্জিত সেন, সুরেশ সেন বলেন, রাত ১০টার দিকে কাল বৈশাখীর ঝড়ো হাওয়ার বইতে শুরু করে। এরই এক পর্যায়ে হঠাৎ করে গরম বাতাস আসে। তখন আমরা বুঝতে পারিনি ধানের ক্ষতি হবে। সকালে রোদ ওঠার পর জমিতে গিয়ে দেখি ফুলে বের হওয়া ধানের শীষগুলো শুকিয়ে গেছে। এখন আমরা কি করবো তা বুঝে উঠতে পারছি না। সরকার যদি আমাকে সাহায্য সহযোগিতা না করে তাহলে ঋণ করে সারা বছর চলতে হবে।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জামাল উদ্দিন বলেন, কৃষকরা খবর দেয়ার পর আমি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। সেখানে গিয়ে দেখি জমির ধানগুলো সাদা বর্ণ ধারণ করে নষ্ট হয়ে গেছে। এ বছর টুঙ্গিপাড়ায় ৮ হাজার ৬শ’ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

কোটালীপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিটুল রায় বলেন, ফ্লাওয়ারিং হওয়া ধানে গরম বাতাসের কারণে পরাগায়ন শুকিয়ে গেছে। যে কারণে ধান গাছগুলো ঠিক আছে কিন্তু শীষগুলো শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে কোটালীপাড়ায় প্রায় ৬ থেকে ৭ শত হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ করা হচ্ছে।

জেলার বিভিন্ন স্থানে ধান নষ্ট হবার কথা স্বীকার করে গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. অরবিন্দ কুমার রায় বলেন, গরম বাতাসে জেলার টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী ও সদর উপজেলার বোরো ধানের বেশ ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে মাঠে কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও ক্ষতির পরিমাণ লিপিবদ্ধ করার জন্য বলা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বিষয়টি ভাঙ্গা ধান গবেষণা ইনিষ্টিটিউটকে জানানো হয়েছে। তাদের একটি দল গোপালগঞ্জে এসে বিষয়টি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখবেন। এরপর তারা আমাদের জানিয়ে করণীয় ঠিক করবেন।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত