ঢাকা, সোমবার, ২৩ নভেম্বর ২০২০, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ আপডেট : ২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১২:০৪

প্রিন্ট

দেহে আলো তৈরি করতে পারা প্রাণী

দেহে আলো তৈরি করতে পারা প্রাণী
ফিচার ডেস্ক

রাতের আঁধারে চলতে চলতে আমরা প্রায়ই জোনাকি পোকা দেখে থাকি। আঁধারে মিট মিট করে জ্বলতে থাকা জোনাকি দেখতে বেশ লাগে। তবে আপনি জানেন কি, জোনাকি পোকার গাঁ থেকে আলো কেন বের হয়? যেসব প্রাণী নিজেদের শরীর থেকে আলো বের করতে পারে তাদের কে বিজ্ঞানের ভাষায় বায়োলুমিনিসেন্ট প্রাণী বলে।

আমাদের আলো উৎপন্ন করতে হলে আগুন জ্বালাতে হয় অথবা বৈদ্যুতিক বাতির ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বায়োলুমিনিসেন্ট প্রাণী তাদের দেহের বিশেষ এক রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই আলো তৈরি করতে পারে। লুসিফারেজ নামক এক বিশেষ এনজাইমের কারণে আলো তৈরি হয় প্রাণী দেহে।

আপনি জানলে অবাক হবেন পৃথিবীতে শতকরা প্রায় ৭৬ ভাগ সামুদ্রিক প্রাণীই বায়োলুমিনিসেন্ট। এরা শরীর থেকে প্রধানত দুই উপায়ে উজ্জ্বল আলো তৈরি করতে পারে। এগুলো হলো- দেহের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক পরিবর্তন এবং শরীরে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়ার কারণে। সমুদ্র ছাড়া স্থলেও এমন অনেক প্রাণী রয়েছে। জোনাকি পোকা এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। এরা ছাড়াও বিশেষ কিছু প্রজাতির গুবরে পোকার বায়োলুমিনিসেন্স রয়েছে।

জোনাকি

জোনাকি আমাদের কাছে সবচেয় পরিচিত বায়োলুমিনিসেন্ট প্রাণী। ইট-পাথরের শহরে জোনাকির দেখা না মিললেও গ্রাম অথবা যেসব এলাকায় বাগান, বন-জঙ্গল রয়েছে, সেখানে প্রায়ই জোনাকি দেখা যায়।

পৃথিবীতে প্রায় ২ হাজার প্রজাতির জোনাকি পোকা দেখা যায়। তবে তাদের সবাই কিন্তু আলো তৈরি করতে পারে না। নিজের দেহ থেকে আলো তোলার প্রধান কারণ হলো শিকার ধরা অথবা বিপরীত লিঙ্গকে প্রজননের জন্য আকৃষ্ট করা। আলো তৈরির জন্য এদের দেহে রয়েছে কিছু বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ। এগুলো হলো ক্যালসিয়াম, অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট, লুসিফেরিন ও লুসিফারেজ এনজাইম। দেহের যে অঙ্গে এগুলো মিলে বিক্রিয়া ঘটে, সেটি সাধারণত বেশ পাতলা ও স্বচ্ছ হয়। রাসায়নিক পদার্থগুলো অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসলেই বিক্রিয়া ঘটে এবং সবুজ ও হলুদ বর্ণের আলো উৎপন্ন হয়।

তবে প্রজনন ছাড়াও কিছু স্ত্রী জোনাকি রয়েছে যারা নিজেদের আলো দেখিয়ে পুরুষ জোনাকি পোকাকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে মাটির কাছে নিয়ে যায় এবং পুরুষ পোকাটিকে মেরে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

সামুদ্রিক অ্যাংলারফিশ

সমুদ্র তলদেশে প্রায় ১৫০০-২০০০ মিটার গভীরে বিচরণ করা এক অদ্ভুত মাছ অ্যাংলারফিস। মাছটি দেখলে মনে হবে স্টিফেন কিংস-এর কোনো হরর গল্পের প্রাণী। শরীরের তুলনায় অনেক বড় এ মাছের চোয়াল। তাতে রয়েছে অসংখ্য করাতের মত দাঁত। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত জিনিসটি রয়েছে এর মাথার অগ্রভাগে থাকা অ্যান্টেনার মতো এক ধরনের শুঁড়। এই শুঁড়ের শেষভাগে জ্বলে আলো। দেখতে অনেকটা স্মার্টফোনের ফ্ল্যাশ লাইটের মতন। ফাইটোপ্ল্যাংকটন নামক একপ্রকার ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে অ্যাংলারফিশ এই আলো তৈরি করে। সমুদ্র থেকে ২০০০ মিটার নিচে সূর্যের আলো পৌছায় না। তবে চলাচলের সুবিধার জন্যে অ্যাংলারফিস আলো তৈরি করে না। মূলত শিকারকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করাই তাদের আলো তৈরির রহস্য। অন্ধকারে আলো দেখে শিকার আছে এলেই অ্যাংলারফিস তাদের করাতের মত দাঁত দিয়ে শিকার ধরে ফেলে।

পুরুষ অ্যাংলারফিসের তুলনায় স্ত্রী অ্যাংলারফিস আকারে অনেক বড় হয়। প্রজনন মৌসুমে এ মাছ প্রায় ১০০-১০০০ ডিম দেয়। এই অদ্ভুত মাছগুলি প্রায় ১০-১৫ বছর বেঁচে থাকে। প্রশান্ত মহাসাগর, অ্যাটলান্টিক মহাসাগর ও ভারত সাগর এদের আবাসস্থান।

স্কুইড

সামুদ্রিক প্রাণী স্কুইডের কথা আমরা সবাই জানি। বিশেষ করে অনেক দেশে স্কুইড একটি জনপ্রিয় খাবার। তবে আপনি জানেন কি, স্কুইডেরও রয়েছে আলো তৈরির ক্ষমতা। তবে অ্যাংলারফিসের মত শিকার করার জন্য নয়, বরং শিকারি প্রাণীর হাত থেকে বাঁচতে আলো তৈরি করে স্কুইড।

স্কুইডের দেহে আলো তৈরির মূল উৎস হলো কিছু বিশেষ ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া ও স্কুইড হলো মিথোজীবী। মিথোজীবী বলতে বুঝায়, যখন দুটি ভিন্ন প্রাণী একে অন্যের সাহায্যে বেঁচে থাকে। স্কুইড এই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে খাদ্য হিসেবে অ্যামিনো এসিড ও শর্করার জোগান দেয়। বদৌলতে ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেদের বায়োলুমিনিসেন্স ক্ষমতা দিয়ে স্কুইডদের শত্রু থেকে রক্ষা করে। কিছু প্রজাতির স্কুইড শিকারি প্রাণীর হাত থেকে বাঁচার জন্য উজ্জ্বল তরল মিউকাস দেহ থেকে নিঃসৃত করে। এভাবে এরা শিকারিকে দ্বিধায় ফেলে পালিয়ে যায়। আবার কিছু স্কুইড রয়েছে যেগুলো নিজেদের স্বচ্ছ শরীরকে উজ্জ্বল করার মাধ্যমে ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে। এই ধরনের একটি স্কুইড হলো ববটেইল স্কুইড।

ক্রিস্টাল জেলি ফিস

সামুদ্রিক প্রাণীর মধ্যে দেখতে অন্যতম সুন্দর একটি প্রাণী হলো জেলিফিশ। বিশাল সমুদ্রে ভেসে থাকা জেলি ফিস দেখতে চমৎকার হলেও এরা বেশ বিষাক্ত প্রাণী। কিছু প্রজাতির জেলি ফিস রয়েছে যারা আলো তৈরি করতে পারে। তাদের এক প্রজাতি ক্রিস্টাল জেলি ফিস। এদের কর্ণিকা থেকে সবুজাভ নীল বর্ণের আলো নির্গত হয়। তবে এদের আলো তৈরির পেছনে তেমন কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নেই। এরা এদের আঠালো কর্ণিকা দিয়ে শিকার আঁকড়ে ধরে এবং নিজেদের দেহের প্রায় অর্ধেক আকৃতির শিকার ভক্ষণ করতে পারে।

মুন জেলিফিশ

জেলিফিশ পরিবারের আরেক আলো তৈরি করতে পারা প্রজাতি হলো মুন জেলিফিশ। এরা নিজেদের দেহে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আলো তৈরি করতে পারে। এদের দেহে লুসিফেরিন নামক এক ধরনের পদার্থ থাকে। যা পানিতে থাকা অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে লুসিফেরেজ এনজাইম তৈরি করে। মুন জেলিফিশের দেহের ৯৫ ভাগই পানি। খাবার হিসেবে প্ল্যাংকটিন, মাছের ডিম ও ছোট ছোট চিংড়ি খেয়ে থাকে।

পৃথিবীতে অদ্ভুত ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাণীর অভাব নেই। প্রাণীটি কোন পরিবেশে রয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে এদের নানা রকম শারীরিক পরিবর্তন ঘটে। মূলত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকা এবং বংশবৃদ্ধির জন্যই এসব শারীরিক পরিবর্তন ঘটে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত