ঢাকা, শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ আপডেট : ৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২১ মে ২০২০, ১৩:৫২

প্রিন্ট

সুস্থ হওয়ার উপায় জানালেন করোনা জয়ী ডাক্তার

সুস্থ হওয়ার উপায় জানালেন করোনা জয়ী ডাক্তার

Evaly

জার্নাল ডেস্ক

করোনা থেকে সুস্থ হওয়ার উপায় জানিয়েছেন করোনা জয়ী ডা: রেফায়েত উল্লাহ প্রধান। সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে তিনি এক স্ট্যাটাসে তুলে ধরেন করোনায় আক্রান্ত হওয়া থেকে সুস্থ হওয়ার প্রতিটি ধাপ। বাংলাদেশ জার্নালের পাঠকদের জন্য তার সেই স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো-

আপনারা অনেকেই আমার কাছে জানতে চেয়েছেন করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত আমার জার্নি টা কেমন ছিল। এটা নিয়ে বেশ কিছুদিন আগেই লিখতে চেয়েছিলাম কিন্তু শরীর অত্যধিক দুর্বল থাকার কারণে লিখতে পারিনি। আজ সংক্ষেপে লেখার চেষ্টা করছি। আমার এই লেখা পড়ে একজন মানুষও যদি উপকৃত হয় তবেই কষ্ট করে এই লেখাটা সার্থক হবে।

যেভাবে আক্রান্ত হলাম: আমি ধানমন্ডিতে একটা আইসিইউ তে জব করতাম। যেহেতু আমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জব করতাম সেহেতু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তরের কোনো সাহায্য সহযোগিতা শুরু থেকেই পাই নাই। পাশাপাশি হসপিটাল কর্তৃপক্ষ সেফটি ম্যাটেরিয়াল গুলো ঠিকমতো দেয়নি। তারপরও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে, বিবেকের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ডিউটি চালিয়ে যাই। নিজস্ব প্রচেষ্টায় যতটুকু পেরেছি পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট ম্যানেজ করেছি, তারপরও আক্রান্ত হয়ে যাই হসপিটালের কিছু অব্যবস্থাপনার কারণে। হয়তোবা আমারও কিছু ভুল ছিল, আরও সতর্ক থাকা দরকার ছিল। আমার লিস্টে যারা ডাক্তার ভাই ও বোনেরা আছেন তাদের প্রতি রিকোয়েস্ট একেবারে শিওর না হয়ে এন৯৫ মাস্ক কিনবেন না, কারণ এটা মনের মধ্যে ফলস কনফিডেন্স তৈরি করে। ফলে আপনি অসতর্কভাবে কাজ করবেন এবং আক্রান্ত হবেন। পিপিই এর মধ্যে অন্য কোন কিছু ব্যবহার করেন আর না করেন কয়েকটা জিনিস অবশ্যই ব্যবহার করবেন অরিজিনাল টা।

১। n95 mask

২। Surgical mask

৩। goggles

৪। Hand gloves

৫। Face shield

যারা সাধারন মানুষ আছেন তারা অন্তত ২ এবং ৪ নম্বর আইটেম টা ব্যবহার করবেন অবশ্যই। আশা করি এতে আপনি অনেকাংশে নিরাপদ থাকবেন ইনশাআল্লাহ।

যেভাবে বুঝলাম আমি আক্রান্ত হয়েছি: আপনারা ইতোমধ্যে সবাই জানেন কি কি সিম্পটম হতে পারে এবং এটাও জানেন যে অনেকের কোন সিম্পটম থাকেনা। আমার যে সিম্পটম গুলো হয়েছিল সেগুলো এখানে উল্লেখ করছি।

১। প্রথম দিন হয়েছিল শরীর ব্যথা। একেবারে প্রতিটা জয়েন্ট ও মাংসপেশিতে প্রচন্ড ব্যথা ছিল। এরপর আস্তে আস্তে ব্যাথা বেড়েছে।

২। প্রথম দিন জ্বর ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছিল। এরপর সেটা বেড়ে ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত হয়েছিল।

৩। লুজ মোশন ছিল।

৪। তৃতীয় দিন এসে খাবারের স্বাদ পেতাম না। জ্বর কমে গেল। শরীর ব্যথা কমে গেল। কিন্তু প্রচণ্ড মাথাব্যথা শুরু হল।

৫। পঞ্চম দিন এসে শ্বাসকষ্ট শুরু হল। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ফ্লাকচুয়েট করা শুরু করলো। বমি শুরু হলো।

যেভাবে আমি কভিড টেস্ট করলাম: আপনারা সবাই ইতোমধ্যে জানেন বাংলাদেশের কোথায় কোথায় টেস্ট করানো হয়। যাইহোক, আমি করেছিলাম আমার মেডিকেল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হসপিটালে। এক্ষেত্রে আমাকে সহযোগিতা করেছেন ডা. মতিন ভাই, ডা. তন্ময় ভাই, ডা. সাদিয়া আপু এবং ডা. শরীয়ত উল্লাহ সৌরভ।

এক্ষেত্রে আপনাদেরকে একটা পরামর্শ দিতে চাই আমি, যদি একেবারে স্ট্রং সিম্পটম না থাকে কিংবা পজিটিভ কোন রোগীর সংস্পর্শে আসার হিস্ট্রি না থাকে কিংবা যে সমস্ত অঞ্চলে করোনা বেশি সেই সমস্ত অঞ্চলে ভ্রমণের ইতিহাস না থাকে তাহলে সরকারি হাসপাতালে যেয়ে কভিড টেস্ট করানো অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ কারণ, দেখা গেল আপনি নর্মাল ফ্লুতে আক্রান্ত কিন্তু করোনায় আক্রান্ত নন। এখন সরকারি হসপিটালের ১৫০/২০০ মানুষের ভিতরে টেস্ট করাতে গিয়ে দেখা গেল আপনি তাদের থেকে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপরও যদি একান্তই টেস্ট করানো প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে টাকা পয়সা একটু খরচ হলেও প্রাইভেট হসপিটাল থেকে করানো অনেকটাই নিরাপদ। কারণ সেখানে ভিড় কম থাকে।

আমি কখন হসপিটালে ভর্তি হলাম: আমার কোভিড টেস্ট পজিটিভ আসার পর মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লাম। এবং শারীরিক অবনতি ও হতে শুরু করে। অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমা শুরু হল। শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। এতটাই শ্বাসকষ্ট যে আমি আর রিস্ক নিলাম না, হসপিটালে চলে গেলাম।

আপনারা ইতোমধ্যে জানেন যে বাংলাদেশে কোন কোন হসপিটাল গুলোতে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হয় সরকারি বা বেসরকারিভাবে।

আমি অনেক ভেবেচিন্তে সরকারি হাসপাতালে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার ফ্যামিলির সিদ্ধান্ত ও ছিল প্রাইভেট হসপিটালে আমাকে চিকিৎসা করানো। এখানে অনেকগুলো কারণ আছে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পিছনে। তবে মূল যে বিষয়টা আমার ভিতর কাজ করেছে সেটা হল, আমি সম্পূর্ণ একা থাকতে চেয়েছি। অসংখ্য পজিটিভ রোগীর মাঝে আমি থাকতে চাই নি। যেটা আমি সরকারি হাসপাতালগুলোতে পাবো না, তাই বেসরকারি হসপিটালে ভর্তি হয়েছিলাম। আমি রিজেন্ট হসপিটাল, মিরপুর-১২ তে ভর্তি ছিলাম। তাদের কাছ থেকে অন্যরা কি সার্ভিস পেয়েছেন না পেয়েছেন আমি সেটা বলবো না, তবে আমি তাদের কাছ থেকে মোটামুটি ভালো মানের সার্ভিস ই পেয়েছি। এই হসপিটালে ভর্তি তে আমাকে অত্যন্ত সহযোগিতা করেছেন আমার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সম্মানিত পরিচালক, অধ্যাপক ডাক্তার উত্তম কুমার বড়ুয়া স্যার। আমি স্যারের কাছে সবসময়ের জন্য কৃতজ্ঞ থাকব।

কি কি ওষুধ দিয়ে হসপিটাল থেকে আমাকে চিকিৎসা করা হয়েছিল: আমি এখানে শুধু ওষুধগুলোর নাম বলবো, ডোজ বলবো না। কারণ ডোজ এক এক রোগীর ক্ষেত্রে এক এক রকম হবে। এবং ওষুধ ও সিম্পটম অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। আর এই ওষুধগুলো ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনাভাবেই সেবন করা উচিত নয়। আমাকে দেওয়া ওষুধ গুলো হলো-

* Napa

* Azithromycin

* Hydroxychloroquine

* Ceftriaxone

* Cardinex

* Methipred

* Omidon

* Omeprazole

* Xinc B

* Cveet

* Nebulization

* High flow oxygen

* Ivermectin (অন্য আরেক ডাক্তারের পরামর্শে শুধু প্রথম দিন খেয়েছিলাম)

এছাড়াও হোমিওপ্যাথিক সিস্টেমের অ্যান্টিভাইরাল ( R88) খেতাম আমি। হামদর্দের কুলজুম ব্যবহার করতাম।

নন ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যাপ্রচ হিসেবে যা যা করতাম:

১। প্রতিদিন দু’বেলা করে একটা ভেষজ মিশ্রণের ভ্যাপার নিতাম। মিশ্রনটা তৈরি শিখিয়েছিলেন আমার এক বড় ভাই, মতি ভাই। কিভাবে এটা তৈরি করতে হয় সেটা বলছি-

আদা, রসুন, লবঙ্গ, গোলমরিচ, লেবু, কালোজিরা এগুলো ব্লেন্ড করে আধাপোয়া শরিষার তেলের সাথে মিক্স করে আধা লিটার পানিতে দিয়ে গরম করে ভাপ উঠলে সেই ভাপ টা নাক ও মুখ দিয়ে নিতে হবে ১০-১৫ মিনিট ধরে। এক্ষেত্রে সরু মুখের পাতিল ব্যাবহার করলে অধিক ভাপ নেওয়া যাবে। মাথায় একটা তোয়ালে ব্যবহার করলে স্টিম চারদিকে ছড়িয়ে যেতে পারবেনা। আমি অবশ্য ব্যবহার করেছি ইলেকট্রিক কেতলি।

২। প্রতি এক ঘন্টা পরপর চা-কফি, হরলিক্স, দুধ খেয়েছি। লবণ মিশ্রিত গরম পানি দিয়ে গার্গল করেছি। মধু+ কালোজিরা খেয়েছি। জমজমের পানি খেয়েছি।

৩। প্রচুর পরিমাণে খাওয়া দাওয়া করেছি। বিশেষ করে প্রোটিন জাতীয় খাবার। ভিটামিন সি জাতীয় খাবার। কারণ মনে রাখতে হবে, এই ভাইরাস যে প্রবলেম গুলা করে তার মধ্যে আমার দৃষ্টিতে অন্যতম প্রবলেম হলো শরীর দুর্বল করে ফেলে। সুতরাং কোনভাবেই শরীর দুর্বল হতে দেয়া যাবে না। শরীর দুর্বল হলেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে ফাইট করতে পারবেন না।

৪। নিয়মিত ব্রিদিং এক্সারসাইজ করেছি। ইউটিউব দেখলেই প্রচুর এক্সারসাইজ খুঁজে পাবেন। এছাড়াও ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করেছি দিনে এক ঘন্টা করে।

৫। গল্পের বই পড়েছি।

৬। নিয়মিত ফ্যামিলি মেম্বারদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলেছি। তারা সবাই অনেক বেশি সাপোর্টিভ ছিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজ করেছি:

* নিয়মিত নামায পড়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করছি।

* কোরআন তেলাওয়াত করেছি।

* একটা স্পেশাল আমল করেছি যেটা শিখিয়েছেন আমার এক বড় ভাই, মতি ভাই। আমলটা উল্লেখ করছি আমি।

১। দরুদ শরীফ কয়েকবার।

২। বিসমিল্লাহ সহ সূরা ফাতিহা তিনবার।

৩। বিসমিল্লাহ সহ সূরা ইখলাস তিনবার।

৪। হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকিল। এই দোয়াটা ৩১৩ বার।

৫। আবার কয়েক বার দরুদ শরীফ।

এই আমলটা প্রতিদিন একবার করে করলে আশা করি করোনাভাইরাসের আক্রমণ হবে না ইনশাআল্লাহ। হলেও সুস্থ হয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ।

এ ছাড়া যেকোনো খাবার শুরু করার আগে তার মধ্যে সূরা ফাতিহা পড়ে ফু দিয়ে খাবার শুরু করতাম।

যা কিছু করা যাবে না:

১। কখনোই মনোবল হারানো যাবেনা। ‌মনোবল হারালেন তো আপনি শেষ।

২। বেশি মানুষকে আপনার অসুস্থতার কথা জানতে দিবেন না। এতে কোন লাভ হবেনা বরং আপনার লস হবে। আপনার প্রয়োজনে কাউকে পাশে পাবেন না। অযথা ফোন করে, মেসেজ করে আপনাকে বিরক্ত করবে। আপনার জন্য হ্যান করবে ত্যান করবে, আপনার জন্য জান দিয়ে দিবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু যখন ডাকবেন তখন দেখবেন মেসেজ আর সীন ই করবে না। তবে আপনার অরজিনাল শুভাকাঙ্ক্ষী কয়েকজনকে অবশ্যই জানিয়ে রাখবেন এবং বিপদে তাদের সাহায্য নেবেন।

৩। কোনভাবেই ঠাণ্ডাজাতীয় কিছু খাওয়া যাবেনা।

৪। হাত সাবান দিয়ে না ধুয়ে কোনভাবেই নাক-মুখ চোখে স্পর্শ করা যাবে না।

৫। পারতপক্ষে বাড়ির বাইরে যাওয়া যাবেনা।

যা কিছু করতে পারেন বাসায়: যদি আপনার সন্দেহ হয় আপনি পজেটিভ সে ক্ষেত্রে কিছু মেটারিয়ালস বাসায় রাখতে পারেন

১। থার্মোমিটার

২। পালস অক্সি মিটার ( এটা দিয়ে শরীরে অক্সিজেন কতটুকু আছে সেটা বোঝা যাবে। অক্সিজেনের পরিমাণ 92 এর নিচে নামলেই দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।)

৩। নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বাড়ির অন্য সদস্যদের থেকে আলাদা করে ফেলবেন।

৪। ইলেকট্রিক কেটলি রাখবেন।এটা দিয়ে খুব দ্রুত পানি গরম করে ব্যবহার করতে পারবেন।

৫। ঘরের মধ্যে একটা বালতি রাখবেন।

৬। সম্ভব হলে একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার ম্যানেজ করে রাখবেন।

কখন হসপিটাল থেকে ছাড়া পেলাম: প্রথমবার পজেটিভ আসার পাঁচ দিনের মাথায় হসপিটালে ভর্তি থাকা অবস্থায় দ্বিতীয়বার যখন স্যাম্পল দেয় তখন নেগেটিভ আসে অর্থাৎ আক্রান্ত হওয়ার ১০ দিনের মাথায় প্রথম নেগেটিভ আসে। এরপর বাসায় চলে আসি দ্বিতীয় রিপিট স্যাম্পল দিয়ে। তিনদিন পর সেটাও নেগেটিভ আসে। এরপর ১৪ দিন আলাদা ছিলাম ফ্যামিলি মেম্বারদের থেকে।

বাংলাদেশ জার্নাল/কেআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত