ঢাকা, সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ আপডেট : ১২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২০, ১৮:৩৩

প্রিন্ট

মনের ক্ষুধা মিটানোর জন্য দরকার বই

মনের ক্ষুধা মিটানোর জন্য দরকার বই
ফিচার ডেস্ক

সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক ও উপন্যাসিক কিঙ্কর আহসান। বিজ্ঞাপন নির্মাণ, স্ক্রিপ্ট রাইটিং, ডকুমেন্টারি নির্মাণের পাশাপাশি লেখালেখি করেন। সবকিছু ছাপিয়ে লেখক পরিচয়টা সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন। স্বপ্ন দেখেন পৃথিবী একদিন বইয়ের হবে। তার ১৩তম বই ‘মেঘডুবি’ পেয়েছে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা। করোনার ভয়াবহ সময়েও ঘরে বসেই চলছে তার কাজকর্ম। বই নিয়ে পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ততার মাঝেও কথা বলেছেন বাংলাদেশ জার্নালের সাথে। আলাপচারিতা চালিয়েছিলেন ইসমাইল উদ্দিন সাকিব

করোনার প্রভাব আগামী বইমেলায় পড়বে কি?

➤ প্রভাব অবশ্যই ফেলবে। আমাদের বইয়ের মার্কেট যেটা, সেটা এখনো ইন্ডাস্ট্রি হয়ে উঠেনি। প্রকাশকরা অনেক লড়াই করছে, লেখকদেরও আয় পর্যাপ্ত না। মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কমছে। সেই জায়গা থেকে করোনা আসার পর সবাই অনেক বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ একমাত্র অনলাইন ছাড়া অফলাইনে বই বিক্রি করার উপায় ছিল না। আর সরকার তো এটাকে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে মনে করে না, অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতে যেমন পরিপূর্ণ ব্যবস্থা ছিল বইয়ের জায়গায় আমাদের সেরকম কোনো ব্যবস্থা নাই। সেই জায়গা থেকেই আমি মনে করি এটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটা ধাক্কা। সামনে আসলে বইমেলা হবে কি না! দেশের বাইরে যে বইমেলাগুলো হতো সেগুলো এবার হচ্ছে না। কলকাতা বইমেলা, টোকিও বইমেলা হচ্ছে না। সবকিছু মিলিয়ে সামনে বইমেলা হবে কি না সেটা একটা ভয় থেকেই যায়। আবার বইমেলা যদি হয়ও এতো মানুষের লোকসমাগম হবে কি না, সেখানে এতো পরিমাণ বই বিক্রি হবে কি না, সবকিছু মিলিয়ে একটা শঙ্কা থেকেই যায়। এই বছর বই কিভাবে লিখবো, কেমনে লিখবো একটা অস্থিরতা কাজ করে। কিন্তু আমি খুব আশাবাদী। আমার মনে হয় বইমেলা হবে। অনেক লোকসমাগম হবে। মানুষজন বই কিনবে। কিছু পরিকল্পনা নিচ্ছি। সেই অনুযায়ী সামনের বইমেলায় আমার অনেকগুলো বই থাকবে। আমার বড় যেই বইটি আসছে ‘জলপড়ানি’ নামের একটি উপন্যাস। সেটা নিয়ে এখনো কাজ চলছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ইনশাল্লাহ সামনের বইমেলায় এই বইটি পাওয়া যাবে।

গবেষণা বলছে মানুষ ৮ মিনিট ভিডিও দেখলে বিরক্ত হয়ে যায়। এক সময় মানুষ বিনোদনের জন্য বই পড়ত। এখন ভিডিও দেখে, এর প্রভাবে বইয়ের পাঠক কমে যাচ্ছে বলে মনে হয়?

➤ প্রথমত আমাদের এই ধারণাটা ভুল। বই আসলে বিনোদনের কাজই করে না। পেটের খুদা মিটানোর জন্য চাল, ডাল এগুলোর প্রয়োজন নয়। মনের খুদা মিটানোর জন্য আসলে বই দরকার। একটা মানুষ ম্যাচিউর হলো কি না, সে শারীরিকভাবে বড় হচ্ছে কিন্তু মানসিকভাবে বড় হচ্ছে কিনা সেটা ঠিক করে বই। মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে একটি হলো বই। বাইরের দেশে স্কুল-কলেজে দেখা যায় তাদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস পড়তে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা হয় না। যার কারণে আমরা একটা শো-অফ এর জীবনযাপন বেঁচে নিয়েছি। আমাদের জীবনে অনেক অস্থিরতা। আমাদের ব্যবহারগত ঝামেলা তৈরি হচ্ছে, আচরণগত ঝামেলা তৈরি হচ্ছে, নানা বীভৎস ঘটনা আমরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। আমাদের ভেতরে মূল্যবোধের জায়গাগুলো আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। মানসিক শান্তির জন্য, মনের ক্ষুধা মিটানোর জন্য বই দরকার এবং এটা যতক্ষণ সরকার থেকে, পরিবার থেকে প্রেশারটা আসবে না ততক্ষণ পর্যন্ত এই জায়গাটা ঠিকঠাক উন্নত হবে না। আরেকটা জায়গা যেটা আমার মনে হয় বই হচ্ছে একটা গ্লামারের জায়গা। পৃথিবীর সকল দেশের লেখকদের বলা হয় তারা তারকা নয়, তারা মহা তারকা। তাদের নিয়ে লাখো মানুষের ভিড় হয়, তাদের বই থেকে সিনেমা হয়, মাথামাথি হয়। টোকিও বইমেলাতে দেখেছি আমাকে শহর চিনানো হচ্ছে মোরাকামি বই থেকে। আমাদের দেশে যা হয় আমি দেখেছি বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাওয়া লেখক যাকে বলা হয় খ্যাতিমান বা জনপ্রিয়। তিনি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে দিয়ে যাচ্ছেন তাকে পাঁচজনে চিনতে পারছে না কিন্তু সেখানে একজন শিল্পী বা ইউটিউবারকে নিয়ে গেলে লাখো মানুষের ভিড় হয়। একটা জাতি আসলে কতটুকু আগালো, কতটুকু শুদ্ধ মনের অধিকারী হলো সেটা কিন্তু বুঝা যায় সে আসলে লেখককে কতটুকু সম্মান করছে। দুই কোটি মানুষের শহর ঢাকা সেখানে ২৮ লাখ মানুষের ভিড় হয় ভ্যালেনটাইন্স ডে আর পহেলা বৈশাখে। সেখানে অন্তত একজন লেখকের বই এমনেই এক-দুই লাখ কপি বইমেলায় বিক্রি হওয়ার কথা। সেখানে ৩০০ বই বিক্রি হওয়া মানে মনে করা হয় লেখকের অনেক বই বিক্রি হচ্ছে। আমাদের বই দশ-পনেরো হাজার বিক্রি হচ্ছে মানে আমাদেরকে জনপ্রিয় বলে দাবি করা হয়। আমার মনে হয় এটা একদমই হতাশার ব্যাপার। এই জায়গা থেকে তখনই বের হয়ে আসতে পারবো যখন সিরিয়াসলি বলতে পারবো যারা বই পড়ে তারা মানুষ, আর যারা পড়ে না তারা শুদ্ধ মানুষ হওয়ার জন্য বই পড়া দরকার। দামি জুতা বা ঘড়ি পড়াটা স্মার্টনেস না। তুমি যদি স্মার্টনেসে পরিণত করতে চাও তোমার হাতে বই থাকা দরকার। ঘর থেকে বের হলে যেমন চাল, ডাল পাওয়া যায় তেমন বইও পাওয়া যেতে হবে। আমাদের লাইব্রেরীতে তেমন বই নাই, তালা দেয়া থাকে। আমাদের দেশে লেখকদের কোনো লাইফস্টাইল নাই। লেখক মানে গরিব, দরিদ্র, নেশা করতে হবে এরকম একটা ধ্যান ধারণা। লেখকরা কি, কারা লাইফস্টাইলটা যতক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তন হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সন্তান বা প্রজন্ম চাইবে না যে সে বড় হয়ে লেখক হবে এবং তাদের অভিভাবকরাও চাইবে না তাদের সন্তান লেখক হোক। তাই লেখকদের একটা লাইফস্টাইল হওয়া দরকার, একটা ইন্ডাস্ট্রি হওয়া দরকার এবং বই বিক্রি হওয়া দরকার। এভাবে নিয়মই করে ফেলা দরকার যে প্রতি মাসে প্রতিটি পরিবার এতগুলো বই কিনে পড়বে। এটা যখন হবে আমার মনে হয় আমরা এসব জায়গা থেকে বের হয়ে আসবো। আর আমি আশাবাদী একারণে কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি প্রতি বছর আমার পাঠকের সংখ্যা বেঁড়ে যাচ্ছে। আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি এবং খুব আশাবাদী।

অভিভাবকেরা পাঠ্য বইয়ের অন্য বই পড়তে দেন না। এর মাঝে উপকারিতা দেখেন না। তাদের ব্যাপারে কী বলবেন, উপকারিতা আসলেই কোথায়?

➤ ৮০ দশকের পর আমাদের দেশের মানুষদের অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমরা টাকাপয়সা চিনতে শুরু করি। আমাদের ভিন্ন দেশের একজন বলেছিল আমাদের দেশে যারা ধনী তারা নিজেদের জাহির করে কার কয়টা গাড়ি, বাড়ি আছে সেসব দিয়ে। আর বাইরের দেশে ওরা আসলে নিজেরা যে ধনী সেটা প্রকাশ করে লাইব্রেরীতে কত বই আছে, ওদের বাড়িতে কতগুলো দামি পেইন্টিং আছে। এই জায়গাটাই আমার মনে হয় আমাদের শিক্ষার ঘাটতি আছে। আমাদের অভিভাবক হয়তো বুঝতে পারেনি। আমি কিছুদিন আগে একটা নিউজ দেখছি সিলেটে ক্লাস সেভেনে পড়া একটা মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। তাকে তার পছন্দের একটা জিনিস দেয়া হয়নি সেজন্য অভিমান করেছে। আমি ছোটবেলায় অনেক কষ্ট দেখছি। আমি নিজে ভাবছিলাম এইরকম অভিমান করলে আমার অন্তত ৫০-৫৫ বার আত্মহত্যা করার কথা। সেটা করিনাই কেনো! যখনই আমার মন খারাপ ছিল তখনই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু সেই আসলে বই। সে একটা গোপন অদৃশ্য বন্ধু হয়ে যায়। যখন আমার মন খারাপ হয় তখনই আমি বই পড়া শুরু করি। আমার মন শান্ত হয়ে গেছে। আমি আবার চোখ মুছে পরের দিন আবার কাজে মনোযোগ দিয়েছি। যদি নিজের সন্তানকে মানুষ করতে হয় টাকা অনেক হতে পারে, টাকা হওয়ার পর সে যদি মা-বাবাকে ছেড়েই চলে যায়, তার ভেতরে বোধের জায়গা তৈরি না হয়, আমরা পড়াশুনা করি বোধের জন্য, সার্টিফিকেটের জন্য না। তাই অভিভাবক যদি নিজের সন্তানকে মানুষ করতে চাই তাহলে বই পড়তে দিতে হবে। বই যদি পড়ে তখন সে মানুষ হয়ে উঠবে আমি এটাই মনে করি।

বাংলা সাহিত্যে মধ্যবিত্ত নিয়ে গল্প কেন প্রচুর। এ জাতি আবেগী বলে? আপনার একটি উপন্যাসই আছে মধ্যবিত্ত।

➤ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা প্রচুর স্বপ্ন দেখে। তারা তাদের সেই জায়গা থেকে নিজেদের একটা জায়গায় আনতে চায়। মধ্যবিত্তদের মধ্যে কিছু মূল্যবোধের জায়গা আছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে ১০০ জন রাইটারের মধ্যে দেখা যাবে ৯৫ জনই মধ্যবিত্ত থেকে উঠে আসা। একজন লেখক সবার আগে নিজের জীবনটাকে লেখে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে পাঠকদের মধ্যে বড় অংশটাই মধ্যবিত্ত। যারা পড়াশুনা করে তারা শিক্ষাটাকে অবলম্বন করে নিজেকে বদলাতে চায় সেই জায়গা থেকে মধ্যবিত্ত সমাজকে ধরার জন্য তারা যাতে গল্পটা রিয়েক্ট করতে পারে, দুঃখ দুর্দশা, আবেগ অনুভূতি যাতে অনুভব করতে পারে সেই জায়গা থেকেই মধ্যবিত্ত গল্পটা উঠে আসে। আমি যদি একটা জেলের জীবন আঁকতে চাই তখন এই গল্পটা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান যতটা রিয়েক্ট করতে পারবে তার চেয়ে আমি একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তার স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা, তার পরিবারের আর্থিক অবস্থার টানা-পূরণের কষ্ট এটা যদি আঁকি সেই গল্পটা ও আরো বেশি রিয়েক্ট করতে পারবে। ওর একসময় মনে হবে লেখকটা আমার কথাটাই বলছে এবং পাঠকরা তখনই আনন্দ পায় যখন তিনি ঠের পান তার কথাগুলো লেখক বলে দিয়েছে। সেই জায়গা থেকেই আমার মনে হয় মধ্যবিত্তের গল্পগুলো বাংলা সাহিত্যে উঠে আসার কারণ।

একসময় লেখক জনপ্রিয় হত, এখন জনপ্রিয় ব্যক্তি লেখক হচ্ছেন, এ ব্যাপারে কী বলবেন? তাদের লেখার মান কতটুকু?

➤ জনপ্রিয় ব্যাপারটাকে কখনো অস্বীকার করা যায় না। জনপ্রিয় মানে একটা নির্দিষ্ট জনসমষ্টির প্রিয় যে মানুষ। তাকে অস্বীকার করা যায় না। তাকে অস্বীকার করলেই ঐ জনসমষ্টিকেই অস্বীকার করা। আমাদের দেশে অনেক সময় মনে করা হয় যারা জনপ্রিয় তাদের লেখার মান নেই। তাদের অস্বীকার করার চেষ্টা করে অনেকেই। অনেকে জনপ্রিয় হয়ে লেখালেখিতে এসেছেন এটাকে আমি খারাপ দেখি না কারণ, পৃথিবীর সকল জায়গায় দেখা যায় সাপ্তাহিক তালিকাতে ৫টা বইয়ের মধ্যে ২টা মোটিভেশনাল বই। যে লেখাটা জীবনকে প্রতিনিধিত্ব করে সেই লেখা নিয়ে মানুষের ভিড় কম। হাস্য রসাত্মক মানে যেসব জিনিসের গভীরতা কম সেসব জিনিস নিয়ে যদি ভিড় থাকে তাহলে বুঝতে হবে লেখকরা তাদের পাঠকদের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। লেখকরা একেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো এবং তারা পাঠকদের সাথে কানেক্ট করতে পারছেন না, পাঠকরা পিছিয়ে পড়েছেন বলেই এখন ঐসব জায়গায় ভিড় বেশি হচ্ছে। আমি ওর জনপ্রিয়তাকে প্রশ্ন তুলতে পারি না। বরং মনে করতে পারি এটা আমার ব্যর্থতা। ঐ মানুষকে নিয়ে যে ভিড় হচ্ছে সেই ভিড়টাকে আমি আমার দিকে ফেরাতে পারছি না। আমার মনে হয় এসব অবস্থা দেখলে লেখকদের আরো বেশি সিরিয়াস হওয়া দরকার। আমাকে আরো বেশি সময় দেয়া দরকার পাঠকদের কাছাকাছি থাকার জন্য। আমি কাউকে খারাপ ভাবে দেখি না কারণ ঐ জনপ্রিয় লোকটার জন্যেও যদি ১৫ জন লোক মেলায় ডুকে সেই ১৫ জনের ভেতর ৫ জনকে যদি আমি আমার দিকে নিয়ে আসতে পারি বা বই পড়ার দিকে আগ্রহ তৈরি করে ফেলতে পারি ওটাই আমার লাভ। আমার কথা হচ্ছে বইকে ঘিরেই ভিড়টা হোক। আমি বলতে পারি না ওর লেখার অধিকার আছে বা ওর নাই। সে যদি জনপ্রিয় হয়ে লিখতে চায় সে পারেই। তাকে ঘিরে যদি ভিড় হয় সেটা তার যোগ্যতা। লেখা লেখবে এটাই স্বাভাবিক। কখনো গায়ক লেখবে কখনো নায়ক লেখবে লিখতেই পারেন তিনি। তার লেখা আটকানোর ক্ষমতা আমার নেই এটা বলা উচিৎও না। দিন শেষে সময় এবং পাঠকরাই নির্ধারণ করবে কার বইটা টিকে থাকবে।

লেখক হতে হলে সকলেই বলেন পড় পড় পড়। শুধু পড়লেই কি লেখক হওয়া যায়? আপনার কী মত? জীবিকা হিসেবে লেখক পেশাটা কতটাই বা নিরাপদ?

➤ লেখক হওয়ার জন্য আসলে কোনো ব্যাকরণ নিয়ম নীতি নেই। যদি থাকতো তাহলে রবীন্দ্রনাথের সন্তান সবচেয়ে বড় লেখক হতেন। কারণ তার কাছে সকল ফর্মুলাই জানা। তাই লেখক হওয়ার জন্য কোনো ব্যাকরণ বা নিয়ম নীতি নেই। তবে হ্যাঁ মাহমুদুল হক যেটা বলেন একজন লেখক যখন লিখতে বসেন তিনি আসলে স্রষ্টার নিকটে থাকেন। একজন লেখক যখন শুরু করে তখন একটা কাচের মতো থাকে। কাচ কেটে কেটে হীরা বানানোর জন্য তাকে কিন্তু পরিশ্রম করতে হয়। সেই পরিশ্রমটা হচ্ছে প্রচুর পড়া। আর পড়া মানে শুধু বই পড়া না, মানুষের জীবনকেও পড়তে হবে। সে যতো বেশি পড়বে, জানবে, ঘুরবে তার ভেতরে ঐ জায়গাটা পরিণত হবে। লেখকদের জন্য পড়ার কোনো বিকল্প আছে বলে আমার মনে হয় না। আর আমার যেটা মনে হয় লেখালেখিতে পার্টটাইম বলতে কিছু নেই। আমি নিজেই অনুভব করি একজন লেখক তার চরিত্রগুলো, তার উপন্যাসগুলো তার কাছে সময় দাবি করে। সেখানে যখন গুঁজামিল দেয়া হয় তখন লেখার সততাটা থাকে না। আর আমি সবসময় অনুভব করি আমি যদি পুরোটা সময় লেখালেখিতে দিতে পারতাম আমি হয়তো আরো দারুণ কিছু করতে পারতাম, আরো ভালো কিছু করতে পারতাম। আমি যদি একটা সচ্ছল জীবন যাপনের জন্য আমার পরিবারটাকে ঠিক রাখার জন্য যে টাকাটা দরকার সেটা যদি আয় করতে পারি তাহলে আমি পুরোপুরি লেখালেখিতে মন দিতে চাই। এখনো সেটা সম্ভব হচ্ছে না তাই পার্টটাইম করতে হচ্ছে। সেটার জন্য আমাদের বই পড়ার অভ্যাসটা আরো বাড়াতে হবে এবং বই কিনার অভ্যাসটা বাড়াতে হবে। আমি কাউকে সৌজন্য সংখ্যা দিতে চাই না। কারণ আমার মনে হয় বইটা আসলে কিনে পড়ার জিনিস। আমার এক বন্ধু আমাকে বলেছিল তোর বই ২০০ টাকা দিয়ে কিনলাম প্রতি পাতা ২ টাকা করে পড়লো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি ৬০ পাতা লিখেন আর আমি যদি ৬০ পাতা লিখি দুইটা কিন্তু এক কথা না। তাদের কনটেন্টের একটা দাম আছে। পাতা গুণে আসলে বইয়ের বিক্রি এটা শুধুমাত্র আমাদের দেশেই হয়। কারণ আমি অনেক দেশেই দেখেছি ৩০ থেকে ৬০ পাতার বই বাংলাদেশি টাকায় ৭০০ টাকা বা তার চেয়েও বেশি। এটা আসলে কনটেন্টকে একটা দাম দিতে হয়। আমরা কনটেন্ট এর দামটা দিতে পারি না। বই কিনার অভ্যাস যখন তৈরি হয়ে যাবে তখন এধরণের সমস্যাগুলো চলে যাবে আমার মনে হয়।

আপনার একটি গল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণের কাজ হবে বলেছেন। এ ব্যাপারে বলুন।

➤ আমার ‘কাদের আইসক্রিম’ নামের একটা ছোট গল্প আছে সেটা নিয়ে একটা শর্ট ফিল্ম হয়েছিলো। সেটা বাইরের দেশের বিভিন্ন ফেস্টিবলে জমা দেয়া হয়েছে। এক বছর সময় লাগবে এটার জন্য কিন্তু করোনার জন্য পিছিয়ে গেলো। আমার আরেকটা গল্প নিয়ে মুম্বাইতে শাফিন আলী নামের একজন ডিরেক্টর কাজ করছিলো সেটাও আসলে করোনার জন্য আটকে গেলো। আমার আরেকটা ওয়েভ সিরিজ হওয়ার কথা ছিল ‘মিডেল ক্লাস’ নামের সেটাও করোনার জন্য আটকে আছে।

পরবর্তী বই কি আসছে?

➤ আমার একটা ইচ্ছা ছিল কলকাতার বইমেলাতে ‘বাগবিধবা’ নামের একটা উপন্যাস আনবো। কিন্তু যতটুকু শুনছি এবার কলকাতায় বইমেলা হবে না। যদিও নাও হয় সবকিছু স্বাভাবিক হলে আমি চেষ্টা করছি বাগবিধবা বইটি নিয়ে আসার। এরমধ্যে কয়েকটা পাবলিকেশনের সাথে কথা হয়েছে যেকোনো একটার সাথে চুক্তি করে ফেলবো। বাগবিধবা বইটি আসবে এতটুকুই কথা দিতে পারছি কারণ বইটাই লেখা শেষ, প্রচ্ছদের কাজও শেষ। ‘জলপড়ানি’ বইয়ে সময় দিতে পারছি না ওইভাবেই কারণ নতুন চাকরিতে জয়েন করেছি ওখানে সময় দিতে হচ্ছে। কিন্তু ইচ্ছা আছে সামনের মেলায় জলপড়ানি বইটি আনার। আমার ‘মকবরা’ নামের একটা উপন্যাস ছিল সেই উপন্যাস পাঠকদের কাছে পৌঁছায়নি। আমার শুরুর দিকের উপন্যাস সেটা আউট অফ স্টক ছিল। সেই উপন্যাসটা নতুন করে মানুষের সামনে নিয়ে আসতে চাচ্ছি। এই তিনটা বই কোনটা কোন মাসে আসবে সেটা বলতে পারছি না তবে ২০২১ বইমেলার আগেই আমি এই তিনটা বই আনতে চাই।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত