ঢাকা, রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ আপডেট : ৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০১৯, ১৮:২৭

প্রিন্ট

'শ্রেষ্ঠ জয়িতা' প্রাথমিক শিক্ষিকা জিন্নাতুন

'শ্রেষ্ঠ জয়িতা' প্রাথমিক শিক্ষিকা জিন্নাতুন
অনলাইন ডেস্ক

নিজেই বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছিলেন জিন্নাতুন। তবুও তেমে যাননি। ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ওঠে এসেছেন সমাজের মূল ধারায়। ঘর-সংসার সামলিয়ে চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা। এরপর নিজে স্বর্নিভর হতে শুরু করেন বেসরকারি একটি এনজিওতে চাকরি করে। অনেক ঝঞ্ঝাটের পরেও মেধাবী এই নারী জুটিয়ে নিয়েছেন সরকারি চাকরি। এ ছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন অবিরত।

আর কর্মের পুরস্কার হিসেবে এবার তিনি নির্বাচিত হয়েছেন রংপুর বিভাগের শ্রেষ্ঠ জয়িতা। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের চাচিয়া নওহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা জিন্নাতুন ফেরদৌসীকে শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ গত বুধবার এই শ্রেষ্ঠত্ব সম্মাননা তুলে দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বেগম ফজিলাতুননেছা ইন্দিরা।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তৃণমূলের সংগ্রামী ও সফল নারীদের আত্মশক্তিতে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষে জয়িতা অন্বেষণ বাংলাদেশ কর্মসূচির আওতায় এই শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হয়। আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা গেছে, এবারের রংপুর বিভাগের মধ্যে প্রথম জয়িতা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের চাচিয়া নওহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা জিন্নাতুন ফেরদৌসী একজন আলোকিত নারী। ১৯৬৬ সালে নওগার আত্রাইয়ের সাহেবগঞ্জ গ্রামের জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জন্মের পাঁচ বছরের মাথায় বাবাকে হারিয়েছেন তিনি। বড় ভাইয়ের সংসার থেকে শুরু হয় পড়াশোনা। স্থানীয় সাহেবগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে রাজশাহীর ভবানীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন তিনি। ফলাফল বের হওয়ার আগেই সুন্দরগঞ্জে বিয়ে হয় এ নারীর। তখন সেখানে তার ভাই আবু সায়েম বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত ছিলেন। ভাইয়ের পছন্দেই মূলত বিয়ে করতে হয় তাকে।

শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে বাধা আসে পড়াশোনায়। তবুও দমে যাননি তিনি। ভর্তি হন সুন্দরগঞ্জ ডি ডব্লিউ ডিগ্রি কলেজে। সেখান থেকে পাশ করেন উচ্চ মাধ্যমিক। তখনই কোল জুড়ে আসে কন্যা সন্তান। শুরু হয় স্বামী-শ্বাশুড়ির নির্যাতন। এর মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন জিন্নাতুন। পাশাপাশি চাকরি করা শুরু করেন বিভিন্ন বেসরকরারি সংস্থায়। চেষ্টা করতে থাকেন সরকারি চাকরির। চলতে থাকে পড়াশোনারও।

১৯৯০ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে পাশ করেন বিএ। পরে ১৯৯৩ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। এরপর আর থেমে থাকেননি। চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন। রংপুর টিসার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে পাশ করেন বিএএড ও রংপুর ল কলেজ থেকে এলএলবি। শিক্ষকতার পাশাপাশি শুরু করেন পিছিয়ে পড়া নারীদের উন্নয়নে নানা কার্যক্রম। নিজে বাল্যবিবাহর শিকার হলেও সামনে থেকে রোধ করেছেন সমাজের বাল্যবিবাহ। আন্দোলন গড়ে তুলেছেন গ্রামে। নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অংশগ্রহণ করেছেন জিন্নাতুন। চালিয়ে গেছেন স্কাউটিংও। স্কাউটিংয়ে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পাশাপাশি তিনি ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভারত সফর করেন কৃতিত্বের সাথে।

সব কিছু ভালো চললেও ২০০৬ সালের দিকে ভেঙে যায় সংসার। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি। ২০০৯ সালে পদোন্নতি পেয়ে প্রধানশিক্ষক হন। কৃতিত্বের পুরস্কার নিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে। আর এবারের জয়িতা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় প্রথম নির্বাচিত হন জিন্নাতুন ফেরদৌসী।

সংগ্রামী এই নারী জানান, নারীদের স্বাবলম্বী হয়েই সংসার জীবনে যাওয়া উচিৎ। তাতে নানামুখী সমস্যায় পড়তে হবে না। সেই সাথে স্বর্নিভর অর্থনৈতিক সংসার গড়ে তুলা যাবে। তিনি মনে করেন, নারীরা এগিয়ে যাওয়া মানেই সমাজ এগিয়ে যাবে। সাথে দেশ পাবে অসংখ্যা নারী জয়িতা।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত