ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬ আপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:২৭

প্রিন্ট

ডিম খেলে কি হৃদরোগ হয়?

ডিম খেলে কি হৃদরোগ হয়?
অনলাইন ডেস্ক

ডিমকে বলা হয় আদর্শ খাবার। কেননা প্রোটিনসহ নানা খাদ্যগুণে ভরপুর এই খাবারটি। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মনে করেন, দেহ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদানই রয়েছে ডিমে। কিন্তু উচ্চ মাত্রায় কোলেস্টেরল থাকার কারণে দশকের পর দশক ধরে ডিম খাওয়া নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক।

অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, ডিম খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। কারণ, একটি ডিমের কুসুমে প্রায় ১৮৫ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল। কোলেস্টেরল হচ্ছে এক ধরণের হলুদাভ চর্বি যা আমাদের যকৃত এবং অন্ত্রে তৈরি হয়, তা সব মানুষের দেহকোষেই পাওয়া যায়। সাধারণত আমরা একে 'খারাপ' মনে করি। কিন্তু কোষের মেমব্রেন বা পর্দা গঠনের অন্যতম উপাদান কোলেস্টেরল। দেহে ভিটামিন ডি এবং টেসটসটেরন ও অয়েস্ট্রোজেন হরমোনের উৎপাদনেও এটি দরকারি।

রক্তের লাইপোপ্রোটিন অণু আমাদের দেহে কোলেস্টেরল বহন এবং স্থানান্তরিত করে। প্রত্যেক মানুষের দেখে এসব লাইপোপ্রোটিনের আলাদা আলাদা ধরন থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হবে কিনা তা নির্ধারণ করে এ ধরণের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের উপর।

কম ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন বা এলডিএল কোলেস্টেরলকে খারাপ কোলেস্টেরল হিসেবে ধরা হয়-যা কিনা যকৃত থেকে ধমনী এবং কোষে পরিবাহিত হয়। গবেষকরা বলেন যে, এর ফলে রক্তনালীতে কোলেস্টেরল জমা হয় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

তবে গবেষকরা অবশ্যই কোলেস্টেরল গ্রহণের মাত্রার সাথে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার কোন সংশ্লিষ্টতা আছে বলে উল্লেখ করেননি। এ কারণেই, মার্কিন খাদ্য বিধিতে কোলেস্টেরল গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়নি; যুক্তরাজ্যেও এমন কোন নিষেধাজ্ঞা নেই।

এর পরিবর্তে সম্পৃক্ত চর্বি খাওয়া কমানোর উপর জোর দেয়া হয়েছে, এর কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে বলে সতর্ক করা হয়। যেসব খাবারে ট্র্যান্স ফ্যাট বা কৃত্রিমভাবে তৈরি চর্বি থাকে, সেগুলো বেশি পরিমাণে এলডিএল থাকে।

ডিমে মাংস এবং অন্যান্য প্রাণীজ খাবারের তুলনায় কোলেস্টেরল বেশি থাকে এবং এর সম্পৃক্ত চর্বি রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। বহু বছর ধরে অনেকগুলো গবেষণায় এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সম্প্রতি ডিমের ওপর গবেষণা চালিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কানেক্টিকাটের পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক মারিয়া লুজ ফার্নান্দেজ। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ডিম খাওয়ার সাথে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার কোন সম্পর্ক নেই।

এর আগে ২০১৫ সালে ৪০টি গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করেন জনসনের নেতৃত্বে একদল গবেষক। তারা খাদ্য তালিকায় কোলেস্টেরল থাকার সাথে হৃদরোগের কোন ধরণের সম্পর্ক খুঁজে পাননি।

এছাড়া, কিছু কিছু কোলেস্টেরল তো আমাদের জন্য ভালো।উচ্চ ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন বা এইচডিএল কোলেস্টেরল যকৃতে পরিবাহিত হয়, যেখানে এটি ভেঙ্গে যায় এবং শরীর থেকে নির্গত হয়ে যায়। ধারণা করা হয় যে, এইচডিএল রক্তে কোলেস্টেরল জমতে দেয় না বিধায় এটি হৃদরোগ প্রতিরোধে প্রভাব রাখে।

ফার্নান্দেজ বলেন, ‘রক্তে কি ধরণের কোলেস্টেরল প্রবাহিত হচ্ছে সে সম্পর্কে মানুষের জানা উচিত। তা না হলে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’

দেহে এইচডিএল এবং এলডিএলের পার্থক্যের হার কত তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এলডিএল এর ক্ষতিকর প্রভাবকে রুখে দেয় এইচডিএল।

যাই হোক, আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই আমরা যে কোলেস্টেরল খাই সেটিকে যকৃতে উৎপন্ন কোলেস্টেরলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও ব্লেসো বলেন যে, এক তৃতীয়াংশ মানুষ খাবারের সাথে কোলেস্টেরল গ্রহণ করলে তাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ১০% থেকে ১৫% বেড়ে যায়।

পরীক্ষায় দেখা যায়, রোগা এবং স্বাস্থ্যবান মানুষদের মধ্যে খাবারের মাধ্যমে কোলেস্টেরল গ্রহণ করলে তাদের রক্তে এলডিএলের পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু যাদের অতিরিক্ত ওজন ও ডায়াবেটিক রয়েছে তাদের রক্তে এলডিএল কম পরিমাণে বাড়ে, কিন্তু এইচডিএল বেশি পরিমাণে বাড়ে।

তাই আপনি যদি স্বাস্থ্যবান হয়ে থাকেন তাহলে ডিম খাওয়াটা স্থূলকায় ব্যক্তির তুলনায় আপনার জন্য বেশি ক্ষতিকর নয়। যেহেতু আপনার স্বাস্থ্য ভালো তাই আপনার রক্তে এইচডিএলের মাত্রাও বেশি থাকবে, তাই এলডিএলের মাত্রা বাড়াটা খুব ক্ষতিকর হবে না।

তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত গবেষণা, ডিম যে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, এমন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। গবেষকরা ৩০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ১৭ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেন। তারা দেখেন যে, প্রতিদিন অর্ধেক ডিম বেশি খেলে তা উল্লেখ জনক হারে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এমনকি মৃত্যুও ঘটায়।

এ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের নর্থ-ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির প্রিভেনটিভ মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক নরিনা অ্যালেন বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে, কোন ব্যক্তি প্রতি ৩০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল অতিরিক্ত গ্রহণ করলে, তা সে যে খাবার থেকেই হোক না কেন, সেটিতে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে ১৭%। আর মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ে ১৮%।’

গবেষণায় তারা আরো দেখতে পান, প্রতিদিন অর্ধেক পরিমাণ ডিম বেশি খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি ৬% এবং মৃত্যু ঝুঁকি ৮% বাড়ে।

এই গবেষণা আগের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিলো। এর আগের অসংখ্য গবেষণা রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে ডিম স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

চীনে ২০১৮ সালে ৫ লাখ মানুষের উপর পরিচালিত একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয় যে, ডিম খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। যারা প্রতিদিন ডিম খান তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৮% কমে যায়। একইসাথে যারা ডিম খান না তাদের তুলনায় স্ট্রোকের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি কমিয়ে দেয় ২৮%।

তবে যত বির্তকই থাকুক না কেন, ডিম যে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই প্রতিদিন সকালের নাস্তায় ডিম রাখার কোন বিকল্প নেই। তবে খেয়াল রাখা জরুরি, ডিমের সঙ্গে অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার যেন না খাওয়া। অর্থাৎ সকালে আপনি আস্ত একটি ডিম খেলে অন্যসব পুষ্টিকর খাবার বাদ দেবেন। এতে আপনার শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। সকালের নাস্তায় ডিমের সঙ্গে রুটি আর কিছু সালাদ খেতে পারেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত