ঢাকা, শুক্রবার, ০৭ মে ২০২১, ২৪ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ৪৮ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১১:০৬

প্রিন্ট

বিপজ্জনক ছায়াযুদ্ধে ইরান-ইসরায়েল

বিপজ্জনক ছায়াযুদ্ধে ইরান-ইসরায়েল
মিসাইল পরীক্ষা

অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের বৈরি দুটি দেশ ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে অনেক দিন ধরে চলা অঘোষিত ছায়াযুদ্ধ এখন উদ্বেগজনকভাবে তীব্র হয়ে উঠেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ইরানের নাতাঞ্জে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ইউরেনিয়াম পরিশোধনাগারে এই সপ্তাহান্তে যে রহস্যজনক বিস্ফোরণ হয়েছে, দেশটি তার জন্য দায়ী করেছে ইসরায়েলকে। বিবিসি।

ইরান এটাকে ‘নাশকতামূলক কাজ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। যদিও ইসরায়েল এই ঘটনার পেছনে তাদের হাত রয়েছে বলে প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমে কিছু কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করা হয়েছে, যারা বলেছেন ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়েছে।

ইরান বলেছে, তারা ‘তাদের বেছে নেওয়া যে কোনও সময়ে’ অবশ্যই এর প্রতিশোধ নেবে। এটা কিন্তু একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দুই দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের বৈরি ও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের মাত্রা ক্রমশই বাড়িয়ে তুলেছে। পুরো যুদ্ধ বাধলে তা দুই দেশের জন্য ব্যাপক বিধ্বংসী হবে বলে সেটা এড়িয়ে তলে তলে তাদের ঠাণ্ডা লড়াই আরও তীব্র করে তুলেছে। এতে বিপদের ঝুঁকিগুলো কোথায় আর এর পরিণতিই বা কী হতে পারে? এই ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্র মূলত তিনটি।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি

ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ বেসামরিক কাজে ব্যবহার করা হবে বলে বারবার আশ্বাস দিলেও ইসরায়েল তা বিশ্বাস করে না। ইসরায়েল নিশ্চিত যে, ইরান গোপনে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করছে যা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য হবে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের ইসরায়েল সফরের সময় সোমবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘ইরানের কট্টরপন্থী প্রশাসন যে হুমকি সৃষ্টি করছে, মধ্যপ্রাচ্যের জন্য তা সবচেয়ে ভয়ানক, সবেচয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হুমকি।’

লন্ডনে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যিপি হতোভেলি। সোমবার বিবিসি-কে তিনি বলেন, ‘ইরান কখনই পারমাণবিক অস্ত্র এবং তা ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কর্মসূচি বন্ধ করেনি। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির লক্ষ্য সারা বিশ্বের জন্য একটা হুমকি।’

এই বিশ্বাস থেকে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে খোঁড়া করে দেওয়ার বা তা বিলম্বিত করে দেওয়ার জন্য গোপনে একপাক্ষিকভাবে অঘোষিত তৎপরতা চালাচ্ছে। ইসরায়েল স্টাক্সনেট সাংকেতিক নাম দিয়ে তৈরি কম্পিউটার ভাইরাস সেখানে ঢুকিয়ে দিয়েছে, যা প্রথম জানা যায় ২০১০ সালে। ওই ভাইরাস ইরানের পরমাণু কেন্দ্রের সেন্ট্রিফিউজ ব্যবস্থাকে অকেজো করে দেয়। এ শতকের গোড়ার দিকে ইরানের বেশ কয়েকজন পরমাণু বিজ্ঞানী রহস্যজনকভাবে মারা যান এবং গত বছর নভেম্বর মাসে তেহরানের কাছে ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মহসিন ফখরিজাদেহ-কে হত্যা করা হয়।

মহসিন ফখরিজাদেহ যে শুধু ইরানের শীর্ষ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ছিলেন তাই নয়, তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও ছিলেন। ইসরায়েলের বিশ্বাস ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সামরিক লক্ষ্যে গড়ে তোলার গোপন কার্যকলাপ তিনিই পরিচালনা করছিলেন।

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রকে আবার এই চুক্তিতে ফিরিয়ে আনতে চান, যদি ইরান চুক্তির শর্ত পুরোপুরি মেনে চলতে সম্মত হয়। ইরান বলছে, ‘না, আমরা তোমাদের বিশ্বাস করি না। তোমরা আগে প্রতিশ্রুতি পূরণ কর। নিষেধাজ্ঞা আগে তুলে নাও, তারপর আমরা চুক্তির শর্ত পুরোপুরি মানবো।’

এই অচলাবস্থা অবসানের চেষ্টায় বেশ কয়েকটি দেশের আলোচনাকারীরা ভিয়েনায় বৈঠক করেছেন। তবে এই চুক্তি বর্তমান আকারে পুনরুদ্ধার করার যুক্তি কতটা আছে তা নিয়ে সন্দিহান ইসরায়েল। লন্ডনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট (রুসি)-এর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ড. মাইকেল স্টিফেন্স বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ভেস্তে দেওয়ার একটা উদ্দেশ্যমূলক চেষ্টা নিয়েই ইসরায়েল সাম্প্রতিক কার্যকলাপ চালাচ্ছে।

মাইকেল স্টিফেন্স বলেন, ‘ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে লক্ষ্যভ্রষ্ট বা অকেজো করতে ইসরায়েল একপাক্ষিকভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। কৌশলগত ক্ষমতার দিক দিয়ে তা চমকপ্রদ হলেও এটা কিন্তু একটা ঝুঁকিপূর্ণ খেলা। প্রথমত, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের ফলে আমেরিকার আলোচনায় বসার পরিস্থিতি বিঘ্নিত হতে পারে। বিশেষ করে আমেরিকা যখন ইরানের সাথে আবার নতুন করে চুক্তির চেষ্টা করছে।’

দ্বিতীয়ত, ইরান বিশ্বব্যাপী ইসরায়েলি স্বার্থ জড়িত এমন কিছুর ওপর এমন ধরনের হামলা চালাতে পারে, যা হবে অসম ক্ষমতার ভিত্তিতে এবং সেটি হয়তো খুব প্রচ্ছন্ন হবে না। ইরানের কর্মসূচি ইসরায়েল যে ব্যাহত করতে পারে সেটা তারা প্রমাণ করে দিয়েছে। কিন্তু সেটার মূল্য কী দাঁড়াবে?

সমুদ্রপথে নৌ চলাচল

সমুদ্রপথে সম্প্রতি রহস্যজনক কিছু ঘটনা ঘটেছে। এ বছরের গোড়ার দিকে ইসরায়েলি মালবাহী জাহাজ এমভি হেলিওস; ওমান উপসাগর দিয়ে যাবার সময় গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাহাজের মূল অংশে হঠাৎ করে দুটি বিশাল গর্ত দেখা যায় এবং ইসরায়েল সঙ্গে সঙ্গেই এর জন্য ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডকে দায়ী করে। তবে তেহরানের দাবি, এতে তাদের কোন হাত ছিল না।

এপ্রিল মাসে সাভিজ নামে ইরানের একটি জাহাজ, যেটি দক্ষিণ লোহিত সাগরে নোঙর করা ছিল, সেটির মূল অংশ কোনও কিছুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধারণা করা হয়, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ওই ক্ষতি হয়েছে।

নিকটবর্তী ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন ধারণা করছিল সাভিজ ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের জন্য প্রধান সরবরাহকারী জাহাজ হিসেবে কাজ করছিল। তাদের বক্তব্য ছিল ওই মূল জাহাজটিতে স্পিডবোট, মেশিনগান এবং অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম দেখা গেছে। কিন্তু ইরান বলছে, ওই জাহাজটি কোনও সামরিক উদ্দেশ্যে নয়; বরং শান্তিপূর্ণ ও বৈধ উদ্দেশ্যে সেখানে নোঙর করা ছিল। ইরান এই হামলার দায় চাপায় ইসরায়েলের ওপর।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, গত ১৮ মাসে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সিরিয়াগামী ১২টি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যেগুলোতে ইরানের তেল এবং সামরিক সরবরাহ পরিবহন করা হচ্ছিল।

সিরিয়া ও লেবানন

গত ১০ বছর ধরে সিরিয়ার সীমান্তের ভেতরে যুদ্ধ চলার কারণে সেখানে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার দিক থেকে নজর সরে গেছে। ওই গৃহযুদ্ধে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে আইআরজিসি-র বহুসংখ্যক ইরানি সামরিক উপদেষ্টা ইরানের লেবাননি মিত্র হিযবুল্লাহ-র সঙ্গে একযোগে কাজ করেছে। কোনও কোনও সময় দেখা গেছে, ইরানি রেভুল্যশনারি বাহিনী সীমান্তের কাছে ইসরায়েল অধিকৃত গোলান মালভূমিতেও হামলা চালিয়েছে।

ইসরায়েলি শহরগুলোতে আঘাত হানার মতো দূরত্বে নির্ভুল নিশানায় ছোঁড়ার উপযোগী রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের ব্যাপারে ইরানের সক্ষমতা ইসরায়েলকে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। ইসরায়েল সিরিয়ার ভেতরে ইরানের সামরিক ঘাঁটি ও সরবরাহ পথের ওপর অসংখ্য বিমান হামলাও চালিয়েছে। তবে ইরান এ পর্যন্ত তাতে একেবারে পর্যুদস্ত হয়ে যাওয়ার মতো কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি।

এই ছায়াযুদ্ধের শিকড়ে রয়েছে পরিস্থিতি একেবারে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া। দুই পক্ষের কেউই নিজেকে দুর্বল প্রতিপন্ন করতে চায় না। কিন্তু ইরান এবং ইসরায়েল দুই দেশই জানে এমন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া তাদের জন্য চতুর হবে যেখানে একটা পুরোপুরি যুদ্ধাবস্থা তৈরি হবে না, কিন্তু উত্তেজনা একেবারে চরমে থাকবে।

পারমাণবিক ক্ষেত্রে এটা পরিষ্কার যে, ইসরায়েলের গোয়েন্দারা ইরানের নিরাপত্তা বেষ্টনি ভেদ করতে সক্ষম। সেটা তারা এমন অভিনব কৌশলে করতে সক্ষম যা তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। ইরান অভেদ্য নিরাপত্তা পদক্ষেপ নিলেও ইসরায়েলিরা প্রমাণ করেছে তাদের গুপ্তচররা ব্যক্তিগতভাবে সেই দুর্গে ঢুকে পড়তে সক্ষম বা সাইবার জগতের নিরাপত্তা প্রাচীর ভেদ করে ইসরায়েলের পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।

ইরান ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর জন্য সিরিয়া ও লেবাননে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ঘাঁটি স্থাপন করতে পারে। কিন্তু সেটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ইসরায়েলও ইতোমধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের জবাব কোন পথে যাবে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র যে ইরানকেই আঘাত করবে সেটাও তারা পরিষ্কার করেছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশানাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিস-এ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ জন রেইন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সক্ষমতা যেহেতু অনেক উন্নত, তার অর্থ হবে ইরান হামলা চালালে সেটা হবে সাদামাটা প্রচলিত ধরনের হামলা। ইরান এর বাইরে উন্নত কৌশলের হামলা চালাতে পারবে না।

তার ভাষায়, ‘ইসরায়েলের ওপর হামলা চালানোর জন্য ইরানের সবচেয়ে বড় মিত্র হল হিজবুল্লাহ। এটি তেহরানের জন্য কিছুটা হতাশার। কারণ হিজবুল্লাহকে জড়িয়ে কোনও রকম বড় যুদ্ধে যাওয়া ইরান এড়াতে চায়।

জন রেইন বলেন, ‘ইরানের বাড়তি কিছু সুবিধা থাকলেও, ইসরায়েলের সঙ্গে সমান পাল্লায় লড়াইয়ের ক্ষমতা দেশটির নেই। ইসরায়েল আরও দূর পাল্লায় আঘাত হানতে সক্ষম, তাদের গুপ্তচরদের ইরানের ভেতর থেকে দ্রুত কাজ করার দক্ষতা রয়েছে এবং প্রচলিত ধারায় হামলা চালাতে চাইলে সেখানেও তারা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে।’

বাংলাদেশ জার্নাল/নকি

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত